হল বা হোস্টেলে বৈদ্যুতিক চুলা ও হিটার ব্যবহারের শরয়ী বিধান জানতে চাই?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7868
Questioner: Fahmida Faiza
Question Asked: 03 Nov 2026, 04:34 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 06:11 PM
Views: 9
Tokens: 5,694
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।আমাদের ভর্তির সময় একটা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে নেন যে আমরা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করবো না । কিন্তু এই নিয়ম হল কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিবর্তনশীল । সেভাবে আমাদের প্রতি ব্লকে সম্মিলিত ভাবে একটি বৈদ্যুতিক হিটার ব্যাবহারের অনুমতি আছে ।আর সেটা নিজেদের অর্থায়নে । এবং ২-১ জন ব্যতীত সবাই নিজেদের মতো রুমে চুলা ব্যবহার করে । কর্তৃপক্ষ জানলেও কোনো পদক্ষেপ নেননা ।ফলে সম্মিলিত ভাবে হিটার কিনতে কেউ রাজি হয়না । এমতাবস্থায় আমরা ২-৪ জন মিলে যদি একটি হিটার রুমে ব্যবহার করি তা কি জায়েজ হবে ?
এবং কেউ যদি তাদের রান্না খাবার আমাকে খেতে দেয় সেটা কি জায়েজ হবে ?

Answer

হল/হোস্টেলে রান্না ও বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহারের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীহলে ভর্তির সময় বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার না করার অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়, তবে কর্তৃপক্ষ নিয়ম পরিবর্তন করে প্রতি ব্লকে সম্মিলিতভাবে নিজেদের অর্থায়নে একটি বৈদ্যুতিক হিটারের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সহপাঠীরা নিজ নিজ রুমে চুলা ব্যবহার করছে, কর্তৃপক্ষ জানলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে সম্মিলিতভাবে হিটার কিনতে কেউ রাজি হয় না। এমতাবস্থায় ২-৪ জন মিলে একটি হিটার ব্যবহার করা এবং অন্যরা রান্না করা খাবার খেতে দিলে তা খাওয়ার বিধান কী?


১. মূল নীতি: চুক্তি ও অঙ্গীকার রক্ষা করা ফরজ

ইসলামে চুক্তি ও অঙ্গীকার পূর্ণ করা কঠোরভাবে নির্দেশিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো।" (সূরা মায়িদা: ১)

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا "আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ "মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত।" (সুনানে তিরমিযী: ১৩৫২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪)

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন যে, শর্ত বা চুক্তি ভঙ্গ করা গুনাহ, যদিও তা নিজের জন্য ক্ষতিকর হয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/৫০০ প্রসঙ্গ)

সুতরাং: ভর্তির সময় যে অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করা হয়েছে, তা একটি চুক্তি। এটি ভঙ্গ করা শরীয়তসম্মত নয়।


২. "কর্তৃপক্ষ জানে কিন্তু ব্যবস্থা নেয় না" — এতে অনুমতি প্রমাণিত হয় না

কোনো নিষিদ্ধ কাজ কেউ করছে জেনেও প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে তা বৈধ হয়ে যায় না। এটি নীরব সম্মতি (silent consent) নয়; বরং প্রশাসনিক অবহেলা মাত্র। ফিকহের মূলনীতি হলো:

الرِّضَا بِالْمُحَرَّمِ لَا يُحِلُّ الْمُحَرَّمَ "হারাম কাজে সন্তুষ্টি হারামকে হালাল করে না।"

তবে হ্যাঁ, যদি কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে লিখিত বা মৌখিকভাবে অনুমতি দেয়, তাহলে সেই অনুমতির ভিত্তিতে কাজ করা যাবে। প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে, প্রতি ব্লকে সম্মিলিতভাবে একটি বৈদ্যুতিক হিটারের অনুমতি আছে — এটি স্পষ্ট অনুমতি। সুতরাং এই অনুমতির আওতায় থাকা কাজ করা জায়েজ।


৩. ২-৪ জন মিলে একটি হিটার ব্যবহার করা

যেহেতু কর্তৃপক্ষ প্রতি ব্লকে সম্মিলিতভাবে একটি হিটার ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, সেহেতু ২-৪ জন মিলে একটি হিটার কেনা ও তা ব্যবহার করা — শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। শর্তগুলো হলো:

  1. হিটারটি ব্লকের জন্য অনুমোদিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে — অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ যে ধরনের/যত ওয়াটের হিটার অনুমোদন করেছে, তা হতে হবে।
  2. নিজেদের অর্থায়নে কিনতে হবে — যা প্রশ্নেই উল্লেখ আছে।
  3. অন্যের ক্ষতি বা অসুবিধা না হতে হবে — যেমন বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোড, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি, বা অন্য রুমের ছাত্রীদের সমস্যা সৃষ্টি করা যাবে না।
  4. ব্যক্তিগত রুমে চুলা ব্যবহার করা যাবে না — কারণ তা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং অঙ্গীকারপত্র ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। অন্যরা করছে বলে নিজের জন্য বৈধ হবে না।

لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ أَنْ يَأْخُذَ مَالَ أَخِيهِ إِلَّا عَنْ طِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ "কারো সম্পদ অন্যের জন্য হালাল নয়, তবে তার সন্তুষ্টি ছাড়া।" (মুসনাদে আহমাদ)

এখানে হিটারটি যৌথ মালিকানায় ক্রয় করা হলে প্রত্যেকের অংশ স্পষ্ট থাকা এবং ব্যবহারের নিয়ম পরস্পর সম্মতিতে নির্ধারণ করা উচিত।


৪. অন্যের রান্না করা খাবার খাওয়া

এই প্রশ্নের উত্তর দুই দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে:

(ক) খাবারটি যদি হারাম/নাজায়েজ উপায়ে প্রস্তুত হয়

যদি কেউ নিষিদ্ধ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করে (যা কর্তৃপক্ষ নিষেধ করেছে এবং অঙ্গীকারপত্র ভঙ্গ করে) রান্না করে, তাহলে সেই রান্নার প্রক্রিয়াটি গুনাহের কাজ। তবে খাবারটি নিজে হারাম হয়ে যায় না — কারণ চুলা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা হলো প্রশাসনিক/চুক্তিগত বিধান, খাদ্যদ্রব্যের হালাল-হারামের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ — তবে কোনো বস্তু নিজে হারাম না হলে তা ব্যবহারকারীর গুনাহের কারণে হারাম হয় না।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, কোনো ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে কিছু অর্জন করলেও তা যদি নিজে পবিত্র ও হালাল বস্তু হয়, তবে তা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয় — তবে সেই অবৈধ কাজে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১ প্রসঙ্গ)

সুতরাং: বন্ধুর রান্না করা খাবার (যা নিজে হালাল) খাওয়া মূলত জায়েজ। তবে যেহেতু সে নিষিদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তাই তাকে সেই কাজ থেকে নিষেধ করা বা সচেতন করা উচিত। আর যদি খাবারটি নিজেই হারাম হয় (যেমন হারাম মাংস, নেশাজাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি), তাহলে তা খাওয়া কোনোভাবেই জায়েজ হবে না।

(খ) যদি খাবারটি হালাল উপায়ে প্রস্তুত হয়

তাহলে নিঃসন্দেহে জায়েজ। মুসলিমের হালাল খাবার গ্রহণ করা বৈধ।


৫. বাস্তব পরামর্শ

  1. অঙ্গীকারপত্রের শর্ত মানুন — ব্যক্তিগত রুমে চুলা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। অন্যরা করছে বলে আপনি করবেন না; কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলের জবাবদিহি করবে।
  2. হিটার কেনার ব্যাপারে সহপাঠীদের সাথে আলোচনা করুন — কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে ২-৪ জন মিলে হিটার কিনুন এবং লিখিতভাবে ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করুন।
  3. কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অনুমতি নিন — যদি সম্মিলিত হিটার ব্যবহারের অনুমতি শুধু মৌখিক হয়, তবে লিখিতভাবে নেওয়ার চেষ্টা করুন। এতে ভবিষ্যতে সমস্যা এড়ানো যাবে।
  4. অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন — সহপাঠীরা নিয়ম ভাঙছে; তাদের সদুপদেশ দিন। তবে নিজে সেই অন্যায়ে অংশীদার হবেন না।
  5. সন্দেহ হলে স্থানীয় মুফতির শরণাপন্ন হোন — কারণ প্রশ্নে কিছু তথ্য (যেমন অনুমতির প্রকৃতি, হিটারের ধরন) স্পষ্ট নয়।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | ব্যক্তিগত রুমে নিষিদ্ধ চুলা ব্যবহার | নাজায়েজ (অঙ্গীকার ভঙ্গ) | | কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত সীমার মধ্যে ২-৪ জন মিলে একটি হিটার ব্যবহার | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে) | | অন্যরা নিয়ম ভাঙছে বলে নিজে ভাঙা | নাজায়েজ | | হালাল উপায়ে রান্না করা খাবার খাওয়া | জায়েজ | | নিষিদ্ধ চুলায় রান্না করা হালাল খাবার খাওয়া | মূলত জায়েজ, তবে রান্নাকারীকে নিষেধ করা কর্তব্য | | নিজেই হারাম খাদ্য (হারাম মাংস ইত্যাদি) | নাজায়েজ |


মূল বক্তব্য: ইসলামে চুক্তি রক্ষা করা ফরজ। কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অনুমতি থাকলে তার আওতায় কাজ করা জায়েজ; কিন্তু নীরব অবহেলাকে অনুমতি ধরে নিয়ে নিষিদ্ধ কাজ করা জায়েজ নয়। আর হালাল খাবার হালাল পদ্ধতিতে প্রস্তুত হলে তা খাওয়া বৈধ; তবে যে পদ্ধতি নিষিদ্ধ, তাতে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.