অজু করার পর মুখ থেকে গোশতের টুকরা, খাদ্যকণা, রক্ত বা বমি বের হলে ওযু ভাঙবে কি না?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
অজু করার পর মুখ থেকে কিছু বের হলে ওযু ভাঙবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
অজু করার পর মুখ থেকে গোশতের টুকরা বা অন্য কোনো বস্তু বের হলে ওযু ভাঙবে কি না — এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান জানতে চাওয়া হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মুখ থেকে বের হওয়া বস্তুর ধরন অনুযায়ী বিধান ভিন্ন। যদি মুখ থেকে রক্ত, পুঁজ, বমি (ভরা পেটের), বা পেট থেকে খাদ্য-কণা বের হয় এবং তা লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়ে বা থুতুতে রঙ দেখা যায়, তাহলে ওযু ভেঙে যাবে। আর যদি শুধু শুকনো গোশতের টুকরা, খাদ্যকণা বা কোনো বস্তু মুখ থেকে বের হয় যা লালার সঙ্গে মিশে না যায় বা মুখে ছড়িয়ে না পড়ে, তাহলে ওযু ভাঙবে না।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ওযু ভঙ্গের মূলনীতি (হানাফি ফিকহ)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, মুখ থেকে কোনো কিছু বের হলে তা ওযু ভাঙবে কি না — তা নির্ভর করে তিনটি শর্তের উপর:
- বস্তুটি নাপাক (অপবিত্র) হতে হবে — যেমন রক্ত, পুঁজ, বমি, মল-মূত্রের কণা।
- তা তরল বা লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়তে হবে — শুধু মুখের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে নয়।
- তা মুখ থেকে বের হতে হবে (বাইরে আসতে হবে)।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মুখ থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হলে যদি তা লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং থুতু ফেললে তাতে রঙ দেখা যায় — তবেই ওযু ভাঙবে। আর যদি রঙ না দেখা যায়, ওযু ভাঙবে না। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৮–১৪০; আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত)
২. গোশতের টুকরা বা খাদ্যকণা
- শুকনো গোশতের টুকরা বা খাদ্যকণা মুখ থেকে বের হলে — এটি নাপাক নয় এবং লালার সঙ্গে মিশে না গেলে ওযু ভাঙবে না।
- তবে যদি গোশতের টুকরাটি রক্তমিশ্রিত হয় এবং রক্ত লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়ে — তাহলে রক্তের কারণে ওযু ভাঙবে।
- দাঁতের ফাঁক থেকে বের হওয়া খাদ্যকণা যদি পেট থেকে না আসে এবং রক্তমিশ্রিত না হয় — ওযু ভাঙবে না।
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে: "لو خرج من فمه طعام أو لحم لم ينقض وضوءه ما لم يكن دما" — "মুখ থেকে খাদ্য বা গোশত বের হলে ওযু ভাঙবে না, যতক্ষণ না তা রক্ত হয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১০)
৩. বমি ও পেট থেকে আসা বস্তু
- ভরা পেটের বমি (যা মুখ ভরে আসে) — ওযু ভাঙবে।
- অল্প বমি (যা মুখ না ভরে) — ইমাম আবু হানিফার মতে ওযু ভাঙবে না; তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে ভাঙবে। তাকওয়ার দিক থেকে অল্প বমিতেও ওযু নতুন করা উত্তম। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৪১)
- পেট থেকে খাদ্যকণা মুখে এসে বের হলে — যদি তা লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, ওযু ভাঙবে; নাহলে ভাঙবে না।
৪. রক্ত ও পুঁজ
- মুখ থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হয়ে লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়লে — ওযু ভাঙবে।
- শুধু দাঁতের গোড়া থেকে অল্প রক্ত এসে থুতুতে রঙ না দেখা গেলে — ওযু ভাঙবে না। (রাদ্দুল মুহতার; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১)
৫. দাঁতের ফাঁক থেকে বের হওয়া বস্তু
- দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যকণা মুখ থেকে বের হলে — ওযু ভাঙবে না।
- তবে যদি তা রক্তমিশ্রিত হয় এবং রক্ত লালার সঙ্গে মিশে যায় — তাহলে রক্তের হুকুম প্রযোজ্য হবে।
সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত
| বস্তু | ওযু ভাঙবে? | |---|---| | শুকনো গোশতের টুকরা (রক্তমিশ্রিত নয়) | না | | খাদ্যকণা (পেট থেকে নয়, রক্তমিশ্রিত নয়) | না | | রক্ত/পুঁজ (লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়ালে) | হ্যাঁ | | ভরা পেটের বমি | হ্যাঁ | | অল্প বমি | ইমাম আবু হানিফার মতে না; সতর্কতায় নতুন অজু উত্তম | | রক্তমিশ্রিত গোশতের টুকরা (রক্ত ছড়ালে) | হ্যাঁ |
সতর্কতা: ওযু ভেঙেছে কি না — এ বিষয়ে সন্দেহ হলে এবং নামাজের সময় হয়ে গেলে, নতুন করে অজু করে নামাজ পড়া সর্বোত্তম ও নিরাপদ। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১; ইমদাদুল ফাতাওয়া)
আরবি দলিল
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَنْ أَصَابَهُ قَيْءٌ أَوْ رُعَافٌ أَوْ قَلْسٌ أَوْ مَذْيٌ فَلْيَتَوَضَّأْ»
— "যার বমি, নাক দিয়ে রক্ত, বা মazi বের হয়, সে যেন অজু করে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১২২১ — যদিও সনদে দুর্বলতা আছে, তবে ফুকাহায়ে কেরাম এ বিষয়ে ইজমা করেছেন)
ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন: "وَالْقَيْءُ إِذَا كَانَ مِلْءَ الْفَمِ فَهُوَ نَاقِضٌ" — "বমি যখন মুখ ভরে আসে, তা ওযু ভাঙে।" (শরহু মাআনিল আছার)
উপসংহার
সাধারণ শুকনো গোশতের টুকরা বা খাদ্যকণা মুখ থেকে বের হলে ওযু ভাঙবে না। তবে রক্ত, পুঁজ, ভরা পেটের বমি বা রক্তমিশ্রিত বস্তু লালার সঙ্গে মিশে মুখে ছড়িয়ে পড়লে ওযু ভেঙে যাবে। সন্দেহ হলে নতুন অজু করা উত্তম।