কোচিং সেন্টারে ফেলে যাওয়া ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আর অন্যদিকে আমি দ্বিধাবোধ করতেছি, এই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা কি আমার জন্য জায়েয হবে??
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় ক্যালকুলেটরটি ব্যবহার করা জায়েয হবে না, যতক্ষণ না এর প্রকৃত মালিকের অনুমতি বা সন্তুষ্টি নিশ্চিত হয়। কারণ কোচিং সেন্টারে ফেলে যাওয়া জিনিস “পাওয়া জিনিস” (لقطة) হিসেবে গণ্য; তা যে পেয়েছে তার মালিক হয়ে যায় না, বরং শরীয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে ঘোষণা দিয়ে মালিককে খুঁজে বের করা বা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া আবশ্যক। ভাইয়ের বন্ধু যদি তা মালিকের অনুমতি ছাড়া নিয়ে থাকে, তবে তার কাছ থেকে নিয়ে ব্যবহার করাও জায়েয নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ফেলে যাওয়া জিনিসের হুকুম (لقطة):
কোনো জিনিস পাওয়া গেলে তা নিজের করে নেওয়া জায়েয নয়; বরং মালিককে খুঁজে বের করা বা ঘোষণা দেওয়া কর্তব্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
«وَاللَّهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ» “আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও সংশোধনকারীকে জানেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২২০)
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ وَجَدَ لُقَطَةً فَلْيُشْهِدْ ذَا عَدْلٍ أَوْ ذَوَيْ عَدْلٍ، وَلْيَحْفَظْ عِفَاصَهَا وَوِعَاءَهَا، ثُمَّ لَا يَكْتُمْ وَلَا يُغَيِّبْ، فَإِنْ جَاءَ صَاحِبُهَا فَهُوَ أَحَقُّ بِهَا، وَإِنْ لَمْ يَأْتِ فَهُوَ مَالُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ» “যে ব্যক্তি কোনো পড়ে থাকা জিনিস পায়, সে যেন ন্যায়বান এক বা দুইজনকে সাক্ষী রাখে এবং তার বাঁধন ও পাত্র সংরক্ষণ করে। এরপর সে যেন তা গোপন না করে। যদি তার মালিক এসে যায়, তবে মালিকই তার অধিক হকদার; আর যদি না আসে, তবে তা আল্লাহর মাল, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।”
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৭০১; মুসনাদে আহমাদ)
২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, লুকতা (পাওয়া জিনিস) নিজের কাছে রাখা জায়েয, তবে মালিকের সন্ধান ও ঘোষণা দেওয়া আবশ্যক। মালিক না পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট শর্তে তা সদকা করা যায়; কিন্তু মালিকের অনুমতি ছাড়া ভোগ করা জায়েয নয়।
- আল-হিদায়া: “اللقطة لا تملك بالالتقاط، بل يجب تعريفها” — “পাওয়া জিনিস কুড়িয়ে নেওয়ার দ্বারা মালিকানায় আসে না; বরং তা ঘোষণা করা আবশ্যক।”
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): “لا يجوز الانتفاع باللقطة قبل التعريف” — “ঘোষণা দেওয়ার আগে লুকতা দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয নয়।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি: লুকতার বিস্তারিত আলোচনায় এসেছে, মালিকের অনুমতি ব্যতীত তা ব্যবহার করা খেয়ানত।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.): অনুমতি ছাড়া অন্যের মাল ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানত; বিশেষত ছাত্রদের ফেলে যাওয়া জিনিস নিয়ে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. আপনার নির্দিষ্ট অবস্থা:
- ক্যালকুলেটরটি আপনার ভাইয়ের বন্ধু “দিয়ে গেছে” — এটি মালিকের অনুমতিভিত্তিক হেবা নয়; বরং ফেলে যাওয়া জিনিস নিজের কাছে রাখার শামিল।
- ভাইয়ের বন্ধু যদি মালিকের অনুমতি ছাড়া তা নিয়ে থাকে, তবে তার কাছ থেকে নিয়ে ব্যবহার করা জায়েয নয়।
- আপনি যদি নিশ্চিত হন যে কোচিং কর্তৃপক্ষ তা সংগ্রহ করে রেখেছে এবং তারা আপনাকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবে ব্যবহার করা জায়েয হবে। অথবা মালিককে খুঁজে বের করে অনুমতি নিতে হবে।
৪. দ্বিধার সমাধান:
আপনার দ্বিধা দূর করার সহজ পথ হলো—ক্যালকুলেটরটি কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া বা মালিককে খুঁজে বের করা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে তা ব্যবহার না করাই safest এবং দ্বীনি দিক থেকে নিরাপদ। পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার জন্য অন্য কারো কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ধার করা বা সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি নেওয়া যেতে পারে।
উপসংহার
প্রশ্নে বর্ণিত ক্যালকুলেটরটি মালিকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা জায়েয নয়। এটি লুকতা হিসেবে গণ্য; তাই মালিককে খুঁজে বের করা বা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া আবশ্যক। মালিকের অনুমতি ছাড়া ভোগ করা খেয়ানত ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।