ট্যাপের প্রবাহমান পানিতে নাপাক কাপড় ধোয়ার ছিটা কি নাপাক?
Taharah Purity · Hanafi
Question
(১)আমি যদি ট্যাপের পানি ছেড়ে রাখি,আর সেই প্রবাহিত পানিতে কোনো নাপাক কাপড় বা জিনিসপত্র ধুই সেখান থেকে পানির ছিটা আসলে শরীরে/কাপড়ে সেটাও কি নাপাক হয়ে যাবে?(নিচে কোনো বালতি/পাত্রে পানি জমা করিনি,পানির কল থেকে পানি নিচে পড়ছে শুধু)
(২)আমি যদি কোনো বালতি এমনভাবে ভরি ট্যাপের পানি দিয়ে যে সেটা উপচে পড়ছে,তাহলে সেটা প্রবাহিত পানির হুকুমে যাবে না?
এখন সেখানে যদি ৭-৮ টা নাপাক কাপড় ধোয়ার জন্য দিই,তাহলে কাপড়ের ভারে বালতির পানি কিছুটা কমে গিয়ে পানি উপচে পড়া বন্ধ হয়ে যায় ১মিনিটের জন্য, আবার একটা করে কাপড় ধুয়ে তুলতে তুলতে বালতিতে পানির চাপ কমে যাওয়াতে আবার বালতি ভরে উপচে পড়তে সময় লাগে ১-২ মিনিট।
এরকম কিছু সময়ের জন্য যদি উপচে পড়া বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কি সেই পানি প্রবাহিত পানির হুকুমে থাকবে না আর?
ঐ পানিতে যদি ৭-৮ টা কাপড় একবার ধুয়ে নিংড়ে ফেলি পানি তাহলে পাক হবে না কাপড়গুলো?
(৩)আর বালতিতে পানি নিয়ে উপচে পড়া পানি দিয়ে কাপড় ধোয়ার পর অবশিষ্ট যেই পানি বালতিতে থাকে সেই পানির হুকুম কী?
(৪) এভাবে ট্যাপ ছেড়ে রেখে বালতিতে উপচে পড়তে দিলে,সেই পানিতে কাপড় ধোয়ার সময় ছিটা আসলে কি নাপাক সেই ছিটা?
এটা তো প্রবাহিত পানির হুকুমে থাকার কথা।
(৫) এভাবে পানি উপচে পড়তে থাকলে বালতি+আশেপাশের জিনিসপত্রেই ছিটা আসে নাপাক কাপড় ধোয়ার সময়।
কাপড় ধোয়া শেষ হলে কি আলাদাভাবে বালতির বাইরের অংশ অন্য জগ-মগ আলাদাভাবে পানি দিয়ে ধুতে হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ট্যাপ থেকে প্রবাহমান (জারি) পানিতে নাপাক কাপড় ধুলে সেই পানির ছিটা নাপাক নয়—শরীর ও কাপড় পাক থাকবে। বালতিতে জমা পানিও যদি ট্যাপের সাথে সংযুক্ত থেকে উপচে পড়ে এবং প্রবাহ বন্ধ না হয়, তবে তা প্রবাহমান পানির হুকুমে থাকবে। তবে প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে (কিছুক্ষণ হলেও) বালতির পানি "জমা পানি" (রাকিদ) হয়ে যাবে; তখন নাপাক কাপড় ধোয়ার কারণে বালতির পানি নাপাক হয়ে যাবে এবং ছিটাও নাপাক হবে। নিচে বিস্তারিত।
১) প্রবাহমান পানিতে নাপাক কাপড় ধোয়ার ছিটা
হুকুম: ট্যাপ খোলা থাকলে যে পানি প্রবাহিত হচ্ছে, তা জারি পানি (الماء الجاري)। জারি পানির হুকুম হলো—নাপাকি পড়লেও, যতক্ষণ নাপাকির চিহ্ন (রং/গন্ধ/স্বাদ) না আসে এবং প্রবাহ বন্ধ না হয়, ততক্ষণ তা পাক থাকে। এজন্য প্রবাহমান পানিতে নাপাক কাপড় ধুলে সেই পানির ছিটা নাপাক নয়; শরীর ও কাপড় পাক থাকবে।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: «وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ» — "তিনি আকাশ থেকে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেন, যাতে তোমাদের পবিত্র করেন।" (সূরা আনফাল: ১১)
