সুদভিত্তিক ঋণের সাথে বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর প্রাপ্ত সুদ ঋণের সুদের সাথে সমন্বয় করা যাবে কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার একটি প্রশ্ন সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাধ্যতামূলক সঞ্চয় (compulsory savings) সম্পর্কে।
বাস্তব প্রয়োজনে অনেক সময় কোনো ব্যক্তি সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে সাধারণত প্রতি মাসের কিস্তির সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাধ্যতামূলক সঞ্চয় হিসেবে জমা রাখতে হয়। ঋণের মেয়াদ শেষে সেই সঞ্চিত অর্থ দিয়ে শেষ কিস্তি বা বকেয়া সমন্বয় করা হয়।
সমস্যা হলো, প্রতিষ্ঠানটি এই বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর অল্প পরিমাণ হলেও অতিরিক্ত অর্থ (সুদ) যোগ করে। যদিও ঋণের ওপর তারা যে পরিমাণ সুদ আদায় করে, তার তুলনায় এই পরিমাণ খুবই নগণ্য।
এখন আমার প্রশ্ন হলো:
এই বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর যে অতিরিক্ত অর্থ (সুদ) দেওয়া হয়, সেটিকে কীভাবে গণ্য করা হবে?
যেহেতু একই প্রতিষ্ঠান একদিকে আমার কাছ থেকে ঋণের সুদ আদায় করছে, অন্যদিকে বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর সামান্য সুদ দিচ্ছে, তাই কি এই প্রাপ্ত সুদকে ঋণের সুদের একটি সমন্বয় (adjustment/set-off) হিসেবে ধরা যাবে? অর্থাৎ, কার্যত প্রতিষ্ঠানটি আমার কাছ থেকে কিছুটা কম সুদ নিল—এভাবে কি বিবেচনা করা যাবে?
নাকি, ঋণের সুদের সঙ্গে সমন্বয় করা হলেও, শরিয়তের দৃষ্টিতে এই অতিরিক্ত অর্থকে পৃথকভাবে সুদ গ্রহণ হিসেবেই গণ্য করা হবে?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এই সমন্বয় (adjustment/set-off) শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর প্রতিষ্ঠান যে অতিরিক্ত অর্থ (সুদ) যোগ করে, তা পৃথকভাবে সুদ (রিবা) হিসেবেই গণ্য হবে; ঋণের সুদের সাথে তার সমন্বয় করে "কম সুদ নেওয়া হয়েছে" —এভাবে বিবেচনা করা যাবে না। উভয় পক্ষের সুদই আলাদা আলাদা সুদ, এবং প্রতিটি সুদ লেনদেন স্বতন্ত্রভাবে হারাম।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সুদ একটি স্বতন্ত্র হারাম লেনদেন — সমন্বয়ের অবকাশ নেই
শরিয়তে সুদ (রিবা) একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হারাম চুক্তি। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদ দানকারী, সুদের লেখক ও সাক্ষী —সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৩৩)।
সুদ একটি স্বতন্ত্র আকদ (চুক্তি)। এক সুদ চুক্তির অর্থ অন্য সুদ চুক্তির সাথে সমন্বয় করা শরিয়তে অনুমোদিত নয়। প্রতিটি সুদ লেনদেন আলাদাভাবে হারাম; একটি হারাম লেনদেন অন্য হারাম লেনদেনকে "কম" বা "ক্ষমাযোগ্য" বানায় না।
২. বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের ওপর প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থের প্রকৃতি
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান ঋণদাতা হিসেবে আপনার কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে, এবং একই সাথে আমানতকারী/সঞ্চয়কারী হিসেবে আপনার জমাকৃত অর্থের ওপর অতিরিক্ত অর্থ যোগ করছে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি দুটি পৃথক সুদি লেনদেন:
- (ক) ঋণের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত অর্থ = রিবা (সুদ) —এটি আপনার ওপর জুলুম, তবে বাধ্যবাধকতার কারণে আপনি তা দেওয়ায় গুনাহ আপনার নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের।
