বাচ্চাদের ছবি ফুলের স্টিকার দিয়ে ঢেকে ফেসবুকে আপলোড করলে বদনজর আটকানো সম্ভব কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
বাচ্চাদের ছবি ফুলের স্টিকার দিয়ে ঢেকে ফেসবুকে আপলোড করা এবং বদনজর প্রতিরোধ
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, শুধু মুখে ফুলের স্টিকার লাগিয়ে ছবি আপলোড করলে বদনজর সম্পূর্ণভাবে আটকানো যায় না। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে বদনজর থেকে বাঁচার আসল উপায় হলো শরীয়তসম্মত দোয়া-আযকার, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) এবং ছবি প্রকাশে সংযম অবলম্বন করা।
১. বদনজরের হাকিকত (বাস্তবতা)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«الْعَيْنُ حَقٌّ» — "বদনজর সত্য।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৪০; সহীহ মুসলিম: ২১৮৭)
অন্য হাদীসে:
«الْعَيْنُ حَقٌّ، وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ لَسَبَقَتْهُ الْعَيْنُ» — "বদনজর সত্য; যদি কোনো কিছু তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে বদনজর তা অতিক্রম করত।" (সহীহ মুসলিম: ২১৮৮)
ইমাম তহাবী (রহ.) ও ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) এ বিষয়ে আহলে সুন্নতের আকীদা বর্ণনা করেছেন যে, বদনজর আল্লাহরই তাকদীরের অংশ, তবে তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই কার্যকর হয় — স্বতন্ত্র কোনো শক্তি হিসেবে নয়। (আকীদাতুত তহাবীয়া; রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৩৪-৬৩৫)
২. বদনজর থেকে বাঁচার শরীয়তসম্মত উপায়
(ক) দোয়া ও আযকার
- আয়াতুল কুরসি ও সূরা ফালাক-নাস পড়া ও শিশুদের উপর ফুঁ দেওয়া।
- রাসূল ﷺ হাসান-হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়া পড়তেন:
«أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ» — "আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পূর্ণ কালিমার মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে আশ্রয় দিচ্ছি।" (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১)
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন আযকার নিয়মিত পড়া।
(খ) "মাশাআল্লাহ / তাবারাকাল্লাহ" বলা
যে ব্যক্তি কারো প্রশংসা করে, তার জন্য "মাশাআল্লাহ তাবারাকাল্লাহ" বলা মুস্তাহাব। হাদীসে এসেছে:
«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ» — "যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মধ্যে কোনো প্রশংসনীয় বস্তু দেখে, সে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৫০৯; মুসনাদে আহমাদ)
(গ) তাওয়াক্কুল ও ইয়াকীন
প্রকৃত হেফাজত আল্লাহর হাতে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন, বদনজর থেকে বাঁচার জন্য দোয়া-আযকার ও আল্লাহর উপর ভরসাই মূল অবলম্বন। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৩৪)
৩. স্টিকার দিয়ে মুখ ঢাকার বিষয়টি
- শরীয়তের দৃষ্টিতে স্টিকার বা ছবি ঢাকার মাধ্যমে বদনজর আটকানোর কোনো প্রমাণ নেই। এটি একটি সাধারণ ধারণা (উরফ), যা শরীয়তসম্মত প্রতিরোধ-উপায় নয়।
- বরং বদনজর আল্লাহর তাকদীরের অংশ; কেবল বাহ্যিক ঢাকনা দিয়ে তা প্রতিরোধ করা যায় না — এটি আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী ধারণায় পরিণত হতে পারে।
- তবে ছবি প্রকাশে সংযম রাখা, অপ্রয়োজনে শিশুকে বা শিশুর ছবি পাবলিক প্ল্যাটফর্মে না দেওয়া — এটি বাহ্যিক সতর্কতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং বদনজরের সম্ভাবনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া শিশুর ছবি তুলা বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে দেওয়াও জায়েয হবে না।
৪. বাচ্চাদের ছবি ফেসবুকে আপলোডের শরীয়ত বিধান
(ক) নাবালেগ শিশুর ছবি
শিশুর ছবি তুলা বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে দেওয়াও জায়েয হবে না।
(গ) ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের সাধারণ বিধান
ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে জীবন্ত প্রাণীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের নাজায়েয ও হারাম (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৫৬০; ইমদাদুল ফাতাওয়া; মাআরিফুল কুরআন)
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
- বদনজর থেকে বাঁচার জন্য নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস, মাসনূন দোয়া পড়ুন এবং শিশুদের উপর ফুঁ দিন।
- "মাশাআল্লাহ তাবারাকাল্লাহ" বলার অভ্যাস গড়ুন।
- শিশুর ছবি ফেসবুক আপলোড করবেন না — এটি বদনজর কমাতে বাহ্যিকভাবে সহায়ক এবং অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দেয়। এবং এতে হারামে পতিত হতে হবে না।
- স্টিকারের উপর ভরসা করবেন না — এটি শরীয়তসম্মত প্রতিরোধ-উপায় নয়; বরং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন।
- **শিশুর ছবি তুলা বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবেন।
উপসংহার
বদনজর সত্য, কিন্তু তা থেকে হেফাজতের একমাত্র ও প্রকৃত উপায় হলো আল্লাহর উপর ভরসা, মাসনূন দোয়া-আযকার এবং শরীয়তের নির্দেশনা মেনে চলা। ফুলের স্টিকার দিয়ে মুখ ঢেকে ছবি আপলোড করা বদনজর আটকানোর শরীয়তসম্মত উপায় নয়। বরং শিশুর ছবি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা নাজায়েয ও হারাম।
আল্লাহ ভালো জানেন।