জমি মসজিদের নামে নামকরণ না হলে এবং মসজিদ নির্মাণ শুরু না করলে তা অছিয়ত হিসেবে গণ্য হবে কি না ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার আব্বা উনার জীবদ্দশায় একটা জায়গার উপরে মসজিদ করতে চেয়েছিলেন এবং মসজিদ করার জন্য অনেক বেশি উনি চেষ্টা করে ছিলেন, মসজিদের নামে জায়গাটা নামকরণের জন্য অনেক বেশি দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন, মসজিদের নামে জায়গাটা নামকরণের জন্য উনি মোহুরির কাছে কয়েকবার দারস্ত হন কিন্তু মোহরি টাকা বেশি চাওয়াতে মসজিদের নামে নামকরণটি হয়নি। মসজিদ করার জন্য ওনার ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন এবং ছেলেমেয়েরা উনাকে আশ্বস্ত করেন যে মসজিদ করতে গিয়ে যে পরিমাণ সহায়তা লাগে তারা তা দিতে প্রস্তুত আছে, কিন্তু ওনার জীবদ্দশায় উনি মসজিদের কাজ শুরু করতে পারেননি, আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন এমত অবস্থায় এটা অছিয়ত হবে কিনা? জানালে কৃতজ্ঞ থাকিব।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আল্লাহ তাআলা আপনার মরহুম পিতাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং মসজিদে বাইতুল্লাহ নির্মাণের উনার এই মহৎ ও সওয়াবের নিয়তকে উনার জন্য নাজাতের অসীলা বানিয়ে দিন। আমীন।
আপনার পিতাজী জীবদ্দশায় জমিটিতে মসজিদ করার চেষ্টা করেছিলেন এবং সন্তানদের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন, কিন্তু চূড়ান্ত করে যেতে পারেননি—এ অবস্থায় বিষয়টি ফিকহে হানাফীর আলোকে শরঈ ওয়াকফ, অছিয়ত ও ওয়ারিশদের করণীয় সংক্রান্ত তিনটি ধাপে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
১. জীবদ্দশায় জমিটি শরঈ ওয়াকফ বা 'শরঈ মসজিদ' হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছিল কি?
উত্তর: না, আপনার পিতাজীর জীবদ্দশায় উক্ত জমিটি শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াকফ বা 'শরঈ মসজিদ' হিসেবে চূড়ান্ত হয়নি।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী কোনো জমি শরঈ মসজিদ বা ওয়াকফ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য মৌলিক শর্ত হলো— জমির মালিক কর্তৃক স্পষ্টভাবে ওয়াকফের ঘোষণা দেওয়া, জমিটি নিজস্ব মালিকানা ও কবজা থেকে বের করে দেওয়া অথবা সেখানে সর্বসাধারণের জন্য নামায পড়ার উন্মুক্ত অনুমতি (ইযনে আম) প্রদান করা।
যেহেতু আপনার পিতাজী জমিটি মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি করার চেষ্টা করেও মোহুরির দাবিকৃত টাকার কারণে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করতে পারেননি এবং জীবদ্দশায় সেখানে মসজিদ নির্মাণ বা নামাযও শুরু হয়নি, তাই জমিটি উনার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত উনারই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বহাল ছিল।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৫০–৩৫১ (অধ্যায়: 'ওয়াকফের বিবরণ — বাড়ি বা জমিকে শরঈ মসজিদ বানানোর আবশ্যিক শর্তাবলী')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৫শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১০৪–১০৬ (অধ্যায়: কিতাবুল ওয়াকফ ও বাবুল মাসাজিদ — 'মালিকানা প্রত্যাহার না হওয়া এবং রেজিস্ট্রেশনের চেষ্টা করার দ্বারা জমি ওয়াকফ বা শরঈ মসজিদ না হওয়ার ফতোয়া')।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩০১–৩০২ এবং ৩৩৩–৩৩৫ (অধ্যায়: 'ওয়াকফ ও মসজিদের মালিকানা হস্তান্তরের মৌলিক ফিকহী আহকাম') ।
২. এটি কি শরঈ অছিয়ত (وصية) হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর: এখানে দুটি অবস্থা হতে পারে:
১. যদি তিনি স্পষ্ট নির্দেশ/উইল করে থাকেন (শরঈ অছিয়ত): যদি আপনার পিতা ইন্তেকালের পূর্বে মুখ ফুটে বা লিখিতভাবে সন্তানদের স্পষ্টভাবে কোনো নির্দেশ বা উইল করে যান যে— "আমার মৃত্যুর পর এই জমিতে তোমরা মসজিদ বানিয়ে দিও" অথবা "আমার ত্যাজ্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন কোরো", তবে তা ফিকহের পরিভাষায় একটি শরঈ অছিয়ত (Wasiyyat) হিসেবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে উনার রেখে যাওয়া মোট ত্যাজ্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) সীমার ভেতর থেকে এই অছিয়ত পূরণ করা ওয়ারিশদের ওপর আবশ্যিক নিয়ম।
