নবী ﷺ সম্পর্কে মনে মনে বাজে কথা আসা, মুখে উচ্চারণ না করলে ঈমান ও নিকাহর হুকুম কী?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7721
Questioner: Nova
Question Asked: 01 Nov 2026, 03:44 PM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 05:59 PM
Views: 15
Tokens: 8,111
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার নবীকে নিয়ে মনে মনে বাজে কথা আসে। অনেক বাজে কথা। যা আমি মুখে উচ্চারণ করে বলতে পারবো না। গালির মতন৷ এর পরে আমি টেনশন এ পড়ে যাই। যে মুখে উচ্চারণ করেই বললাম নাকি মনে মনেই বললাম। কিছুতেই মনে করতে পারি না।
১) পরে আমি মুখে আংগুল দিয়ে, জিহবা নেড়ে, মুখ হা করে, জোরে জোরে নিশাস নিয়ে বাজে কথা গুলো বলি মনে মনে। ইচ্ছা করে। শুধু দেখতে কোনো সাউন্ড হয় কিনা। কিন্তু আমি কোনো সাউন্ড শুনি নাই। নিশসাসের সাউন্ড ছাড়া। এখন এটা কি মনে মনে বাজে কথা বলা ধরা হবে? নাকি মুখে উচ্চারণ করে ধরা হবে?
২) এমন করলে কাউকে কি শাতিম বলা হবে?
৩) সে নিশ্চিত না মুখে কিছু উচ্চারণ করেছে কিনা। একবার তার মনে হয় ইচ্ছা করেই মনে মনে বলতেছে, আবার মনে হয় সে এগুলো বলতে চায় না। কারন মনে মনে কিছু আসলেই সে অটোমেটিক নাউজুবিল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ বলে। ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত এটা যদি সে বুঝতে না পারে তাহলে তার ঈমান কি ঠিক আছে?
৪) তার ঈমান, বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
৫) ঈমান বিয়ে কি নবায়ন কর‍তে হবে?
৬)ঈমান বিয়ে নবায়ন না করলে কি কোনো সমস্যা হবে বিবাহিত জীবনে?
৭) আপনাদের উত্তর এর উপর কি আমল করতে পারবো?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এগুলো ছিল মনের ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) এবং আপনি সেগুলো মুখে উচ্চারণ করেননি। মুখে আঙুল দেওয়া, জিহ্বা নাড়ানো বা জোরে নিঃশ্বাস নেওয়া—এসব দ্বারা কোনো শব্দ বা হরফ আদায় না হলে তা “মুখে বলা” হিসেবে গণ্য হবে না। ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান ও নিকাহ ঠিক আছে; ঈমান-বিয়ে নবায়ন করা আবশ্যক নয়। তবে যেহেতু আপনি বারবার সংশয়ে পড়ছেন, সেহেতু ওয়াসওয়াসাকে প্রশ্রয় দেবেন না, এড়িয়ে যাবেন এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলিম/মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করবেন।


বিস্তারিত উত্তর

১) মনে মনে বাজে কথা বলা না মুখে উচ্চারণ করা—কোনটি ধরা হবে?

শরীয়তের বিধান হলো: মুখে উচ্চারণ তখনই ধরা হবে যখন হরফ/শব্দ আদায় হয়, যদিও আওয়াজ কেউ না শোনে। আর মনে মনে অর্থাৎ অন্তরে কোনো কথা ভাবা বা কল্পনা করা—এটি মুখে বলা নয়।

আপনি লিখেছেন: মুখে আঙুল দিয়েছেন, জিহ্বা নেড়েছেন, মুখ খুলেছেন, জোরে নিঃশ্বাস নিয়েছেন; কিন্তু নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ শোনেননি। সাধারণত এতে হরফ আদায় হয় না; তাই এটি মুখে উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হবে না। এটি ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে মনের মধ্যে কল্পনা/ওয়াসওয়াসা পরীক্ষা করা। ইনশাআল্লাহ এতে ঈমান নষ্ট হয় না।

তবে সতর্কতা: কেউ যদি মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট নিয়ে হরফ আদায় করে ফেলে—যদিও ফিসফিস করে বা নিজে শোনে—তাহলে সেটি মুখে উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হবে। আর কুফরি/গালিমূলক শব্দ ইচ্ছাকৃত মুখে উচ্চারণ করলে ঈমানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। তাই এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।