- (খ) সঞ্চয়ের ওপর প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ = সুদ —এটি আপনার জন্য গ্রহণ করা হারাম।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ সুদের সংজ্ঞা ও তার স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিটি সুদি চুক্তি স্বতন্ত্রভাবে বিবেচিত হয়; একটির সাথে অন্যটির সমন্বয় শরিয়তে বৈধ নয় (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুর রিবা অধ্যায়)।
৩. "কম সুদ নেওয়া হয়েছে" —এই যুক্তির অগ্রহণযোগ্যতা
শরিয়তের মূলনীতি হলো: হারাম বস্তু হারামই থাকে, তা কম হোক বা বেশি হোক। সুদের পরিমাণ নগণ্য হওয়া তাকে হালাল করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا (এটি সুদের ক্ষেত্রে কিয়াস হিসেবে) —যেমন যিনার নিকটেও যাওয়া নিষিদ্ধ, তেমনি সুদের নিকটেও যাওয়া নিষিদ্ধ।
আরও লক্ষণীয়: সুদি প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেনে "সেট-অফ" বা "নেটিং" ধারণাটি ইসলামি ফিকহে স্বীকৃত নয়। ফিকহে মুআমালাতের মূলনীতি হলো —প্রতিটি আকদ তার স্বতন্ত্র হুকুম বহন করে (আল-মাবসূত, সারাখসি; বাদায়েউস সানায়ে, কাসানি)।
৪. বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের শরিয়তী হুকুম
বাধ্যতামূলক সঞ্চয় (compulsory savings) যদি প্রকৃতপক্ষে ঋণের শর্ত হিসেবে আরোপিত হয়, তবে তা সুদি ঋণের একটি অংশ। হাদিসে এসেছে:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক এমন ঋণ যা উপকার টেনে আনে, তা সুদ।" (এই অর্থে বর্ণিত —আসার, জাসসাস; মাজমাউল আনহুর, হাসকাফি)
অর্থাৎ, ঋণের শর্ত হিসেবে সঞ্চয় আরোপ এবং তার ওপর মুনাফা যোগ করা —উভয়ই রিবার অন্তর্ভুক্ত।
৫. তাহলে করণীয় কী?
- ঋণ পরিশোধ করুন —বাধ্যবাধকতার কারণে ঋণ নেওয়া জায়েজ হতে পারে (মুযতার অবস্থায়), তবে সুদ পরিশোধ করা আপনার গুনাহ নয়, প্রতিষ্ঠানের।
- সঞ্চয়ের ওপর প্রাপ্ত সুদ গ্রহণ করবেন না —এটি সদকা করে দিন (যেমন: গরিব-মিসকিনকে), নিজে ভোগ করবেন না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সুদি ব্যাংকের সুদ সদকা করার বিধান স্পষ্ট করেছেন।
- সুদি প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ের ওপর মুনাফা যোগ হলে —সেটি গ্রহণ না করে সরাসরি সদকায় লাগানো উত্তম; অথবা প্রতিষ্ঠানকে বলে দেওয়া যে, সঞ্চয়ে কোনো মুনাফা যোগ করা যাবে না।
- ভবিষ্যতে ইসলামি ব্যাংক/শরিয়তসম্মত প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করুন —যেমন: মুদারাবা, মুশারাকা, বাই মুআজ্জাল ইত্যাদি শরিয়তসম্মত পদ্ধতি।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | ঋণের সুদ | হারাম, তবে বাধ্যবাধকতায় গুনাহ প্রতিষ্ঠানের | | সঞ্চয়ের ওপর প্রাপ্ত সুদ | হারাম, গ্রহণ করা যাবে না; সদকা করতে হবে | | উভয়ের সমন্বয় (set-off) | শরিয়তে অবৈধ; প্রতিটি সুদ স্বতন্ত্র | | "কম সুদ নেওয়া" যুক্তি | অগ্রহণযোগ্য; হারাম কম হলেও হারাম |
রেফারেন্স
- আল-কুরআন: সূরা বাকারা ২৭৫-২৭৯; সূরা আলে ইমরান ১৩০
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮ (সুদ গ্রহণ-দানকারীর অভিসম্পাত)
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৩৩
- ইমাম সারাখসি, «আল-মাবসূত», কিতাবুর রিবা
- ইমাম কাসানি, «বাদায়েউস সানায়ে», কিতাবুর রিবা
- ইবনে আবিদিন, «রাদ্দুল মুহতার», কিতাবুর রিবা ও কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- হাসকাফি, «মাজমাউল আনহুর» (কুল্লু কারযিন জাররা নাফআন ফাহুয়া রিবা)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, «মাআরিফুল কুরআন», সূরা বাকারার তাফসির
- মুফতি তাকি উসমানি, «ফাতাওয়া উসমানি», কিতাবুর রিবা
- আশরাফ আলী থানভি, «বেহেশতী জেওর», সুদ অধ্যায়
والله أعلم بالصواب