২. যদি তিনি নির্দিষ্ট অছিয়ত বা নির্দেশ না দিয়ে থাকেন (নেক আকাঙ্ক্ষা): আর যদি তিনি মৃত্যুকালে এমন কোনো নির্দিষ্ট অছিয়ত বা নির্দেশনা দিয়ে না যান; বরং কেবল নিজের জীবদ্দশাতেই এটি করার ইচ্ছা ও চেষ্টা করেছিলেন এবং সন্তানদের সাহায্য চেয়েছিলেন, তবে এটি পারিভাষিক শরঈ বাধ্যতামূলক অছিয়ত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি উনার অতৃপ্ত দ্বীনী নেক আকাঙ্ক্ষা ও সুসংবাদের নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৫১ ও ৩৫৭ (অধ্যায়: 'ওয়াকফের বিবরণ — ১/৩ অংশ দিয়ে মসজিদ নির্মাণের অছিয়ত সহীহ হওয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২০তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৫৫ (অধ্যায়: কিতাবুল ওসায়া / অছিয়ত পরিচ্ছেদ — 'অছিয়ত সহীহ হওয়ার শর্তাবলী ও ত্যাজ্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বিধান')।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৪০–২৪১ (অধ্যায়: 'বদলী কাজ, অছিয়ত ও মিরাছ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের ফিকহী বিচার')।
৩. সন্তান ও ওয়ারিশদের বর্তমান করণীয় (উত্তম ও সুন্নাতসম্মত পথ):
যেহেতু জমিটি পিতার ইন্তেকালের সময় উনার ব্যক্তিগত মালিকানায় ছিল, তাই ফারায়েজের শরঈ নিয়ম অনুযায়ী উক্ত জমিটি এখন আপনাদের (পিতার সকল ছেলে-মেয়েদের) যৌথ মালিকানাধীন মিরাস সম্পত্তি।
সন্তানদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ ও নৈতিক দায়িত্ব: যদিও আইনগতভাবে জমিটি সরাসরি মিরাছ সম্পত্তি, তবুও সন্তান হিসেবে আপনাদের জন্য এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বিরাট সৌভাগ্যের দুয়ার।
- আপনার পিতা জীবদ্দশায় এই জমিটিতে মসজিদ করার আকুল ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন এবং আপনারা (ছেলে-মেয়েরা) উনাকে আশ্বস্তও করেছিলেন।
- তাই আপনাদের করণীয় হলো— পিতার সেই ওয়াদা ও নেক স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা। যদি আপনারা সকল ভাই-বোন প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের হন, তবে সকলে স্বতঃস্ফূর্ত ও সানন্দ চিত্তে একমত হয়ে (কিসমাতুত তরাযী) উক্ত জমিটি মসজিদের জন্য দান করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করে দিন।
এটি একদিকে পিতার প্রতি সন্তানদের সর্বোচ্চ অনুগত ও সৎ হওয়ার প্রমাণ, অপরদিকে এর মাধ্যমে আপনাদের মরহুম পিতা কবরে বসে কেয়ামত পর্যন্ত 'সদকায়ে জারিয়াহ'-এর অগণিত সওয়াব পেতে থাকবেন এবং উনাকে আশ্বস্ত করার কারণে আপনাদের ওয়াদাও পূরণ হবে।
(নোট: যদি ওয়ারিশদের মধ্যে কেউ নাবালেগ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকে, তবে তার অংশ বাদে কেবল বালেগ ওয়ারিশরা নিজেদের অংশ থেকে জমি বা টাকা দান করতে পারবেন।)
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৫শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৫২–৫৫ (অধ্যায়: কিতাবুল ওয়াকফ — 'মৃত ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী ওয়ারিশদের নিজ উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণ ও সওয়াব পৌঁছানোর ফতোয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৫৭ (অধ্যায়: ওয়াকফ — 'ওয়ারিশগণের সর্বসম্মত সম্মতিক্রমে সম্পত্তি ওয়াকফ করা')।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৫–২৬৭ (অধ্যায়: 'মিরাছ সম্পত্তি ওয়ারিশদের সম্মতিক্রমে নেক খাতে ব্যবহারের শরঈ নিয়ম')।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকল ভাই-বোনকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মরহুম পিতার এই নেক স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার তাওফীক দান করুন এবং আপনাদের পরিবারে বরকত দান করুন। আমীন।
আল্লাহ ভালো জানেন।