ইস্তিখারার পর নেগেটিভ অনুভূতি এলে করণীয় কি? আবার ইস্তিখারা করা যাবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7857
Questioner: Foyjun Nahar
Question Asked: 03 Nov 2026, 01:10 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 01:52 PM
Views: 14
Tokens: 6,487
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আ'লাইকুম।
একজন পাত্রকে নিয়ে যদি ইস্তিখারা করা হয় এবং একটু পরে একটা নেগেটিভ অনুভূতি আসে এবং মনে হয় যে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য তারা আমাদের জন্য মানানসই হবেনা। ওই শক্তিশালী অনুভূতির পরে ওই পাত্রকে বাদ দিয়ে দেই। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক বেশি উঁচু ছিল তাই কুফুর দিক থেকে তাদেরকে সমান মনে হয়নি৷ কুফর না, কুফু। শব্দ বুঝুন। উচ্চবিত্তদের মধ্যে অহংকার, তাচ্ছিল্য এসব থাকতে পারে সাধারণত৷ আর ওই পাত্রও তার অর্থনৈতিক অবস্থার কাছাকাছি চেয়েছিল বলেই মনে হয়। তবে ইস্তিখারায় এমন আসে যে তারা ভালো লোক হলেও আমার পরিবার হীনমন্যতায় ভুগবে।

তাহলে কিছুদিন পরে কি ওই পাত্রকে নিয়েই আবার ইস্তিখারা করলে রেজাল্ট বদলে যেতে পারে? যদি পরে মনে হয় আরেকটা সুযোগ দেয়া উচিত যেহেতু অনেক পাত্র জেলার দূরত্বের জন্য ক্যানসেল করছে এবং এই পাত্রর জেলা কাছাকাছি, তাহলে কি আবার ইস্তেখারা করা উচিত, নাকী আগেরটাকেই সঠিক ধরে ছেড়ে দেব?
উল্লেখ্য যে, আগের ইস্তিখারার পরে ওই অনুভূতিটা আসার পরে মন পুরোপুরি ওই নেগেটিভেই স্থির হয়ে গিয়েছিল। আর ওই পাত্রর দিকে একদমই মন টানেনি।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

ইস্তিখারার মূলনীতি ও আপনার প্রশ্নের জবাব

১. ইস্তিখারা কী এবং কীভাবে এর ফলাফল বোঝা যায়

ইস্তিখারা হলো—আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং দুইটি বিষয়ের মধ্যে কোনটি অধিক কল্যাণকর তা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদেরকে সব কাজে ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন, যেমন কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি: ১১৬৬)

ইস্তিখারার মূল কথা হলো—নিজের অন্তরের স্বাভাবিক ঝোঁক ও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সহজতা/প্রশান্তি। হাদিসে নবী ﷺ ইরশাদ করেন:

«إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ... ثُمَّ لْيَقُلْ... اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا الْأَمْرُ خَيْرًا لِي... فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي... وَإِنْ كَانَ شَرًّا لِي... فَاصْرِفْهُ عَنِّي»

অর্থ: "তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই দুআ পড়বে: 'হে আল্লাহ! যদি এই কাজ আমার জন্য কল্যাণকর হয়... তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং সহজ করে দাও... আর যদি আমার জন্য অকল্যাণকর হয়... তবে তা আমার থেকে ফিরিয়ে দাও।'" (সহিহ বুখারি: ১১৬৬)

গুরুত্বপূর্ণ নীতি: ইস্তিখারার ফলাফল কোনো ওহি বা নিশ্চিত ইলহাম নয়; বরং এটি একটি দুআ, যার প্রভাব অন্তরে সহজতা বা অস্বস্তি হিসেবে প্রকাশ পায়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তিখারার পর অন্তর যেদিকে ঝুঁকে যায় সেদিকেই আমল করা মুস্তাহাব, তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৬-২৭, দারুল ফিকর)

২. "নেগেটিভ অনুভূতি" কি ইস্তিখারার ফল?

আপনি যে "নেগেটিভ অনুভূতি"র কথা বলেছেন—এটি ইস্তিখারার সরাসরি ফল নাও হতে পারে। কারণ:

  • ইস্তিখারার প্রকৃত ফল হলো প্রশান্তি ও সহজতা, অথবা অস্বস্তি ও সংকীর্ণতা।
  • কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যে নেগেটিভ অনুভূতি এসেছে, তার কারণ আপনি নিজেই বলেছেন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, হীনমন্যতার আশঙ্কা, উচ্চবিত্তদের অহংকার-তাচ্ছিল্যের সম্ভাবনা। এটি মূলত আপনার নিজের যুক্তি ও ভয়ের ফল, নিছক ইস্তিখারার ইলহাম নয়।

ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) বলেন, ইস্তিখারার পর অন্তরের দিকে লক্ষ্য করতে হবে—যদি সহজতা ও প্রশান্তি আসে তবে তা কল্যাণের আলামত; আর যদি সংকীর্ণতা আসে তবে বিরত থাকা উত্তম। তবে এটি কোনো নিশ্চিত বিধান নয়, বরং সাধারণ পরামর্শ। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৭)

৩. কুফু (সামঞ্জস্য) প্রসঙ্গে

আপনি সঠিকভাবে "কুফু" শব্দটি ব্যবহার করেছেন—কুফর নয়। ফিকহে নিকাহর ক্ষেত্রে কুফু বা সামঞ্জস্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হানাফি মাজহাবে কুফুর বিবেচনায় প্রধানত দ্বীনদারি, নৈতিকতা ও পেশা বিবেচিত হয়; সম্পদের তারতম্য কুফুর মূল ভিত্তি নয়। তবে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে যে পারিবারিক অশান্তি, হীনমন্যতা বা তাচ্ছিল্যের পরিবেশ তৈরি হতে পারে—তা বিবাহের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কুফুর বিবেচনায় সম্পদ মূল বিষয় নয়; তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে কিছু ক্ষেত্রে সম্পদের সামঞ্জস্যও বিবেচনাযোগ্য। (আল-হিদায়া: ১/৩০৭, কিতাবুন নিকাহ; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/২৮৩)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওরে লিখেছেন, বিবাহে কুফুর বিবেচনা করা উচিত—যাতে পাত্র-পাত্রীর দ্বীন, চরিত্র ও পারিবারিক পরিবেশে বড় অমিল না থাকে। (বেহেশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়)

৪. আপনার মূল প্রশ্ন: আবার ইস্তিখারা করা যাবে কি?

হ্যাঁ, আবার ইস্তিখারা করা জায়েজ ও বৈধ। ইস্তিখারা কোনো একবারের জন্য চূড়ান্ত বিধান নয়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনে একাধিকবার ইস্তিখারা করা যায়, বিশেষত যখন পরিস্থিতি বা চিন্তা বদলে যায়। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৭; মাআরিফুল কুরআন, সূরা আল-ইমরান: ১৫৯-এর তাফসির প্রসঙ্গে)

তবে শর্ত হলো—আবেগের বশে বারবার ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্তে অস্থিরতা তৈরি করা উচিত নয়। ইস্তিখারা হলো আল্লাহর উপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যম, সিদ্ধান্ত এড়ানোর উপায় নয়।

৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

১. আগের ইস্তিখারার "নেগেটিভ অনুভূতি"কে চূড়ান্ত প্রমাণ ধরবেন না—কারণ তা আপনার নিজের ভয় ও যুক্তি থেকে এসেছে, যা আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন।

২. আবার ইস্তিখারা করতে পারেন, তবে এবার আগে ভালোভাবে যাচাই করুন:

  • পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র ও পারিবারিক পরিবেশ
  • অর্থনৈতিক বৈষম্য সত্যিই সমস্যা হবে কি না—তা বাস্তবসম্মতভাবে যাচাই করুন (পরিবারের মতামত, পাত্রের ব্যবহার)
  • আপনার পরিবারের সদস্যদের মতামত

৩. ইস্তিখারার সাথে ইস্তিশারা (পরামর্শ) করুন—বিশ্বস্ত দ্বীনদার ব্যক্তি বা অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ» —"যে ইস্তিখারা করে সে ব্যর্থ হয় না।" (তিরমিজি: ২২৫৬)

৪. সিদ্ধান্তে দৃঢ় হোন—ইস্তিখারা ও পরামর্শের পর সিদ্ধান্ত নিলে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে এগিয়ে যান। বারবার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগবেন না; কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন: «وَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ» —"যখন তুমি দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো।" (সূরা আল-ইমরান: ১৫৯)

৫. আগের ইস্তিখারাকে "ভুল" ধরে ফেলে দেওয়া জরুরি নয়—বরং পরিস্থিতি বদলালে (যেমন অন্য পাত্ররা বাতিল হওয়া, পাত্রের জেলা কাছাকাছি হওয়া) নতুন করে ইস্তিখারা করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আবেগের চেয়ে দ্বীন ও বাস্তবতা বিবেচনা করুন।

সারসংক্ষেপ

  • ইস্তিখারা একবারের চূড়ান্ত বিধান নয়; প্রয়োজনে আবার করা যায়।
  • আপনার "নেগেটিভ অনুভূতি" মূলত নিজের ভয় ও যুক্তি থেকে এসেছে, নিছক ইস্তিখারার ফল নয়।
  • কুফুর বিবেচনায় সম্পদ মূল বিষয় নয়, তবে পারিবারিক সামঞ্জস্য ও দ্বীনদারি গুরুত্বপূর্ণ।
  • আবার ইস্তিখারা করুন, সাথে ইস্তিশারা (পরামর্শ) করুন, বাস্তবতা যাচাই করুন, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাওফিক দান করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.