আমার শ্বাশুড়িকে আমরা অনেক যত্নে,সম্মানের সাথে রাখলেও উনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট নন।আমাদের করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
আজ দু দিন ধরে শ্বাশুড়ি রেগে আছেন এবং উনার একটায় হুকুম চাচাদের সাথে কুরবানী না করে অন্য কারো সাথে কোরবানি করা০ এবং চাচার সাথে সম্পর্ক না রাখা।আমার শ্বাশুড়ি তিন সন্তান রেখে পরিবারের সম্পূর্ণ অমতে এবং বাঁধা সত্ত্বেও দুবাই চলে যান এবং সন্তানদের লালন-পালনে উনি বেখবর ছিলেন।যেহেতু একমাত্র চাচ এবং দাদী উনারা তিন ভাইকে পড়াশোনা করান,শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন কোনো বিনিময় ছাড়াই এই কৃতজ্ঞতার কারণে আমি কখনোই তাঁদেরকে ছেড়ে সম্পর্ক নষ্ট করতে আমার স্বামীকে বারণ করি এবং আমার স্বামী নিজেও চাচা ও দাদীর প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ বলে মায়ের আদেশ মানতে পারেন না।
আমার প্রশ্ন মায়ের এই আদেশ মা মানলে কি আমার,আমার স্বামীর কোনো গুনাহ্ হবে?আমার শ্বাশুড়ির এই আদেশ কি শরীয়ত বা কুরআন সমর্থন করে? আমাদের উপর (ছেলে+ছেলের বউদের)উনি অসন্তুষ্ট থাকেন যদিও উনার হক এবং অধিকার সম্পর্কে আমি অনেক সচেতন। এক্ষেত্রে আমার করনীয় কি?আমার ভয় হয় উনার অসন্তুষ্টি আমাদের গুনাহগার বানিয়ে ফেলছে কি না।আমার শ্বাশুড়ির নিজ পরিবারের মানুষকে প্রতিহিংসা করা আর আত্মীয়দের প্রশংসা০ করা যার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই,এটা আমি মানতে পারি না।উনাকে গীবত,হিংসা,অপবাদ এগুলো বাদ দিতে বললে উনি উল্টো বলেন চাচা,চাচী,দাদী আমাকে উনার নামে বদনাম বলছে বলে আমি আমার শ্বাশুড়ির কথা বিশ্বাস করি না।এটা সম্পূর্ণ উনার মনগড়া চিন্তা।মূলত আমি সংসারে এসে দেখেছি উনি উনার শ্বাশুড়ি বা পরিবারের এমনকি উনার ছেলেদের সাথেও উনার কোনো সুসম্পর্ক নেই।উনাকে হিদায়াতের পথে আনতে চাইলেও উনি কোনো কথা শোনেন না,মিথ্যা ছাড়তে পারেন না।
এক্ষেত্রে আমার করনীয় জানতে চাই। আমি,আমার স্বামী কি মায়ের বদদোয়ায় পতিত হবো?
উল্লেখ্য তিন ভাইয়ের মধ্যে মায়ের পোশাক,ঔষধ, চিকিৎসা, খাবার,হাত খরচ যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের পবিত্র দায়িত্ব পালনের সুযোগ মহান আল্লাহ আমার স্বামীকে দিয়েছেন এবং আমরা এতে খুবই খুশি,তৃপ্ত।
Answer
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
প্রথমত, আপনার পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির জটিল পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছি। আল্লাহ তাআলা আপনাদের ধৈর্য ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।
১. মায়ের আদেশ মানা কি গুনাহ?
