গবেষণার ফরমে বানোয়াট পরিচয় দিয়ে আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা কি জায়েয?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7593
Questioner: Humaira Zaman Humaira
Question Asked: 30 Oct 2026, 01:19 AM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 06:08 AM
Views: 13
Tokens: 5,083
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার একটা রিসার্চ এর প্রয়োজনে একটা ফরম পূরণ করতে হবে। আমি বানোয়াট পরিচয় দিয়ে সেটা পূরণ করতে চাচ্ছি। যেন কেউ আমার আসল পরিচয় ধরতে না পারে। আমার মূল উদ্দেশ্য একটা জিনিসকে সঠিক ভাবে আইডেন্টিফাই করা। সেখানে একটা শর্ত আছে সেখানে বলা আছে আল্লাহর নামে শপথ নিন যে আপনি সকল তথ্য ঠিক দিয়েছেন, আমি যদি সেখানে হ্যাঁ দেই তাহলে কি আমার গুনাহ হবে এবং এর জন্য কি আমাকে কাফফারা দিতে হবে। মূলত কাউকে ধোকা দেওয়া আমার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয় আমার উদ্দেশ্য, আসল সত্যটা বের করা।

Answer

ভুয়া পরিচয়ে ফরম পূরণ ও মিথ্যা শপথ: শরয়ি বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে): হ্যাঁ, এতে গুনাহ হবে এবং এটি জায়েয নয়। আর আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ (ইয়ামিনে গামুস) করলে কাফফারা আসে না; বরং এটি কবিরা গুনাহ, যার জন্য তাওবা ও ইস্তিগফার ওয়াজিব। তবে শপথ ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে না, কারণ এটি শুরু থেকেই মিথ্যা শপথ ছিল।


১. মূল নীতি: মিথ্যা বলা ও মিথ্যা শপথ উভয়ই হারাম

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ "মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারাই, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে ঈমান রাখে না; আর তারাই তো মিথ্যাবাদী।" (সূরা আন-নাহল: ১০৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

إِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ "নিশ্চয়ই মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" (সহীহ বুখারী: ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম: ২৬০৭)

আর আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে:

وَلَا تَتَّخِذُوا أَيْمَانَكُمْ دَخَلًا بَيْنَكُمْ فَتَزِلَّ قَدَمٌ بَعْدَ ثُبُوتِهَا "তোমরা তোমাদের শপথকে পরস্পরের মধ্যে প্রতারণার মাধ্যম বানিও না, ফলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তোমাদের পদস্খলন ঘটবে।" (সূরা আন-নাহল: ৯৪)

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ وَهُوَ فِيهَا فَاجِرٌ لِيَقْتَطِعَ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ "যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে মিথ্যা শপথ করে কোনো মুসলিমের সম্পদ হরণ করার জন্য, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে এমতাবস্থায় যে আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ থাকবেন।" (সহীহ বুখারী: ২৩৫৭; সহীহ মুসলিম: ১৩৮)

২. "ইয়ামিনে গামুস" (মিথ্যা শপথ) — কাফফারা নেই, তাওবা ওয়াজিব।

হানাফি ফিকহের পরিভাষায় জানা-শুনা মিথ্যা শপথকে "ইয়ামিনে গামুস" (يَمِينٌ غَمُوسٌ) বলা হয়। ইমাম সারাখসি রহ. লিখেন:

"اليمين الغموس لا كفارة فيها، لأنها يمين فاجرة، والكفارة إنما تجب في اليمين المنعقدة على أمر مستقبل" "মিথ্যা শপথে কোনো কাফফারা নেই, কারণ এটি পাপিষ্ঠ শপথ; কাফফারা তো কেবল ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ে বদ্ধ শপথ ভঙ্গ হলে wajib হয়।" (আল-মাবসূত, সারাখসি)

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রহ. রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

"اليمين الغموس وهي التي يحلف بها كاذبًا عالمًا... لا كفارة فيها عندنا، بل فيها التوبة والاستغفار" "ইয়ামিনে গামুস হলো যা জানা-শুনে মিথ্যা শপথ করা... আমাদের (হানাফি) মাযহাবে এতে কাফফারা নেই; বরং তাওবা ও ইস্তিগফার wajib।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আইমান)

ইমাম তহাবি রহ. শরহু মাআনিল আসার-এ এবং ইমাম হাকিম/আসার-এ বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:

مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ فَاجِرَةٍ فَلَا كَفَّارَةَ لَهَا "যে ব্যক্তি পাপিষ্ঠ (মিথ্যা) শপথ করল, তার জন্য কোনো কাফফারা নেই।" (মুসলিমের শর্তে; দেখুন: শরহু মাআনিল আসার, কিতাবুল আইমান)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তেও স্পষ্ট:

"اليمين الغموس لا كفارة فيها، وعليه التوبة" "মিথ্যা শপথে কাফফারা নেই; তার উপর তাওবা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল আইমান)

৩. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের প্রয়োগ

আপনি লিখেছেন: ফরমে আল্লাহর নামে শপথ নিতে বলা হয়েছে যে "সকল তথ্য ঠিক দিয়েছেন", অথচ আপনি বানোয়াট পরিচয় দিচ্ছেন। এমতাবস্থায়:

  1. বানোয়াট পরিচয় দেওয়া = মিথ্যা — এটি নিজেই হারাম, যদিও উদ্দেশ্য "সত্য বের করা" হয়। ইসলামে উদ্দেশ্য উপায়কে বৈধ করে না (الغاية لا تبرر الوسيلة)। মিথ্যা কেবল তিনটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম: (ক) যুদ্ধক্ষেত্রে, (খ) দুই মুসলিমের মধ্যকার আপস-মীমাংসায়, (গ) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। (সহীহ মুসলিম: ২৬০৫) — গবেষণার ফরম এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

  2. "হ্যাঁ" দিয়ে মিথ্যা শপথ করা = ইয়ামিনে গামুস — এটি কবিরা গুনাহ। এতে কাফফারা আসে না, বরং তাওবা ও ইস্তিগফার ওয়াজিব।

  3. কাউকে ধোকা দেওয়ার নিয়ত না থাকলেও — শপথের বাক্য মিথ্যা হওয়ায় শপথটি মিথ্যা শপথই থাকবে; নিয়ত এখানে ওজর হবে না, কারণ শপথের বিষয়বস্তু (তথ্য সঠিক) বাস্তবে মিথ্যা।

৪. শরয়ি বিকল্প (যা আপনার উচিত)

  • সত্য তথ্য দিয়ে ফরম পূরণ করুন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর পরিচয় গোপন রাখার বৈধ ব্যবস্থা সাধারণত থাকে — যেমন বেনামি/অ্যানোনিমাস অপশন, ছদ্মনাম (pseudonym) ব্যবহারের অনুমতি, অথবা গবেষককে জানিয়ে সম্মতি নেওয়া। এগুলো ব্যবহার করুন।
  • যদি ফরমে বাধ্যতামূলকভাবে শপথ নিতে হয় এবং আপনি সত্য তথ্য দিতে না চান, তবে সেই ফরম পূরণ থেকে বিরত থাকুন অথবা গবেষক/কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে শপথ ছাড়া অংশগ্রহণের অনুমতি নিন।
  • ইতিমধ্যে মিথ্যা শপথ করে ফেললে: তাওবা করুন, ইস্তিগফার করুন, ভবিষ্যতে বিরত থাকুন; কাফফারা দিতে হবে না। যদি কারও হক নষ্ট হয়ে থাকে, তবে তা ফিরিয়ে দিন বা ক্ষমা চান।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | বানোয়াট পরিচয় দিয়ে ফরম পূরণ | হারাম (মিথ্যা), গবেষণার উদ্দেশ্য ওজর নয় | | আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ ("হ্যাঁ" দেওয়া) | কবিরা গুনাহ — ইয়ামিনে গামুস | | কাফফারা | আসে না (হানাফি মাযহাব) | | করণীয় | তাওবা, ইস্তিগফার; ভবিষ্যতে বিরত থাকা | | বিকল্প | সত্য তথ্য, বেনামি/ছদ্মনামের অনুমতি, বা শপথ ছাড়া অংশগ্রহণ |

রেফারেন্স: সূরা আন-নাহল ৯৪, ১০৫; সহীহ বুখারী ২৩৫৭, ৬০৯৪; সহীহ মুসলিম ১৩৮, ২৬০৫, ২৬০৭; আল-মাবসূত (সারাখসি); শরহু মাআনিল আসার (তহাবি); রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুল আইমান; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল আইমান; ইমদাদুল ফাতাওয়া (থানভি); ফাতাওয়া উসমানি (তাকি উসমানি) — আইমান অধ্যায়।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.