বান্দার হক নষ্টের পর কারো কাছে ক্ষমা চাইতে লজ্জা বা সংকোচ বোধ হলে করণীয় কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7812
Questioner: Nahid Anowar
Question Asked: 02 Nov 2026, 05:54 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 07:12 PM
Views: 12
Tokens: 4,207
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটা বিষয়ে জানতে চাচ্ছি। সেটা হচ্ছে আমরা জানি যে বান্দার হোক কখনও আল্লাহ ক্ষমা করেন না। এইটা বান্দার কাছ থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যদি কারো কাছে বান্দার নিকট ক্ষমা চাইতে লজ্জা সংকোচ কাজ করে তাহলে সেইক্ষেত্রে করনীয় কি? যে তার কাছে ক্ষমা চাইলে কি মনে করবে এমন যদি মনে হয়?

Answer

উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—আমরা জানি, বান্দার হক বা অধিকার সম্পর্কিত গুনাহ আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না বান্দা নিজে ক্ষমা করে। এখন যদি কারো কাছে ক্ষমা চাইতে লজ্জা বা সংকোচ বোধ হয়, অথবা এই আশঙ্কা হয় যে সে ভুল বুঝবে—তাহলে করণীয় কী?

বিস্তারিত উত্তর

১. মূল নীতি: বান্দার হক আল্লাহ ক্ষমা করেন না

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا قَبْلَ أَنْ يُؤْخَذَ مِنْهُ حَيْثُ لَا دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ»

অর্থ: "যার কাছে তার ভাইয়ের কোনো মাজলিমা (জুলুম/হক হরণের দায়) আছে, সে যেন আজই তাকে হালাল করে নেয়—সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না (অর্থাৎ হিসাব নেওয়া হবে)।" — সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৯

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

«إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ»

অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য যা কিছু তা তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" — সূরা নিসা: ৪৮

তবে বান্দার হক সম্পর্কে ফকিহগণ বলেন—হক আদায় বা মাফ চাওয়া ছাড়া সাধারণত ক্ষমা হয় না; কারণ এটি আল্লাহর হকের সাথে বান্দার হকের সংশ্লিষ্টতা। ইমাম ইবন আবিদিন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, মাজলিমা (হক হরণ) থেকে তাওবা করার শর্ত হলো—হক ফিরিয়ে দেওয়া বা হকদারের কাছে ক্ষমা চাওয়া। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭-এর কাছাকাছি আলোচনা দ্রষ্টব্য)

২. লজ্জা বা সংকোচ—এটি শয়তানের প্ররোচনা

লজ্জা বা সংকোচ বোধ করা এবং "সে ভুল বুঝবে কি না" এ ধরনের আশঙ্কা—এগুলো সাধারণত শয়তানের ওয়াসওয়াসা, যা মানুষকে হক আদায় থেকে বিরত রাখতে চায়। হাদিসে এসেছে:

«إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: إِنَّكَ قَدْ أَحْدَثْتَ...»

শয়তান মানুষের মনে সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা ঢালে। (সহিহ বুখারি: ১৩৭)

তাই এ ধরনের লজ্জা বা আশঙ্কাকে কর্তব্য পালন থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণ বানানো যাবে না।

৩. করণীয় কী?

ক) সরাসরি ক্ষমা চাওয়া: সম্ভব হলে সরাসরি, ব্যক্তিগতভাবে বা ফোনে ক্ষমা চেয়ে নিন। বলুন: "আমি আপনার ব্যাপারে যে ভুল/ত্রুটি করেছি, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দিন।" এতে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকলে সংক্ষেপে কারণও বলে দিতে পারেন।

খ) পরোক্ষভাবে ক্ষমা চাওয়া: যদি সরাসরি বলা কঠিন হয়, তবে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে, চিঠি/মেসেজের মাধ্যমে, অথবা তার জন্য দুআ করার মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া যেতে পারে। তবে সরাসরি সম্ভব হলে সেটাই উত্তম।

গ) দুআ করা: তার জন্য ক্ষমা ও কল্যাণের দুআ করুন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ دَعَا لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ...»

"যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দুআ করে..." (সহিহ মুসলিম: ২৭৩২)

ঘ) হক ফিরিয়ে দেওয়া: যদি বিষয়টি আর্থিক বা বস্তুগত হয়, তবে হক ফিরিয়ে দেওয়া বা সমমূল্য আদায় করা আবশ্যক; শুধু মৌখিক ক্ষমা যথেষ্ট নয়।

ঙ) তাওবা ও ইস্তিগফার: আল্লাহর কাছে তাওবা করুন এবং ইস্তিগফার করুন। ইমাম তাহতাবি ও অন্যান্য ফকিহগণ বলেছেন—বান্দার হক সম্পর্কিত গুনাহে তাওবা তিনটি শর্তে সহিহ হয়: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) অনুতপ্ত হওয়া, (৩) হকদারের হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তাকে ক্ষমা করানো। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭-এর আলোচনা)

৪. "সে ভুল বুঝবে" এই আশঙ্কার সমাধান

  • যদি সত্যিই ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকে, তবে সংক্ষেপে পরিস্থিতি স্পষ্ট করে বলুন—কেন ক্ষমা চাইছেন।
  • অথবা এমনভাবে বলুন যাতে ভুল বোঝার সুযোগ না থাকে: "আমি জানি না আপনি কিছু মনে করেছেন কি না, তবে আমি আমার পক্ষ থেকে যদি কোনো ত্রুটি করে থাকি, তবে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দিন।"
  • মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বললে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা কমে যায়।

৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • ক্ষমা চাওয়াকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেওয়া যাবে না; মৃত্যুর আগে হক আদায় করা আবশ্যক।
  • যদি হকদার মারা যায়, তবে তার ওয়ারিশদের কাছে হক আদায় করুন বা তার জন্য দুআ ও সদকা করুন (ফকিহগণের মতানুযায়ী)।
  • লজ্জা বা সংকোচ ইসলামে নিন্দনীয় নয়, তবে তা যখন ওয়াজিব কাজ থেকে বিরত রাখে, তখন তা পরিহার করা আবশ্যক।

সারসংক্ষেপ

লজ্জা বা সংকোচকে কর্তব্য পালন থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণ বানানো যাবে না। সম্ভব হলে সরাসরি ক্ষমা চেয়ে নিন; না পারলে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে, চিঠি/মেসেজের মাধ্যমে বা তার জন্য দুআর মাধ্যমে। ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকলে সংক্ষেপে পরিস্থিতি স্পষ্ট করে বলুন। হক আর্থিক হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হক আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.