শাফিঈ ফিকহ অনুযায়ী অনিচ্ছাকৃত কামভাব বা OCD-এর ওয়াসওয়াসা কি হুরমতে মুসাহারাত (শ্বশুর-সম্পর্কীয় নিষিদ্ধতা) সাব্যস্ত করে?
Waswasa-OCD · Shafei
Question
Answer
উত্তর: অনিচ্ছাকৃত কামভাব ও হুরমতে মুসাহারাত
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا ۗ وَكَانَ رَبُّكَ قَدِيرًا
“তিনিই পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তাকে রক্তগত বংশীয় সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্কযুক্ত করেছেন। আর আপনার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান।” (সূরা ফুরকান: ৫৪)
হুরমতে মুসাহারাত কী?
‘হুরমতে মুসাহারাত’ বলতে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট সেই নিষিদ্ধতাকে বোঝায়, যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু আত্মীয়কে স্থায়ীভাবে বিবাহ করা হারাম হয়ে যায়।
আরবি ভাষায়:
হুরমত = সম্মান ও নিষিদ্ধতা মুসাহারাত = বৈবাহিক আত্মীয়তা
ফিকহের গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
المصاهرة: وصف شبيه بالقرابة
মুসাহারাত এমন এক সম্পর্ক, যা আত্মীয়তার অনুরূপ মর্যাদা লাভ করে।
এ সম্পর্ক মূলত চার ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাব্যস্ত হয়:
১. পুত্রবধূ — কন্যার মতো মর্যাদা লাভ করে। ২. স্ত্রীর কন্যা — কন্যার মতো মর্যাদা লাভ করে। ৩. পিতার স্ত্রী — মায়ের মতো মর্যাদা লাভ করে। ৪. স্ত্রীর মা — মায়ের মতো মর্যাদা লাভ করে।
(আল-ফিকহু আলাল মাজাহিবিল আরবাআহ, ৪/৬১)
মাহরাম হওয়ার ভিত্তিসমূহ
মানুষের মধ্যে বৈধ-অবৈধ বিবাহের বিধান সাধারণত তিন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত:
১. নসব (বংশগত সম্পর্ক)
যেমন:
পিতা তার কন্যাকে বিবাহ করতে পারবে না। ভাই তার বোনকে বিবাহ করতে পারবে না। ২. রেযা'আত (দুধ সম্পর্ক)
যেমন:
দুধ সন্তান তার দুধ-মাকে বিবাহ করতে পারবে না। দুধ বোনকে বিবাহ করতে পারবে না। ৩. মুসাহারাত (বৈবাহিক সম্পর্ক)
যেমন:
জামাতা তার শাশুড়িকে বিবাহ করতে পারবে না। কেউ তার পুত্রবধূকে বিবাহ করতে পারবে না।
কুরআনে কারিমে যেসব নারীদের বিবাহ করা হারাম বলা হয়েছে, সেগুলো মূলত উপরোক্ত তিন ধরনের সম্পর্কেরই অন্তর্ভুক্ত।
বৈবাহিক সম্পর্ক কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
বৈধ বিবাহ সংঘটিত হলে হুরমতে মুসাহারাত প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে:
পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম হয়। পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম হয়। স্ত্রীর মা ও কন্যাকে বিবাহ করা হারাম হয়।
কারণ, তাদের সাথে বৈবাহিক আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
যিনার দ্বারা কি হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
প্রথম মত
যিনা ও অবৈধ সহবাসের দ্বারাও হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে।
এটি:
হানাফি মাযহাব হাম্বলি মাযহাব ইমাম আওযায়ী রহ. ইমাম সাওরী রহ.
এর মত।
দলিল ১. কুরআনের আয়াত
وَلَا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ مِنَ النِّسَاءِ
“তোমাদের পিতারা যেসব নারীকে বিবাহ করেছে, তোমরা তাদের বিবাহ করো না।”
(সূরা নিসা: ২২)
এ মতের প্রবক্তাদের মতে, এখানে “নিকাহ” শব্দ দ্বারা কেবল বিবাহ নয়; সহবাসও উদ্দেশ্য হতে পারে। সুতরাং বৈধ বা অবৈধ যেকোনো প্রকার সহবাসের ফলেও নিষিদ্ধতা সৃষ্টি হবে।
২. হাদিস
لا ينظر الله إلى رجل نظر إلى فرج امرأة وابنتها
“আল্লাহ ঐ ব্যক্তির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না, যে কোনো নারী ও তার কন্যার লজ্জাস্থানের দিকে তাকায়।”
৩. কিয়াস
বৈধ সহবাসের ফলে যখন হুরমত প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন অবৈধ সহবাসের ফলেও তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
দ্বিতীয় মত
যিনার মাধ্যমে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না।
এটি:
শাফেয়ী মাযহাব মালিকী মাযহাব ইবনে হাযম জাহিরী ইমাম আহমদ রহ.-এর একটি বর্ণনা
এর মত।
দলিল ১. মূলনীতি
কুরআনে যাদেরকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের বাইরে অন্য কাউকে হারাম বলা যাবে না।
২. কুরআনের আয়াত
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا
(সূরা ফুরকান: ৫৪)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বৈবাহিক সম্পর্ককে একটি নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই অবৈধ কাজের মাধ্যমে এমন বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে না।
৩. হাদিস
لا يحرم الحرام الحلال
“হারাম কোনো বিষয় হালালকে হারাম করে না।”
কোন মত অধিক গ্রহণযোগ্য?