আপনার শ্বাশুড়ি যদি চাচা ও দাদীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আদেশ দেন, তাহলে তা শরীয়তসম্মত নয় বরং সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। কারণ ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রাহিম) ফরজ এবং তা ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ।
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।" (সূরা নিসা: ১)
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি, মুসলিম)
পিতামাতার আদেশ মানা জরুরি, কিন্তু পাপের কাজে নয়:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো মাখলুকের আনুগত্য জায়েয নেই।" (মুসলিম)
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "যদি তারা (পিতামাতা) তোমাকে আমার সাথে শিরক করার জন্য চাপ দেয়, যা তুমি জানো না, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আর দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো।" (সূরা লুকমান: ১৫)
সুতরাং, আপনার স্বামী যদি মায়ের আদেশ অমান্য করে চাচা ও দাদীর সাথে সম্পর্ক রাখেন, তবে তা গুনাহ নয় বরং সওয়াবের কাজ। মায়ের আদেশ অমান্য করার কারণে তার ওপর আপনার স্বামী গুনাহগার হবেন না।
২. মায়ের অসন্তুষ্টি ও বদদোয়া কি কবুল হবে?
মা যদি অন্যায় কারণে অসন্তুষ্ট হন এবং তার বদদোয়া করেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা অন্যায় বদদোয়া কবুল করেন না। তবে তার প্রতি দয়া ও সম্মান বজায় রাখা আপনার কর্তব্য।
হাদিসে এসেছে: "তিনটি দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়: মাযলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, আর পিতার সন্তানের প্রতি দোয়া।" (তিরমিজি)
- পিতার বদদোয়া যদি অন্যায় হয়, তাহলে তা কবুল হওয়া থেকে নিশ্চিত নয়। তবে আপনার স্বামীকে উচিত মায়ের প্রতি যথাসম্ভব সম্মান ও সেবা করা, যাতে তার রাগ কমে।
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেছেন:
"যদি পিতামাতা কোনো পাপ কাজের আদেশ দেন, তাহলে তাদের আনুগত্য করা জায়েয নয়। তবে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের খেদমত করতে হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৬)
৩. আপনার করণীয় কী?
আপনার ভূমিকা হলো আপনার স্বামীকে সঠিক পথে উৎসাহিত করা এবং শ্বাশুড়ির প্রতি ধৈর্য ও সহনশীল থাকা।
-
শ্বাশুড়ির প্রতি আপনার কর্তব্য:
- তার প্রয়োজনীয় সব কিছু পূরণ করুন (যেমন খাবার, ওষুধ, পোশাক ইত্যাদি)।
- তার সাথে নম্র ও সদয় ব্যবহার করুন।
- তাকে সরাসরি গীবত, হিংসা ইত্যাদি ছাড়তে বলবেন না; বরং দোয়া করুন এবং সুন্দরভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
-
স্বামীর প্রতি পরামর্শ:
- মায়ের আদেশ অমান্য করে চাচা ও দাদীর সাথে সম্পর্ক রাখা ওয়াজিব।
- কিন্তু মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করবেন না; বরং তাকে বুঝিয়ে বলুন যে ইসলামে আত্মীয়তা ছিন্ন করা হারাম।
- যদি মায়ের রাগ বেশি হয়, তবে চুপ থাকা ও ধৈর্য ধরা উত্তম।
-
গীবত ও মিথ্যা সম্পর্কে:
শ্বাশুড়ি যদি গীবত করেন বা মিথ্যা বলেন, তাহলে তার কথা বিশ্বাস না করা এবং নিজে গীবত থেকে বিরত থাকা আপনার দায়িত্ব। তবে তাকে সরাসরি দোষারোপ না করে নরম ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করুন।
৪. উপসংহার ও দোয়া
আপনার স্বামীর জন্য মায়ের আদেশ অমান্য করা গুনাহ নয়, বরং তা আল্লাহর আদেশ পালন। মায়ের অসন্তুষ্টি বা বদদোয়া নিয়ে ভয় না পেয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
শেষপর্যন্ত, আপনার ও আপনার স্বামীর কর্তব্য হলো:
- মায়ের সেবা চালিয়ে যাওয়া।
- চাচা ও দাদীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
- ধৈর্য ও দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হক পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।
প্রয়োজনীয় রেফারেন্স:
- সূরা নিসা: ১ (আত্মীয়তার গুরুত্ব)
- সূরা লুকমান: ১৫ (পিতামাতার অবাধ্যতা না করা)
- বুখারি (হাদিস নং: ৫৯৮৪)
- মুসলিম (হাদিস নং: ৩৪০৬)
- রাদ্দুল মুহতার (৬/৪১৬)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৪৫)