কুফরি কথা বললে কি তাওবা করলে ঈমান ফিরে আসে
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
কুফরি বাক্য উচ্চারণের পর তাওবা ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে তিনটি দিক রয়েছে: ১. কেউ কুফরি কথা বলে ফেললে তার কথাকে অন্য অর্থে (তাওয়িল) নেওয়া যাবে কি? ২. যদি সে প্রকৃতপক্ষে কুফরি অর্থই করে থাকে, তবে কি অন্য অর্থ ধরা যাবে? ৩. এতদিন স্বামীর সাথে সহবাস ও গর্ভাবস্থার পর সেই সম্পর্কের হুকুম কী?
১. কুফরি কথার পর তাওয়িল (অন্য অর্থ আরোপ) করার হুকুম
মূলনীতি
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো— কুফরি বাক্য উচ্চারণকারীর কথা স্বাভাবিক অর্থে (যাহির) বহাল থাকবে; তবে যদি এমন কোনো সহীহ (গ্রহণযোগ্য) তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকে, যা আরবি ভাষার দৃষ্টিতে বৈধ এবং বক্তার অবস্থা তা সমর্থন করে, তাহলে তাওয়িল গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু যদি বাক্যটি সুস্পষ্ট কুফর হয় এবং কোনো বৈধ তাওয়িলের সুযোগ না থাকে, তবে তাওয়িল ধরা যাবে না।
ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
«وَلَا يُقْبَلُ تَأْوِيلُهُ إِذَا كَانَ اللَّفْظُ صَرِيحًا فِي الْكُفْرِ لَا يَحْتَمِلُ غَيْرَهُ، أَمَّا إذَا كَانَ يَحْتَمِلُ التَّأْوِيلَ فَيُقْبَلُ»
"যদি শব্দটি কুফরে সুস্পষ্ট হয় এবং অন্য অর্থের সম্ভাবনা না থাকে, তবে তার তাওয়িল গ্রহণ করা হবে না। আর যদি তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকে, তবে তা গ্রহণ করা হবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, খণ্ড ৪)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
«الْكُفْرُ يَثْبُتُ بِصَرِيحِهِ وَلَا يُحْمَلُ عَلَى الْمَجَازِ إلَّا بِقَرِينَةٍ»
"কুফর তার সুস্পষ্ট শব্দেই প্রমাণিত হয়; আর কোনো قرينة (সূত্র/প্রমাণ) ছাড়া তা মাজায (রূপক) অর্থে নেওয়া হবে না।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, কিতাবুল জিহাদ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন: কুফরি বাক্যের ক্ষেত্রে বক্তার নিয়ত ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি; তবে সুস্পষ্ট কুফরের ক্ষেত্রে তাওয়িলের দরজা বন্ধ।
২. যদি সে প্রকৃতপক্ষে কুফরি অর্থই করে থাকে
যদি প্রমাণিত হয় যে সে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি অর্থই করেছে এবং বাক্যটি সুস্পষ্ট কুফর, তাহলে:
- তাওয়িল ধরা যাবে না — কারণ তাওয়িল তখনই গ্রহণযোগ্য যখন বাক্যে দ্ব্যর্থতার সুযোগ থাকে।
- তাকে অবিলম্বে তাওবা করতে হবে এবং কালিমা পড়ে ঈমান নবায়ন করতে হবে।
- নিকাহ ভেঙে যাবে — কারণ কাফির/মুরতাদের সাথে মুসলিম নারীর নিকাহ বহাল থাকে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ»
"আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহি পাঠানো হয়েছে— যদি আপনি শিরক করেন, তবে আপনার আমল নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" — (সূরা যুমার: ৬৫)
ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ মুরতাদ সম্পর্কে বলেন:
«الْمُرْتَدَّةُ تَبِينُ مِنْ زَوْجِهَا بِلَا طَلَاقٍ»
"মুরতাদ নারী কোনো তালাক ছাড়াই তার স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
৩. এতদিনের সহবাস ও গর্ভাবস্থার হুকুম
যদি নারী মুরতাদ হয় (কুফরি কথা বলার কারণে)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী:
- মুরতাদ হওয়ার সাথে সাথেই নিকাহ ভেঙে যায় (ফাসখ)।
- তাওবা করার আগ পর্যন্ত সহবাস হারাম।
- তাওবা করার পর পুনরায় নিকাহ করতে হবে (নতুন মোহর ও নতুন ইজাব-কবুলসহ)।
- এতদিনের সহবাসের জন্য কোনো হদ (শাস্তি) নেই, কারণ উভয়েই তখন নিকাহর ধারণায় ছিলেন; তবে এটি কবিরা গুনাহ। তাওবা করতে হবে।
- গর্ভস্থ সন্তান: যদি সহবাস নিকাহর ধারণায় হয়ে থাকে, তবে সন্তান পিতার সাথে নসব (বংশ) প্রমাণিত হবে; তবে তাওবা জরুরি।
ফাতাওয়া আলমগিরি:
«الْمُرْتَدَّةُ إذَا أَسْلَمَتْ فِي الْعِدَّةِ فَهِيَ عَلَى نِكَاحِهَا، وَإِنْ أَسْلَمَتْ بَعْدَ الْعِدَّةِ فَلَا بُدَّ مِنْ نِكَاحٍ جَدِيدٍ» "মুরতাদ নারী যদি ইদ্দতের ভেতরে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সে তার নিকাহর উপরই থাকবে; আর যদি ইদ্দতের পরে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে নতুন নিকাহ আবশ্যক।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ)
৪. করণীয় (ব্যবহারিক নির্দেশনা)
১. প্রথমে বাক্যটির প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপট যাচাই করুন — কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে উপস্থাপন করুন। ২. যদি সুস্পষ্ট কুফর প্রমাণিত হয় — অবিলম্বে তাওবা, কালিমা পাঠ, এবং নতুন নিকাহ। ৩. যদি দ্ব্যর্থক হয় — তাওয়িল গ্রহণ করুন, তবে তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। ৪. গর্ভাবস্থায় বিশেষ সতর্কতা — গর্ভবতী নারীর তাওবা ও ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগ দেওয়া। ৫. স্থানীয় মুফতি/দারুল ইফতার সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন; অনলাইন ফতোয়া চূড়ান্ত বিচারের বিকল্প নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের উপর অটল রাখুন এবং কুফরি বাক্য থেকে হেফাজত করুন। আমিন।