সতর্কতা ও ইহতিয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে হানাফি মাযহাবের মতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে বেপর্দা, অবাধ মেলামেশা ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথ অধিকতর রুদ্ধ হয় এবং সমাজে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা পায়।
হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার মাধ্যম
হুরমতে মুসাহারাত মূলত তিনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়:
১. নিকাহ (বিবাহ) ২. ওতি বা সহবাস ৩. দাওয়াঈয়ে ওতি (সহবাসের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে এমন বিষয়)
যেমন:
কামভাবসহ স্পর্শ কামভাবসহ লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টি কামভাবপূর্ণ স্পর্শের দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার শর্তসমূহ
বিবাহ বহির্ভূত স্পর্শ বা সহবাস দ্বারা হুরমতে মুসাহারাত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে।
১. সরাসরি স্পর্শ বা পাতলা আবরণের মাধ্যমে স্পর্শ
এমন কাপড়ের উপর দিয়ে স্পর্শ করতে হবে যাতে শরীরের উষ্ণতা অনুভূত হয়।
যদি মোটা কাপড়ের কারণে উষ্ণতা অনুভূত না হয়, তাহলে হুরমত সাব্যস্ত হবে না।
২. কামভাবের উপস্থিতি
স্পর্শের সময় পুরুষ বা নারী উভয়ের যেকোনো একজনের মধ্যে কামভাব সৃষ্টি হতে হবে।
পুরুষের ক্ষেত্রে লিঙ্গ উত্তেজিত হওয়া। পূর্ব থেকে উত্তেজিত থাকলে তাতে বৃদ্ধি পাওয়া। নারীর ক্ষেত্রে অন্তরে কামভাব অনুভূত হওয়া। পূর্ব থেকে থাকলে তা বৃদ্ধি পাওয়া। ৩. স্পর্শের সময়ই কামভাব থাকতে হবে
স্পর্শ করার পর বা অনেকক্ষণ পরে কামভাব সৃষ্টি হলে হুরমত সাব্যস্ত হবে না।
অর্থাৎ, স্পর্শ ও কামভাব একই সময়ে বিদ্যমান থাকতে হবে।
৪. তাৎক্ষণিক বীর্যপাত না হওয়া
যদি কামভাবের সঙ্গে সঙ্গে বীর্যপাত হয়ে যায়, তাহলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না।
কারণ ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন, এ ক্ষেত্রে তা সহবাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর্যায়ে গণ্য হয় না।
৫. বয়সের শর্ত নারীর বয়স কমপক্ষে ৯ বছর হতে হবে। পুরুষের বয়স কমপক্ষে ১২ বছর হতে হবে।
(হুরমতে মুসাহারাত, পৃষ্ঠা: ১৯)
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
উপরোক্ত সকল শর্ত পূরণ হলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে যাবে।
এ ক্ষেত্রে:
ব্যক্তি জাগ্রত থাকুক বা ঘুমন্ত থাকুক, হুকুম প্রযোজ্য হবে। তবে শুধু স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না। উপসংহার
হুরমতে মুসাহারাত ইসলামী পারিবারিক বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মাধ্যমে পারিবারিক মর্যাদা, আত্মীয়তার সম্মান এবং সমাজের নৈতিক নিরাপত্তা সংরক্ষিত হয়। যিনা ও অবৈধ সম্পর্কের ফলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, সতর্কতামূলকভাবে হানাফি মাযহাবের অবস্থান গ্রহণ করাকে অধিক নিরাপদ ও ইহতিয়াতপূর্ণ মনে করা হয়।
শাফয়ী মাযহাবমতে যিনা ব্যভিচার, এবং অবৈধ স্পর্শ দ্বারা হুরমত প্রমাণিত হবে না।
আল্লাহ ভালো জানেন।