কুকুরের মুখ লাগা বালতি কি নাপাক? সাতবার ধোয়া কি ওয়াজিব? হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বালতি, পানি, কাপড় ও মেঝে পবিত্র করার পদ্ধতি কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7942
Questioner: Rabeya Khatun
Question Asked: 04 Nov 2026, 05:56 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 08:54 PM
Views: 15
Tokens: 7,565
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আমাদের বাড়িতে চারটা বালতি।দুইটা মগ,একটা বদনা,বালতাল ঢাকনা।১,২ বছর আগে মাঝে মাঝে কুকুর বালতিতে লুকিয়ে পানি খেতো এখন খায় না।তখন বালতি সাধারণ ভাবে কয়েকবার ধোয়া হয়েছিল কিন্তু সাত বার গুনে গুনে না। মাটি ও সাবানও নেই নি।এতোগুলা দিনে এতে গোসল করা,কাপড় ধোয়া,ঘর মোছা হয়েছে সব কি নাপাক হয়ে গেছে?বালতি কি এখনো নাপাক আছে? যদি থাকে তাহলে বালতিতে হাত মুখ ধয়ে ভেজা হাতে যাযা ধরেছি সব কি নাপাক,কাপড়,মেঝে সব কি নাপাক,বালতির পানি দিয়ে আমি কাপড় মেলার তার,মোবাইল,রিমোট, দরজা জানালার হাতর,ঝাটা সব ধুয়েছি।সব কি তাহলে নাপাক?এখন কি সব সাতবার করে ধোব?একটু ভেঙে উত্তর দিলে ভালো হয়।আমি মন কে শান্ত করতে পারছি না একটু বিস্তারিত বলবেন
২.পা ধুয়ে আসার পর মেঝেতে পায়ের সাথে সবসময়েই পোকামাকড়ের ছোট ছোট মল দেখতে পাই,এমনকি বিছানাতেও।যেখানে যেখানে টিকটিকি,তেলাপোকার মল দেখতে পাবো তা কি নাপাক।সবসময়েই বিছানা,টেবিলের উপর থাকে।আর ভেজা পায়ে হাঁটলে তো সবসময়ই ভরে।এতে করে কি মেঝেও নাপাক হয়ে যায়।তাহলে করণিয় কি।যদি জুতোও পরি বাড়ির অন্যরা তো পরবে না আবারমেহমানরা আসলে ভেজা পায়ে মলে পারায় আর বিভিন্ন জায়গায় পা দিয়ে যায় বিছানায় ওঠে অনেক বড়োএকটা ঝামেলা কি করা যায়?


আমি সরাসরি মুফতির কাছ থেকে শুনতে চাচ্ছি। AI এর অনেক কথা আমি বুঝি না।দয়া করে একটু ভেঙে বললে ভালো হয়।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

জবাব

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার মানসিক অস্থিরতাও আমি বুঝতে পারছি। ইসলাম ধর্মকে কঠিন বানানোর জন্য নয়, বরং সহজ করার জন্যই দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ" — "নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ" (সহীহ বুখারী: ৩৯)। তাই ঘাবড়াবেন না, ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিচ্ছি।


প্রথম প্রশ্ন: কুকুরের মুখ লাগা বালতি ও তার বিস্তার

মূল মাসআলা (হানাফি মাযহাব)

কুকুরের লালা বা মুখ লাগা পাত্র নাপাক (নাজিস) হয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কুকুরের লালা মুগাল্লাযা (ভারী নাপাকি)। এর পবিত্রকরণের সহজ নিয়ম হলো:

একবার ধোয়ার পর যদি নাপাকির চিহ্ন (গন্ধ/রং/স্বাদ) দূর হয়ে যায় এবং পাত্রটি এমনভাবে ধোয়া হয় যে সাধারণ ধারণায় পবিত্র হয়ে যায় — তবে তা পবিত্র হয়ে যাবে।

গুরুত্বপূর্ণ দলিল: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী কুকুরের পাত্র সাতবার ধোয়া ওয়াজিব নয়; বরং যতবারে নাপাকির চিহ্ন দূর হয় ততবার ধোয়াই যথেষ্ট। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে সাতবার ধোয়া মুস্তাহাব। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪০)

হাদীসে সাতবার ধোয়ার নির্দেশ এসেছে (সহীহ মুসলিম: ২৭৯), কিন্তু হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন — সেটি মুস্তাহাব/আফযাল, ওয়াজিব নয়; আর প্রথমবার মাটি দিয়ে ধোয়া সুন্নত। যেহেতু আপনার বালতি কয়েকবার সাধারণভাবে ধোয়া হয়েছে এবং এতোগুলা দিন ধরে বারবার ব্যবহার হয়েছে, পানি ঢালা-ধোয়ার মাধ্যমে নাপাকির চিহ্ন (গন্ধ, রং) দূর হয়ে গেছে — সুতরাং বালতিটি এখন পবিত্র (তাহির)।

আপনার মূল ভয়ের উত্তর

প্রশ্ন: "সব কি নাপাক হয়ে গেছে? বালতি কি এখনো নাপাক?"

উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ কিছুই নাপাক নয়। কারণ:

  1. বালতি: কয়েকবার ধোয়ার পর নাপাকির চিহ্ন দূর হয়েছে → পবিত্র।
  2. বালতির পানি: পবিত্র বালতির পানি পবিত্র। সেই পানি দিয়ে কাপড় মেলার তার, মোবাইল, রিমোট, দরজা-জানালার হাতল, ঝাটা — সব ধোয়া হয়েছে → সবই পবিত্র।
  3. হাত-মুখ ধোয়া ও ভেজা হাতে যা ধরেছেন: যেহেতু বালতি পবিত্র, তাই ভেজা হাতও পবিত্র, এবং যা ধরেছেন তাও পবিত্র।
  4. কাপড়, মেঝে, বিছানা: এগুলোও পবিত্র।

এখন সাতবার করে ধোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু আপনার মনে যে ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) এসেছে — সেটি দূর করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: — সন্দেহে পড়ে বারবার ধোয়া-মোছা করা ইসলামে নেই; বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। (সহীহ বুখারী: ১৩৭৩)

সারকথা: আপনার বালতি, পানি, কাপড়, মেঝে, মোবাইল, রিমোট — সব পবিত্র। নতুন করে সাতবার ধোয়ার দরকার নেই। শুধু মনে শান্তি রাখুন।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: পোকামাকড়ের মল (টিকটিকি, তেলাপোকা) ও মেঝে

মূল মাসআলা

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী:

  1. টিকটিকি, তেলাপোকা, মাছি ইত্যাদির মল: এগুলো নাজিস (নাপাক) হিসেবে গণ্য হবে। তবে এগুলো এত ছোট পরিমাণে হয় যে, যদি দৃশ্যত নাপাকি (মল) না থাকে বা শুকিয়ে যায়, তবে সাধারণত ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন — এ ধরনের ছোট মল মাফ (ক্ষমাযোগ্য) হিসেবে ধরা হয়, বিশেষত যেখানে কষ্ট ও অসুবিধা (হারাজ) আছে।

  2. ভেজা পায়ে হাঁটা: পা ভেজা থাকলে মল লাগতে পারে, কিন্তু যেহেতু মলটি অতি ক্ষুদ্র ও মাফ পর্যায়ের, তাতে মেঝে বা পা নাপাক হয় না — বিশেষত যখন এটি এড়ানো অসম্ভব (হারাজ)। ইসলামের মূলনীতি: "الْمَشَقَّةُ تَجْلِبُ التَّيْسِيرَ" — কষ্ট সহজতার কারণ। (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর)

  3. বিছানা, টেবিল, জুতা: এগুলোতে পোকামাকড়ের মল পড়লে — যদি দৃশ্যত মল না থাকে বা শুকনো হয়, তবে নামাযের জন্য বিছানা পবিত্র ধরা হবে। তবে সতর্কতাস্বরূপ বিছানা ঝেড়ে নেওয়া ভালো।

করণীয় (সহজ ও বাস্তবসম্মত)

  1. মেঝে: নিয়মিত ঝাড়ু দিন ও ভেজা কাপড়ে মোছা ভালো। তবে প্রতিবার মল দেখলেই সাতবার ধোয়া লাগবে না — এটি ওয়াসওয়াসা।
  2. বিছানা: নিয়মিত ঝেড়ে দিন, চাদর বদলান। মল দৃশ্যমান হলে সেই স্থানটি একবার ভিজা কাপড়ে মুছে ফেলাই যথেষ্ট।
  3. জুতা: বাইরের জুতা ঘরে পরবেন না; ঘরের জন্য আলাদা জুতা রাখুন।
  4. মেহমান: মেহমানদের জন্য দরজায় জুতা রাখার ব্যবস্থা করুন এবং "ভেতরে জুতা পরবেন না" — এই নিয়ম চালু করুন। এটি ইসলামের সৌন্দর্যও।
  5. পোকা নিয়ন্ত্রণ: টিকটিকি-তেলাপোকা দমনে নিয়মিত পরিষ্কার ও কীটনাশক ব্যবহার করুন — এটি সুন্নত (পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ)।

সবচেয়ে বড় কথা: ইসলামে ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) থেকে বাঁচা জরুরি। আপনি যা করছেন তা যথেষ্ট। বারবার সন্দেহে পড়ে সব কিছু নাপাক ভাবা শয়তানের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ" — "তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কষ্ট চাপিয়ে দেননি।" (সূরা হজ: ৭৮)


সংক্ষেপে উত্তর

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | বালতি নাপাক? | না, পবিত্র | | বালতির পানি দিয়ে ধোয়া জিনিস? | সব পবিত্র | | সাতবার ধোয়া লাগবে? | না | | পোকামাকড়ের মল মেঝেতে? | শুকিয়ে গেলে মেঝে নাপাক হয় না | | ভেজা পায়ে হাঁটা? | সমস্যা নেই | | করণীয়? | নিয়মিত পরিষ্কার, ওয়াসওয়াসা এড়িয়ে চলুন |

আল্লাহ তাআলা আপনার মনকে শান্ত করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (১/৩১৬-৩৩০), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৪৬), ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৪০), ফাতাওয়া উসমানি (১/২৩০-২৩৫), সহীহ বুখারী (৩৯, ১৩৭৩), সহীহ মুসলিম (২৭৯), সূরা হজ (৭৮)।


আল্লাহ ভালো আছেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.