জ্বর বা অসুস্থতার কারণে ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা করার হুকুম এবং নামাজ ভেঙে গেলে কাজা ওয়াজিব হওয়ার বিস্তারিত ফিকহি বিধান জানেত চাই?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার প্রশ্নটা হচ্ছে আমার দুই তিন দিন একটানা অনেক বেশি জ্বর ছিল .আমি বিছানা থেকে উঠতে পারিনি কোন সেন্স ছিল না এরকম অবস্থা ছিল.. তারপর ঐদিন একটু ভালো ফিল করতেছিলাম তাই মাগরিবের সালাতের জন্য জায়নামাজে দাঁড়ায় কিন্তু হঠাৎ করে এত মাথা ঘুরে যে আমি নামাজের মধ্যেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাই তাই আর নামাজটা কন্টিনিউ করতে পারি নাই ..এখন আমার প্রশ্নটা হচ্ছে যে জ্বরের কারণে যে তিন দিন আমি আমার নামাজ পড়তে পারিনি ওইটা কি কাজা করবো এখন. তারপর যেই নামাজটা অর্ধেক পরাকালীন আমার নামাজটা ভেঙে যায় ওইটাও কি কাজা করব এখন.
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: জ্বরের কারণে যে নামাজগুলো ছুটে গেছে, সেগুলোর কাজা করা ফরজ। আর যে নামাজ অর্ধেক পড়ার পর মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ায় ভেঙে গেছে, সেটাও কাজা করা আবশ্যক।
বিস্তারিত আলোচনা
১. অসুস্থতার কারণে নামাজ ছুটে যাওয়া
ইসলামে নামাজ এমন একটি ইবাদত, যা কোনো অবস্থাতেই মাফ হয় না—এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ» — সহীহ বুখারী, হাদিস ১১১৭
অর্থাৎ, দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো; না পারলে বসে; না পারলে কাত হয়ে। অর্থাৎ যতটুকু সামর্থ্য আছে, ততটুকুই আদায় করতে হবে—নামাজ সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই।
আপনি লিখেছেন, তিন দিন আপনি বিছানা থেকে উঠতে পারেননি, কোনো সেন্স ছিল না। এমতাবস্থায় যদি সত্যিই নামাজ আদায় করা সম্ভব না হয়ে থাকে (এমনকি ইশারায় বা বসে পড়ারও সামর্থ্য না থাকে), তাহলে ফকীহগণের মতে সেই নামাজ মাফ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সতর্কতা ও احتياط (সতর্কতা)-এর দিক হলো, সেই নামাজগুলো কাজা করে নেওয়া। কারণ:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও নামাজ ছুটে গেলে কাজা ওয়াজিব; আর যদি সম্পূর্ণ অচেতন (বেহুঁশ) অবস্থা হয়, তবে হানাফি মাজহাবে সেই নামাজ মাফ হওয়ার কথা আছে—তবে তা নির্ভর করে অবস্থার প্রকৃতির উপর।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে এবং পরবর্তী হানাফি ফকীহদের অনেকের মতে, অচেতন অবস্থার নামাজও কাজা করা উত্তম ও নিরাপদ।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:
«وَلَوْ أُغْمِيَ عَلَيْهِ أَيَّامًا لَا قَضَاءَ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ... وَعِنْدَهُمَا يَقْضِي» — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, নামাজ অধ্যায়
অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফার মতে অচেতন ব্যক্তির কাজা নেই, আর ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতে কাজা আছে। ফতোয়া ও ফিকহি নিরাপত্তার দিক থেকে কাজা করে নেওয়াই উত্তম, বিশেষত যেহেতু আপনার অবস্থা সম্পূর্ণ অচেতন ছিল কি না তা নিশ্চিত নয়।
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেছেন: অসুস্থ ব্যক্তি যতটুকু সামর্থ্য রাখে ততটুকুই আদায় করবে; আর যা ছুটে গেছে তা কাজা করবে।
২. নামাজ ভেঙে যাওয়া
আপনি মাগরিবের নামাজে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন এবং নামাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি। হানাফি মাজহাবে নামাজ শুরু করার পর তা ভঙ্গ হয়ে গেলে (ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত), সেই নামাজ কাজা করা ওয়াজিব। কারণ নামাজ শুরু করলে তা আদায় করা আবশ্যক হয়ে যায়; ভঙ্গ হলে কাজা ছাড়া তা আদায় হয় না।
আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
«مَنْ شَرَعَ فِي صَلَاةٍ ثُمَّ أَفْسَدَهَا فَعَلَيْهِ الْقَضَاءُ» — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১
অর্থাৎ যে ব্যক্তি নামাজ শুরু করে kemudian তা নষ্ট করে ফেলে, তার উপর কাজা ওয়াজিব।
আপনার ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা ও পড়ে যাওয়া অনিচ্ছাকৃত ছিল, তবুও নামাজ পূর্ণ হয়নি—তাই সেই মাগরিবের নামাজ কাজা করতে হবে।
করণীয় (সারসংক্ষেপ)
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | জ্বরের কারণে ছুটে যাওয়া ৩ দিনের নামাজ | কাজা করা উত্তম ও নিরাপদ (احتياط); সম্পূর্ণ অচেতন হলে মাফ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে কাজা করাই ভালো | | মাথা ঘুরে ভেঙে যাওয়া মাগরিবের নামাজ | কাজা করা ওয়াজিব |
পরামর্শ: ছুটে যাওয়া নামাজগুলো একসাথে বা ধীরে ধীরে কাজা করে নিন। কাজা নামাজের নিয়তে সাধারণ নামাজের মতোই পড়বেন, শুধু নিয়তে "কাজা" বলবেন। আল্লাহ তাআলা আপনার অসুস্থতা দূর করুন এবং ইবাদতের তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১১১৭
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ২
- আল-হিদায়া (মারগিনানি)
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
আল্লাহ ভালো জানেন।