দলিল:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    “আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের অনর্থক কসমের ব্যাপারে পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তিনি পাকড়াও করবেন সেই কসমের ব্যাপারে, যা তোমাদের অন্তর অর্জন করেছে।”
    (সূরা বাকারা: ২২৫)

  • অন্য আয়াতে:

    “তিনি তোমাদের অন্তরের কথা জানেন।”
    (সূরা আহযাব: ৫১)

  • হাদিসে নবী ﷺ বলেন:

    “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা আমল করে।”
    (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম: ১২৭)

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া শুধু অন্তরে খেয়াল আসলে ঈমান যায় না; তবে ওয়াসওয়াসাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।
    (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২২-২২৩, দারুল ফিকর সংস্করণ)

২) এমন করলে কাউকে “শাতিম” বলা হবে কি?

“শাতিম” অর্থ গালিদাতা। আপনি যেহেতু মুখে উচ্চারণ করেননি, শুধু মনের মধ্যে কল্পনা করেছেন এবং তা নিয়েও সংশয়ে আছেন—সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটিকে মুখে গালি দেওয়া বা নবী ﷺ-কে গালি দেওয়া বলা যাবে না। তবে মনে মনে নবী ﷺ সম্পর্কে বাজে কল্পনা আসা শয়তানের ওয়াসওয়াসা; এটি ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। আপনি যেহেতু টেনশন ও ভয় পাচ্ছেন এবং আস্তাগফিরুল্লাহ বলছেন, এটি ওয়াসওয়াসার লক্ষণ; ইনশাআল্লাহ এতে ঈমান নষ্ট হয় না।

দলিল:

  • নবী ﷺ বলেন:

    “মানুষেরা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশ্ন করতে থাকবে, এমনকি বলবে: আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন? যে ব্যক্তি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে, সে যেন বলে: আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি।”
    (সহিহ মুসলিম: ১৩৪)

  • অন্য হাদিসে:

    “শয়তান তোমাদের কাছে আসে এবং বলে: এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন কেউ এমন কথা পায়, সে যেন বলে: আমি আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।”
    (সহিহ বুখারি: ৩২৭৬; সহিহ মুসলিম: ১৩৪)

  • ইমাম তহাবি (রহ.) ও ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, শয়তানি ওয়াসওয়াসা ঈমানের ক্ষতি করে না, যতক্ষণ তা অন্তরে স্থির না হয় বা মুখে উচ্চারিত না হয়।
    (শারহু মাআনিল আসার: ২/৩৮০; আল-বাহরুর রায়েক: ১/৩২)

৩) ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত—ঈমান কি ঠিক আছে?

আপনি নিশ্চিত নন মুখে কিছু উচ্চারণ করেছেন কি না; আর মনে মনে কিছু আসলেই আপনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে “নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ” বলছেন। এটি ওয়াসওয়াসার সাথে লড়াইয়ের লক্ষণ। শরীয়তের মূলনীতি:

  • নিশ্চিত বিষয় সংশয় দ্বারা বাতিল হয় না। আপনি নিশ্চিত নন যে মুখে উচ্চারণ করেছেন; তাই সংশয়ের কারণে ঈমান বাতিল ধরা যাবে না।
  • ওয়াসওয়াসা যদি এমনি আসে এবং আপনি তা ঘৃণা করেন, তবে তা ঈমানের ক্ষতি করে না।
  • তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মনে মনে বাজে কথা কল্পনা করা বা তাতে লিপ্ত থাকা নিন্দনীয়; তা থেকে তাওবা করতে হবে এবং এড়িয়ে চলতে হবে।

দলিল:

  • নবী ﷺ বলেন:

    “নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা আমল করে।”
    (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯)

  • ফিকহের কায়েদা:

    “الیقین لا یزول بالشک”
    “নিশ্চিত বিষয় সংশয় দ্বারা দূর হয় না।”
    (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, মাদ্দা ৪; রাদ্দুল মুহতার: ১/২২৫)

সুতরাং আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে; তবে ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দিয়ে বারবার পরীক্ষা করবেন না।

৪) ঈমান ও বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

যেহেতু মুখে উচ্চারণের ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই এবং যা হয়েছে তা ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য, সেহেতু ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান ও নিকাহ ঠিক আছে। নিকাহ ভঙ্গ হয়নি। তবে ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য নিম্নোক্ত আমল করুন:

