অবৈধ টাকায় তৈরি স্বর্ণের গহনা ও জোর করে নেওয়া গিফট কি হালাল?

Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7591
Questioner: Mst Shapna Akter
Question Asked: 30 Oct 2026, 12:42 AM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 06:02 AM
Views: 10
Tokens: 6,783
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার মা আমার বাবার রাখা টাকা থেকে না জানিয়ে টাকা নিয়ে স্বর্ণের গহনা তৈরি করেন, এরপর আমার বোনকে কিছু দেন, আমার বোন আবার সেখান থেকে এক ভরি আমাকে দান করেন, এখন আমার বোনের দেওয়া এই স্বর্ণের গহনা কি আমার জন্য হালাল হবে?
আমি ইসলামের কিছু মানতাম না এবং আমি হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম, তখন আমি স্পষ্ট শিরকও করতাম, তখন আমি ওই লোকের থেকে জোর করে কিছু গিফট নিতাম যেটা সে দিতে চাইতো না কিন্তু আমি জোর করে নিতাম, এরপর তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় আর আমি এরপর ইসলামে পুরোপুরি দাখিল হই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া গিফট আমি ব্যবহার করছি এটা কি আমার জন্য হারাম? আমি নষ্ট হবে তাই ফেলে না দিয়ে ওইটা ব্যবহার করছি, যদি হারাম হয় কিভাবে এটার ঋণ আমি পরিশোধ করব কেননা আখিরাতে এটা আমার জন্য ঋণ হয়ে থাকবে তো আমি এটা কিভাবে পরিশোধ করব? তার সাথে যোগাযোগ করার কোনো ইচ্ছা নেই, যদি করে মাফ চাই আর সে বলে মাফ করে দিছি হবে? আমি কিভাবে জানব সে মন থেকে মাফ করছে কিনা? ইসলামে কেউ যখন বলে মাফ করে দিছি সেটা কি মাফ হিসেবে গণ্য হয় নাকি কি করতে হয়? কেননা আমি শুনছি শুধু মুখে মাফ বললে হয় না অন্তর থেকে মাফ করতে হয় কিন্তু আমি তো জানিনা তার অন্তরে কি আছে?

Answer

উত্তর

প্রথম প্রশ্ন: মায়ের অবৈধভাবে নেওয়া টাকায় তৈরি গহনা বোনের মাধ্যমে দান হিসেবে পাওয়া কি হালাল?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এভাবে পাওয়া গহনা আপনার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না প্রকৃত মালিক (আপনার বাবা) সন্তুষ্ট হয়ে ক্ষমা করেন বা তার হক ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

বিশ্লেষণ:

আপনার মা আপনার বাবার অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ নিয়েছেন — এটি শরীয়ত অনুযায়ী গনিমত/আমানতের খিয়ানত হিসেবে গণ্য, যা হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ» — "কোনো মুসলিমের সম্পদ তার মনোতুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।" (সহীহ, আহমাদ, আলবানী সহীহুল জামি' ৭৬৬২-এ হাসান বলেছেন)

আর আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ — "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা নিসা: ২৯)

গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি (ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম): হারাম সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে হালাল হয় না। সুতরাং আপনার মা যে গহনা বানিয়েছেন তা মূলত আপনার বাবার সম্পদ; তা আপনার বোনকে দান করলেও মালিকানা বৈধ হয়নি। আপনার বোনের কাছ থেকে আপনি যা পেয়েছেন, তা-ও তাই।

তবে একটি ব্যতিক্রম: যদি আপনার বাবা জানার পর সন্তুষ্টচিত্তে ক্ষমা করে দেন (طِيب نفس), তাহলে সম্পদটি হালাল হয়ে যাবে। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, মালিকের অনুমতি বা ক্ষমা সম্পদকে হালাল করে দেয়।

আপনার করণীয়:

  1. আপনার বাবাকে বিষয়টি জানান এবং তার ক্ষমা/সন্তুষ্টি নিন। তিনি ক্ষমা করলে গহনাটি হালাল।
  2. তিনি ক্ষমা না করলে গহনার মূল্য (বা গহনাটি) তার কাছে ফিরিয়ে দিন বা তার সম্মতিতে অন্য কোনোভাবে সমঝোতা করুন।
  3. আপনার বোনের দান আপনার ওপর কোনো বৈধ মালিকানা সৃষ্টি করেনি, কারণ দাতা নিজেই বৈধ মালিক ছিলেন না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: জোর করে নেওয়া গিফট ব্যবহার করা কি হারাম? কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, জোর করে (বলপ্রয়োগে/অনিচ্ছায়) নেওয়া সম্পদ হারাম এবং তা আপনার যিম্মায় ঋণ হিসেবে থাকবে। এটি ব্যবহার করা জায়েয নয়, যতক্ষণ না মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া বা তার ক্ষমা নেওয়া হয়।

দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«عَلَى الْيَدِ مَا أَخَذَتْ حَتَّى تُؤَدِّيَهُ» — "যে হাত নিয়েছে, তা আদায় না করা পর্যন্ত সেই হাতই তার যিম্মায় দায়বদ্ধ।" (তিরমিযী ১২৬৬, আবু দাউদ ৩৫৬১ — আলবানী সহীহ বলেছেন)

আর যুলুমের ব্যাপারে:

«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهَا» — "যার কাছে তার ভাইয়ের হক (যুলুম) রয়েছে, সে যেন দুনিয়াতেই তা থেকে মুক্তি নেয় (ক্ষমা চায়/ফিরিয়ে দেয়)।" (বুখারী ২৪৪৯)

আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে):

  1. প্রথম উপায় — মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা নেওয়া: সম্ভব হলে তার সাথে যোগাযোগ করে সম্পদ ফিরিয়ে দিন বা ক্ষমা চান। এটি সর্বোত্তম ও নিশ্চিত পথ।

  2. যোগাযোগ সম্ভব না হলে — মূল্য সদকা করা: যদি সত্যিই যোগাযোগের কোনো উপায় না থাকে এবং মালিককে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিমের মত অনুযায়ী তার পক্ষ থেকে মূল্য সদকা করে দিন (তার নামে দান)। এটি তার হক আদায়ের একটি উপায়। ইবনুল কাইয়্যিম «إعلام الموقعين»-এ বলেন, অজ্ঞাত মালিকের হক সদকা করলে ইনশাআল্লাহ দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

  3. আপনি যেহেতু ইসলামে পূর্ণভাবে দাখিল হয়েছেন — এটি একটি মহা নিয়ামত। আল্লাহ বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا — "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" (সূরা যুমার: ৫৩)

তবে শিরকের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন তাওবার মাধ্যমে — আপনি তাওবা করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু মানুষের হক (সম্পদ) আল্লাহ ক্ষমা করেন না যতক্ষণ মালিক ক্ষমা না করেন বা হক আদায় না হয় — তাই এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ।


তৃতীয় প্রশ্ন: মুখে "মাফ করে দিলাম" বললে কি মাফ হয়? অন্তরের বিষয় কীভাবে জানব?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, শরীয়ত অনুযায়ী মুখে ক্ষমা ঘোষণা করাই যথেষ্ট — আপনাকে তার অন্তর যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে হক আদায়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। চাপ প্রয়োগ করে মৌখিক দায়মুক্তি নেওয়া গ্রহণযোগ্য হবে না।

দলিল ও মূলনীতি:

  1. প্রকাশ্য কথা গ্রহণযোগ্য: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنَّمَا يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلَّ بَعْضَكُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبُ أَنَّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِي لَهُ...» — "আমি তো মানুষ; বিবাদকারীরা আমার কাছে আসে, হয়তো তোমাদের কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি বাগ্মী হয়, আমি তাকে সত্যবাদী মনে করে তার পক্ষে রায় দিই..." (বুখারী ৭১৮১)

  1. অন্তর আল্লাহর কাছে: আপনি কারও অন্তর জানার দায়িত্বে নন। আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ — "যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না।" (সূরা ইসরা: ৩৬)

  1. ইবন তাইমিয়্যাহর মূলনীতি: প্রকাশ্য ক্ষমা (إبراء/عفو) ঘোষণা করলে দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহর কাছে। তবে যদি আপনি সন্দেহ করেন যে সে মুখে বলছে কিন্তু অন্তরে ক্ষমা করেনি, তাহলে সতর্কতামূলক পথ হলো সম্পদটি তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া বা তার নামে সদকা করা — এতে কোনো সন্দেহ থাকে না।

  2. শাইখ ইবন বায ও ইবন উসাইমীনের ফতোয়া: তারা বলেন, মালিক যখন বলে "ক্ষমা করলাম" বা "হক ছেড়ে দিলাম", তখন তা গ্রহণযোগ্য; আপনাকে তার অন্তর পরীক্ষা করতে হবে না। তবে হক আদায়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উত্তম।

সারসংক্ষেপ: যদি আপনার বোন/বাবা/সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্পষ্টভাবে ক্ষমা ঘোষণা করেন, তা গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। আর যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া বা সদকা করা — এটাই সর্বোচ্চ তাকওয়া।


চূড়ান্ত পরামর্শ

  1. বাবার সম্পদ: তাকে জানিয়ে ক্ষমা নিন; না পেলে গহনার মূল্য তার নামে ফিরিয়ে দিন/সদকা করুন।
  2. জোর করে নেওয়া গিফট: মালিককে ফিরিয়ে দিন বা ক্ষমা নিন; সম্ভব না হলে তার নামে সদকা করুন।
  3. তাওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন — আপনি ইসলামে ফিরে এসেছেন, এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত।
  4. সন্দেহের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন — এতে দায় থেকে মুক্তি নিশ্চিত হয়।

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا — "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.