পড়াশোনার সময় ইয়ারফোনে তেলাওয়াত শোনা জায়েয কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শায়েখ আমি কি আমার একাডেমিক পড়াশুনা করতে করতে কানে ইয়ারফোনে কুরআন তেলওয়াত শুনতে পারবো?
দেখা যায় নশিদ শুনা হয়,এবং এটার পরিমান বেড়ে যাচ্ছে.. যেদিন থেকে শুনেছি তেলওয়াত শুনা একটি সতন্ত্র আমল। শুনলে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, কিন্তু আমি যদি নশিদের বদলে তেলওয়াত শুনি এটা তো আমার সাব-কনশাস মাইন্ডে অন্তত থাকবে, তাই নয় কি?
আমার করনীয় কি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
জবাব
আপনার দ্বীনী সচেতনতা এবং কুরআনের আদব ও সম্মান রক্ষার এই আকুলতা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
একাডেমিক পড়াশোনা বা অন্য কোনো মনোযোগের কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় কানে ইয়ারফোনে কুরআন তিলাওয়াত শোনা সংক্রান্ত ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত:
পড়াশোনা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে গভীরভাবে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় ব্যাকগ্রাউন্ডে বা ইয়ারফোনে কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে রাখা ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাকরূহ (অনুচিত ও আদব পরিপন্থী)।
অতএব, একাডেমিক পড়াশোনা করার সময় ইয়ারফোনে কুরআন তিলাওয়াত না শুনে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করাই শরীআতসম্মত এবং তিলাওয়াত শোনার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করা উচিত।
২. ফিকহী ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য দলীল:
১. কুরআন শোনার বাধ্যবাধকতা ও মনোযোগের শর্ত: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآَنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾ (অর্থ: আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে তা শোনো এবং চুপ থাকো; যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করা হয়।—সূরা আরাফ: ২০৪)।
কুরআন তিলাওয়াত শোনা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। এর প্রধান আদব ও শর্ত হলো—শ্রোতা পূর্ণ মনোযোগ (ইনসাত) দিয়ে তা শ্রবণ করবে। পড়াশোনা করার সময় মন ও মস্তিষ্ক যেহেতু পড়ালেখার বিষয়বস্তুতে নিবদ্ধ থাকে, ফলে কুরআনের প্রতি কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ ও সম্মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
২. কাজে ব্যস্ত ব্যক্তির নিকট তিলাওয়াতের মাকরূহাত: ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে:
«لا يقرأ عند المشتغلين بالأعمال» (অর্থ: কোনো কাজে বা পড়াশোনায় ব্যস্ত ব্যক্তিদের সামনে/নিকট উচ্চস্বরে কুরআন পড়া বা তেলাওয়াত চালানো মাকরূহ)।
যেহেতু কাজের ব্যস্ততার দরুন শ্রবণকারী কুরআনের আয়াতের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে সক্ষম হয় না, তাই এতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কুরআনের প্রতি অসতর্কতা বা অনীহা প্রকাশ পায়।
৩. সাব-কনশাস মাইন্ডের (অবচেতন মন) ফিকহী উত্তর: অবচেতন মনে তিলাওয়াত থাকার চিন্তা করলেও শরীআতের প্রকাশ্য আদব ও তাহজীম (সম্মান) সর্বাগ্রে কাঙ্ক্ষিত। ইবাদতের ক্ষেত্রে কেবল অবচেতন অনুভূতি যথেষ্ট নয়; বরং সজ্ঞান মনোযোগ ও সুনির্দিষ্ট আদব রক্ষা করাই ইসলামের বিধান।
৩. আপনার করণীয় ও আমলি রূপরেখা:
১. পড়াশোনার সময়: পড়াশোনার সময় কান ও মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণরূপে পড়াশোনাতেই নিয়োজিত রাখুন। কোনো তিলাওয়াত বা শব্দ ছাড়া নিবিষ্ট মনে পড়াশোনা করাই শরীআতের আদব এবং পড়ালেখার সফলতার জন্য উপকারী। ২. নশীদ শোনার অভ্যাসের ব্যাপারে: পড়াশোনার ক্লান্তি দূর করতে অনর্থক বা সুরনির্ভর নশীদ পরিহার করে পড়াশোনার বিরতিতে শরীর-মন সতেজ করার স্বাভাবিক উপায় অবলম্বন করতে পারেন। ৩. কুরআন তিলাওয়াত শোনার সঠিক পদ্ধতি: দিন-রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন: ঘুমাবার আগে, ফজরের পর বা অবসরের কোনো শান্ত সময়ে) ১০-১৫ মিনিট ইয়ারফোনে বা স্পীকারে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত শুনুন। এতে কুরআন শোনার সওয়াব অর্জিত হবে এবং কুরআনের মহান আদবও অটুট থাকবে।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪২৯, ৪৩০ (অধ্যায়: 'মোবাইল: আদাব ও মাসাইল — কাজে বা পড়াশোনায় ব্যস্ত মানুষের নিকট তিলাওয়াত করা বা শোনা মাকরূহ হওয়া সংক্রান্ত আল-বাহরুর রায়েক ও ফাতাওয়া কাযীখানের ফতোয়া')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৯১ (অধ্যায়: কিতাবুল কিরাআত — 'لا يقرأ عند المشتغلين بالأعمال — কাজ বা পড়াশোনায় ব্যস্ত ব্যক্তির নিকট তেলাওয়াত করা বা সাউন্ড ছেড়ে রাখা মাকরূহ হওয়া')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৭ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৭১, ৭২, ১৫২ (অধ্যায়: বাবুল কিরাআত — 'সূরা আরাফের ২০৪ নং আয়াতের আলোকে তিলাওয়াত শোনার বাধ্যবাধকতা ও আদাব')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৩য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২০৯ (অধ্যায়: বাবুল আদাব — 'কুরআন কারীম শ্রবণের সুনির্দিষ্ট আদাব, মনোযোগের শর্তাবলী এবং গোনাহ থেকে বাঁচবার ফিকহী বিধান')।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।