  • “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ুন।
  • “আমান্তু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি” বলুন।
  • ওয়াসওয়াসাকে ঘৃণা করুন, তাতে মনোযোগ দেবেন না।
  • বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন।
  • নামাজ-ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করুন।
  • প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলিম/মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

দলিল:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    “আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
    (সূরা ফুসসিলাত: ৩৬)

  • নবী ﷺ বলেন:

    “শয়তান মানুষের রক্তে চলাচল করে; তাই তোমরা তার পথ সংকীর্ণ করো (বেশি বেশি ইবাদত ও জিকিরের মাধ্যমে)।”
    (সহিহ বুখারি: ৩২৮১; সহিহ মুসলিম: ২১৭৫)

৫) ঈমান-বিয়ে নবায়ন করতে হবে কি?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আবশ্যক নয়। তবে যদি কেউ নিশ্চিতভাবে কুফরি বা গালিমূলক শব্দ মুখে উচ্চারণ করে ফেলে, তাহলে তাওবা ও ঈমান নবায়ন করতে হবে এবং নিকাহ নতুন করে পড়াতে হবে—এটি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত মাসআলা। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা না থাকায় এবং ওয়াসওয়াসা হওয়ায় নবায়ন আবশ্যক নয়।

দলিল:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, কুফরি শব্দ ইচ্ছাকৃত মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান যায়; শুধু অন্তরের ওয়াসওয়াসায় যায় না।
    (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২২-২২৩)
  • ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে, কেউ কুফরি বললে তাওবা ও কালিমা পড়ে ঈমান নবায়ন করবে; আর নিকাহর ব্যাপারে সতর্কতামূলক পুনরায় আকদ করা যেতে পারে।
    (ফাতাওয়া আলমগিরি: ২/২৭৬, কিতাবুল হুদুদ; ১/২৮৩, কিতাবুন নিকাহ)

৬) ঈমান-বিয়ে নবায়ন না করলে বিবাহিত জীবনে সমস্যা হবে কি?

আপনার ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা নেই; নিকাহ বহাল আছে। তবে কেউ যদি নিশ্চিতভাবে কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ করে, তাহলে তাওবা ও নবায়ন না করা পর্যন্ত নিকাহর বিধান সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু মুখে উচ্চারণের নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু নবায়ন না করলেও নিকাহ ঠিক আছে।

৭) আমাদের উত্তরের উপর আমল করতে পারবেন কি?

হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ পারবেন। আপনি নিম্নোক্ত আমল করুন:
১. ওয়াসওয়াসাকে এড়িয়ে যান; মনে বাজে কথা এলে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ে মনোযোগ সরিয়ে নিন।
২. “আমান্তু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি” বলুন।
৩. মুখে উচ্চারণের ব্যাপারে বারবার পরীক্ষা করবেন না; এতে ওয়াসওয়াসা বাড়ে।
৪. বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
৫. নিশ্চিত না হলে নিজের ঈমান বাতিল ধরে নেবেন না; নিশ্চয়তা ছাড়া সংশয়ের উপর আমল করবেন না।
৬. যদি অস্বস্তি বেশি হয়, তবে অভিজ্ঞ আলিম/মুফতির সাথে সরাসরি দেখা করে পরামর্শ করুন।
৭. নামাজ-রোজা-হালাল-হারামের বিধান যথাযথভাবে পালন করুন।

দলিল:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন:

    “আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করে; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি পায়।”
    (সূরা রাদ: ২৮)

  • নবী ﷺ বলেন:

    “জেনে রাখো, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে; তা যদি ঠিক থাকে, পুরো শরীর ঠিক থাকে; আর তা যদি নষ্ট হয়, পুরো শরীর নষ্ট হয়। জেনে রাখো, তা হলো কলব (হৃদয়)।”
    (সহিহ বুখারি: ৫২; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯)


উপসংহার

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা; মুখে উচ্চারণের নিশ্চয়তা নেই। ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান ও নিকাহ ঠিক আছে; ঈমান-বিয়ে নবায়ন আবশ্যক নয়। তবে ওয়াসওয়াসাকে প্রশ্রয় দেবেন না, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন না, এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলিম/মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং ঈমানের উপর অটল রাখুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.