কুফরি কথা বললে ঈমান নষ্ট হয় কি না, কথার অন্য অর্থ থাকলে হুকুম কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
কুফরি কথা বললে ঈমান ও বিবাহের হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি তিনটি দিক নিয়ে: ১. কেউ কুফরি কথা বললে কি ঈমান নষ্ট হয়? ২. যদি ঐ কথার অন্য অর্থ হয় (অর্থাৎ বক্তা কুফর উদ্দেশ্য না করে থাকে)? ৩. এমতাবস্থায় তার বিবাহের কী হুকুম?
১. কুফরি কথা বললে ঈমান নষ্ট হয় কি?
মূলনীতি: কুফরি কথা বলা—তা উপহাস, বিদ্রূপ, অস্বীকার বা অবজ্ঞার সাথে হোক—ঈমান ভঙ্গকারী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ۞ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ (সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)
অর্থাৎ, তারা বলবে—আমরা তো কেবল কথা-বার্তা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে উপহাস করছিলে? ওজর পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করে ফেলেছ।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি (ইমাম ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার):
"الْكُفْرُ يَكُونُ بِالِاعْتِقَادِ وَبِالْقَوْلِ وَبِالْفِعْلِ" — কুফর সংঘটিত হয় বিশ্বাসে, কথায় ও কাজে। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ/বাবুল মুরতাদ)
ইমাম তাহাবি (আকিদাতুত তাহাবিয়া): ঈমান হলো মুখে স্বীকার + অন্তরে বিশ্বাস; আর কুফরি হলো এর বিপরীত—যা মুখে উচ্চারণ বা অন্তরে বিশ্বাসে সংঘটিত হয়।
তবে শর্ত: কুফরি কথা বলার সময় বক্তার নিয়ত/উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচ্য। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন—কোনো কথা কুফর হবে কি না তা নির্ভর করে বক্তার قصد (ইচ্ছা) ও معنى (অর্থ)-এর উপর; যদি বাহ্যত কুফরি শব্দ হয় কিন্তু বক্তা কুফর উদ্দেশ্য না করে এবং শব্দের অন্য সহীহ অর্থ হয়, তবে সাধারণত কুফর হবে না—তবে এতে ঝুঁকি রয়েছে এবং আলেমদের কাছে তাওবা ও কালিমা পুনরায় পড়া কর্তব্য।
২. যদি কথার অন্য অর্থ হয়?
এখানে দুটি অবস্থা:
(ক) বক্তা কুফর উদ্দেশ্য করেনি, শব্দের সহীহ অন্য অর্থ রয়েছে: হানাফি উসূল অনুযায়ী—"لَا كُفْرَ مَعَ التَّأْوِيلِ" (তাওয়িল/অন্য অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা থাকলে কুফর সাব্যস্ত হয় না)। ইমাম ইবনে আবিদিন (রাদ্দুল মুহতার) ও ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে—যদি শব্দটি কুফর ও ঈমান উভয় অর্থ বহন করে এবং বক্তা ঈমানের অর্থই নিয়েছে, তবে কুফর হবে না। তবে সতর্কতা: এ ধরনের কথা মুমিনের মুখে শোভনীয় নয়; তাওবা ও ইস্তিগফার করা কর্তব্য।
(খ) বাহ্যত কুফরি, কিন্তু বক্তা দাবি করছে "অন্য অর্থ ছিল": এক্ষেত্রে বিচার হবে বাহ্যিক অর্থ ও প্রেক্ষাপটের উপর। যদি বাহ্যিক অর্থই স্পষ্ট কুফরি হয় এবং বক্তার দাবি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে আলেমগণ কুফর সাব্যস্ত করবেন। আর যদি সত্যিই সহীহ তাওয়িল থাকে, তবে কুফর হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ: এ ধরনের জটিল মাসআলায় নির্ভরযোগ্য মুফতি/দারুল ইফতায় স্বশরীরে গিয়ে সরাসরি বিষয়টি খুলে বলা আবশ্যক; কারণ এটি ঈমান-বিবাহ-সম্পর্কিত সংবেদনশীল মাসআলা।
৩. তার বিবাহের হুকুম
হানাফি ফিকহের মূলনীতি (আল-হিদায়া, রাদ্দুল মুহতার):
- যদি প্রকৃতপক্ষে কুফর সাব্যস্ত হয় (কুফরি কথা নিশ্চিতভাবে বলা হয়েছে, তাওয়িলের সুযোগ নেই), তবে মুরতাদ হওয়ার কারণে তার নিকাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যায় (ফাসখ)। মুরতাদ পুরুষ/নারীর সাথে মুসলিমের নিকাহ বহাল থাকে না।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মুরতাদ নারীর নিকাহ সাথে সাথে ভঙ্গ হয়; মুরতাদ পুরুষের ক্ষেত্রেও নিকাহ ভঙ্গ হয়।
- রাদ্দুল মুহতার: "إِذَا ارْتَدَّ أَحَدُ الزَّوْجَيْنِ انْفَسَخَ النِّكَاحُ" — স্বামী-স্ত্রীর একজন মুরতাদ হলে নিকাহ ফাসখ হয়ে যায়।
- তবে তাওবা করলে (কালিমা পড়ে, কুফরি কথা থেকে ফিরে এলে) এবং ইদ্দতের ভেতর তাওবা করলে—ইমাম আবু হানিফার মতে নিকাহ পুনরায় বহাল হয় (নতুন করে আকদ ছাড়াই)। ইদ্দত পার হয়ে গেলে নতুন মোহর ও নতুন আকদে নিকাহ করতে হবে।
- আর যদি তাওয়িলের কারণে কুফরই সাব্যস্ত না হয়, তবে ঈমান ও নিকাহ উভয়ই বহাল থাকে; কোনো ফাসখ হয় না।