বাবার টাকা গুনাহে খরচ করেছি, এখন করণীয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (হানাফি ফিকহ)
প্রশ্নের সারমর্ম
প্রশ্নকারী বলছেন: তিনি খুব একটা বাইরে যান না; অনেকদিন পর বাবার টাকা নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন; বের হয়ে শয়তানের প্ররোচনায় একটি গুনাহে (যিনা) জড়িয়ে পড়েন। এখন তিনি দুটি বিষয়ে গভীর অনুতাপ ও কষ্টে ভুগছেন: (১) আল্লাহকে কষ্ট দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে, (২) বাবার টাকা এভাবে খরচ করেছেন।
প্রথমত: গুনাহের বিধান ও তাওবার পদ্ধতি
যিনা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা ইসরা ১৭:৩২)
তবে নিরাশ হওয়া মুমিনের পথ নয়। আল্লাহর রহমত অপরিসীম:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন: হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" (সূরা যুমার ৩৯:৫৩)
তাওবার শর্ত (রাদ্দুল মুহতার, ইমদাদুল ফাতাওয়া অনুযায়ী): ১. সাথে সাথে গুনাহ বন্ধ করা। ২. অন্তরে প্রকৃত অনুতাপ — যা আপনার মধ্যে আছে, এটাই ঈমান ও তাকওয়ার নিদর্শন। ৩. আর কখনো ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প। ৪. যদি বান্দার হক (হক্কুল ইবাদ) জড়িত থাকে, তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া। ৫. যদি শুধু আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয় হয়, তবে তাওবাই যথেষ্ট — যিনা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয় (তবে গর্ভ বা সন্তান জন্মালে আলাদা বিধান)।
গুরুত্বপূর্ণ: এই গুনাহ প্রকাশ করবেন না। নবী ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন।" (সহিহ মুসলিম) গোপনে তাওবা করলে ক্ষমা হয়; পরিবারকে স্বীকার করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ ও নিজের মধ্যে রাখুন এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন।
দ্বিতীয়ত: বাবার টাকা
বাবার টাকা বৈধ কাজে (ঘুরতে যাওয়া) দেওয়া হয়েছিল। বেড়ানোর সময় সংঘটিত গুনাহ টাকাটিকে হারাম করে না, কারণ টাকা বেড়ানোয় খরচ হয়েছে, সরাসরি গুনাহে নয়। তবে:
- যদি টাকার কোনো অংশ সরাসরি গুনাহে খরচ হয় (যেমন: গুনাহের স্থানের ভাড়া, গুনাহের জন্য যাতায়াত, অপর পক্ষকে উপহার), সেই পরিমাণ বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত; আর যদি ফিরিয়ে দিলে গুনাহ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে বাবার পক্ষ থেকে সদকা করা যাবে দামান (ক্ষতিপূরণ)-এর নিয়তে, সাথে ইস্তিগফার। এটাই হানাফি ফকিহদের অবস্থান — দেখুন রাদ্দুল মুহতার (কিতাবুল গাসব) এবং ফাতাওয়া উসমানি (তা'উইদ আনিল মাল বিষয়ে)।
- যদি টাকা শুধু বেড়ানোয় (খাবার, যাতায়াত) খরচ হয় এবং গুনাহ পার্শ্ববর্তীভাবে ঘটে, তবে টাকা হারাম নয়, ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন নেই; শুধু তাওবা আবশ্যক।
তৃতীয়ত: "আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া"
আল্লাহ কষ্ট ও ক্ষতি থেকে পবিত্র — তিনি আল-গানী, আল-আযীয। এর অর্থ হলো গুনাহ আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এবং তাঁর ক্রোধ অর্জন করে। কুরআনে এসেছে:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ (সূরা আহযাব ৩৩:৫৭)
তাই আপনার এই কষ্ট আসলে একটি নিয়ামত — এটি প্রমাণ করে আপনার অন্তরে হায়া (লজ্জা) ও তাকওয়া এখনো আছে। নবী ﷺ বলেছেন: "অনুতাপই তাওবা।" (মুসনাদ আহমাদ, সুনান ইবনে মাজাহ) আর: "আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন, যে মরুভূমিতে তার হারানো উট খুঁজে পায়।" (সহিহ বুখারি, মুসলিম)
চতুর্থত: ব্যবহারিক পদক্ষেপ
১. এখনই তাওবা করুন — উপরোক্ত শর্তসহ। বিলম্ব করবেন না। ২. নিরাশ হবেন না — সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠার আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা। ৩. নেক আমল বাড়ান — কুরআনে এসেছে: "নিশ্চয়ই নেক আমল মন্দ আমলকে মুছে দেয়" (সূরা হুদ ১১:১১৪)। নামাজ পড়ুন, সদকা দিন, রোজা রাখুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন। ৪. দৃষ্টি ও সঙ্গ রক্ষা করুন — যে পরিস্থিতিতে গুনাহ হয়েছে তা এড়িয়ে চলুন (একা বাইরে যাওয়া, মেলামেশা, ফোনে যোগাযোগ ইত্যাদি)। নবী ﷺ বলেছেন: "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে, তাই তোমাদের প্রত্যেকে দেখে নিক সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি) ৫. বাবাকে বলবেন না — উপরে বলা হয়েছে গুনাহ গোপন করুন। টাকার বিষয়টি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করে সমাধান হলে তা যথেষ্ট। ৬. যদি গর্ভ বা সন্তান হয়ে থাকে, তবে একজন যোগ্য হানাফি মুফতির সাথে গোপনে পরামর্শ করুন — নাসাব, ইদ্দাহ ও হিদানাহ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান আছে যা সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। ৭. একজন বিশ্বস্ত মহিলা আলিমা বা মুফতির কাছে নিয়মিত দিকনির্দেশনা নিন এবং দুআ অব্যাহত রাখুন: "ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দীনিক।"
উপসংহার
আপনার অনুতাপ নিজেই ঈমানের প্রমাণ। আল্লাহর আপনার টাকার বা কষ্টের প্রয়োজন নেই — তিনি চান আপনার আন্তরিক প্রত্যাবর্তন। তাওবা করুন, গুনাহ গোপন করুন, সরাসরি গুনাহে খরচ হওয়া টাকা ফেরত দিন বা সদকা করুন, এবং আনুগত্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। শয়তান আপনাকে গুনাহে ফেলার পর নিরাশায় ফেলার দ্বিতীয় ফাঁদে পা দেবেন না। "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা ২:২২২)
আল্লাহ ভালো জানেন।