- হাদিসে নবী ﷺ পানি সম্পর্কে বলেন: «الْمَاءُ طَاهِرٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ» — "পানি পাক; কোনো বস্তু তাকে নাপাক করে না।" (তিরমিজি: ৬৬; আবু দাউদ: ৬৭—হাসান সহিহ)
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে জারি পানি নাপাকি দ্বারা নাপাক হয় না, যতক্ষণ না নাপাকির চিহ্ন প্রকাশ পায়। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; রাদ্দুল মুহতার: ১/৩০০-৩০২; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১৮)
শর্ত: প্রবাহ অব্যাহত থাকতে হবে এবং পানিতে নাপাকির রং/গন্ধ/স্বাদ প্রকাশ পেতে পারবে না। যদি নাপাকির চিহ্ন প্রকাশ পায়, তবে সেই অংশ নাপাক।
২) বালতিতে ট্যাপের পানি ভরে উপচে পড়া—প্রবাহমানের হুকুম?
মূলনীতি: বালতির পানি তখনই জারি/প্রবাহমানের হুকুম পাবে, যখন তা ট্যাপের পানির সাথে সংযুক্ত (মুত্তাসিল) থাকে এবং ট্যাপ থেকে পানি আসা অব্যাহত থাকে—এমনকি উপচে পড়া বন্ধ হলেও, যতক্ষণ ট্যাপের সাথে সংযোগ আছে এবং পানি আসছে। কিন্তু যদি ট্যাপ বন্ধ হয় বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তবে বালতির পানি "জমা পানি" হয়ে যাবে।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী: ট্যাপ খোলা আছে, বালতি ট্যাপের নিচে, পানি আসছে—তাই বালতির পানি ট্যাপের পানির সাথে সংযুক্ত। উপচে পড়া ১-২ মিনিট বন্ধ হলেও, যেহেতু ট্যাপ থেকে পানি আসছে এবং বালতি পূর্ণ হয়ে আবার উপচে পড়ছে, তাই বালতির পানি প্রবাহমানের হুকুমেই থাকবে—শর্ত হলো ট্যাপের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া।
তবে সতর্কতা: যদি বালতির পানি ট্যাপের পানির সাথে সংযুক্ত না থাকে (যেমন ট্যাপ বন্ধ, বা বালতি সরিয়ে নেওয়া), তবে তা জমা পানি। জমা পানিতে নাপাক কাপড় ধুলে পানি নাপাক হয়ে যাবে।
৭-৮টি নাপাক কাপড় একবারে ধুয়ে নিংড়ানো: যেহেতু পানি প্রবাহমান/সংযুক্ত এবং নাপাকির চিহ্ন প্রকাশ পাচ্ছে না, তাই কাপড়গুলো পাক হবে—তবে তিনবার ধোয়া ও প্রতিবার নিংড়ানো উত্তম ও নিরাপদ। একবার ধুয়ে নিংড়ালে যদি নাপাকির চিহ্ন (রং/গন্ধ) দূর হয় এবং পানি প্রবাহমান থাকে, তবে পাক হবে; তবে তিনবার ধোয়া সুন্নত/মুস্তাহাব।
দলিল: রাদ্দুল মুহতার: ১/৩০০-৩০৫; ফাতাওয়া উসমানি: ১/৩৪-৩৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৪৫-৪৭।
৩) কাপড় ধোয়ার পর বালতিতে অবশিষ্ট পানির হুকুম
হুকুম: যদি ট্যাপ খোলা থাকে এবং বালতির পানি ট্যাপের পানির সাথে সংযুক্ত থাকে, তবে অবশিষ্ট পানিও প্রবাহমানের হুকুমে পাক থাকবে (নাপাকির চিহ্ন না থাকলে)। কিন্তু যদি ট্যাপ বন্ধ করে দেওয়া হয় বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তবে অবশিষ্ট পানি জমা পানি; তাতে নাপাক কাপড় ধোয়ার কারণে তা নাপাক হয়ে যাবে।
সতর্কতা: নিরাপদ পদ্ধতি হলো—কাপড় ধোয়ার পর বালতির পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানি নেওয়া, অথবা ট্যাপ খোলা রেখে প্রবাহমান রাখা।
৪) উপচে পড়া পানিতে কাপড় ধোয়ার সময় ছিটা নাপাক কি?
হুকুম: যদি বালতির পানি ট্যাপের সাথে সংযুক্ত ও প্রবাহমান থাকে, তবে ছিটা নাপাক নয়। কিন্তু যদি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় (ট্যাপ বন্ধ বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন), তবে বালতির পানি জমা পানি; তখন নাপাক কাপড় ধোয়ার কারণে পানি নাপাক হয়ে যাবে এবং ছিটাও নাপাক হবে।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী: ট্যাপ খোলা, পানি আসছে—তাই ছিটা নাপাক নয়। তবে উপচে পড়া বন্ধ হওয়ার সময় যদি ট্যাপের সাথে সংযোগ থাকে, তবুও পানি প্রবাহমানের হুকুমে থাকবে; কিন্তু যদি সন্দেহ হয় যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তবে সতর্কতা হিসেবে সেই ছিটা ধুয়ে নেওয়া উত্তম।
৫) কাপড় ধোয়ার পর বালতির বাইরের অংশ ও আশেপাশের জিনিসপত্র ধোয়া
হুকুম: যদি প্রবাহমান পানির ছিটা হয় এবং নাপাকির চিহ্ন না থাকে, তবে বালতির বাইরের অংশ ও আশেপাশের জিনিসপত্র ধোয়া ওয়াজিব নয়। তবে যদি নাপাক কাপড় ধোয়ার সময় নাপাক পানির ছিটা বালতির বাইরে বা আশেপাশে পড়ে এবং তাতে নাপাকির চিহ্ন (রং/গন্ধ) থাকে, তবে সেই অংশ ধোয়া আবশ্যক।
সতর্কতা: যেহেতু নাপাক কাপড় ধোয়ার সময় ছিটা আসছে, তাই এহতিয়াত (সতর্কতা) হিসেবে বালতির বাইরের অংশ ও আশেপাশের জিনিসপত্র একবার পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া উত্তম—যদিও প্রবাহমান পানির হুকুমে বাধ্যতামূলক নয়।
দলিল: রাদ্দুল মুহতার: ১/৩০৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৮; বাহিশতী জেওর (তাহারাত অধ্যায়)।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | হুকুম | |---|---| | ১. প্রবাহমান পানিতে নাপাক কাপড় ধোয়ার ছিটা | পাক (নাপাকির চিহ্ন না থাকলে) | | ২. বালতিতে ট্যাপের পানি উপচে পড়া | প্রবাহমানের হুকুমে, যদি ট্যাপের সাথে সংযুক্ত থাকে | | ২(ক). ৭-৮ কাপড় একবারে ধোয়া | পাক হবে, তবে তিনবার ধোয়া উত্তম | | ৩. অবশিষ্ট বালতির পানি | সংযুক্ত থাকলে পাক; বিচ্ছিন্ন হলে নাপাক | | ৪. ছিটা নাপাক কি? | সংযুক্ত থাকলে পাক; বিচ্ছিন্ন হলে নাপাক | | ৫. বালতির বাইরের অংশ ধোয়া | ওয়াজিব নয়, তবে এহতিয়াতে উত্তম |
মূল পরামর্শ: ট্যাপ খোলা রেখে বালতির পানি সর্বদা ট্যাপের সাথে সংযুক্ত রাখুন; কাপড় ধোয়ার পর বালতির পানি ফেলে নতুন পানি নিন; এবং সন্দেহ হলে সতর্কতা হিসেবে ছিটা ধুয়ে নিন।
والله أعلم بالصواب