আল্লাহ তাআলা নবী করীম ﷺ-কে অবশ্যই সর্বোত্তম স্থানে (মাকামে মাহমুদে) আসীন করবেন—এটা সত্য। তাহলে প্রত্যেক আজানের পর তাঁর জন্য দোয়া করার কী প্রয়োজন? তিনি তো ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আল্লাহ তো নবী কে অবশ্যই সর্বোত্তম স্থানে অসনিত করবেন। তাহলে আজান শেষে উনার জন্য দোয়া কেন করা হয় প্রত্যেক আজানের শেষে ?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম: আল্লাহ তাআলা নবী করীম ﷺ-কে অবশ্যই সর্বোত্তম স্থানে (মাকামে মাহমুদে) আসীন করবেন—এটা সত্য। তাহলে প্রত্যেক আজানের পর তাঁর জন্য দোয়া করার কী প্রয়োজন? তিনি তো ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
উত্তর:
প্রথম কথা হলো—আজানের পর নবী ﷺ-এর জন্য যে দোয়া করা হয়, তা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নয়; বরং তা আল্লাহর নির্দেশ পালন এবং আমাদের নিজেদের জন্য কল্যাণ ও সাওয়াব অর্জন। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত (দরুদ) ও সালাম পেশ করো।" — (সূরা আহযাব: ৫৬)
এখানে লক্ষণীয়: আল্লাহ নিজেই নবীর প্রতি রহমত পাঠান, অথচ তিনি নবীর মর্যাদা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন। সুতরাং দোয়া করা তাঁর মর্যাদার অভাব পূরণের জন্য নয়; বরং এটি আল্লাহর হুকুম পালন।
আজানের পরের বিশেষ দোয়ার ভিত্তি:
হাদিসে এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ الْمُؤَذِّنَ ... ثُمَّ يُصَلِّي عَلَيَّ ... ثُمَّ يَسْأَلُ لِيَ الْوَسِيلَةَ ... حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"যে ব্যক্তি আজান শুনে ... এরপর আমার উপর দরুদ পাঠ করবে ... অতঃপর আমার জন্য ওসিলা (মাকামে মাহমুদ) প্রার্থনা করবে ... তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪; সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়—আজানের পর দোয়া করার মূল লক্ষ্য হলো শাফাআত লাভ এবং আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে তাঁর প্রশংসা করা। নবী ﷺ নিজেই আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে তাঁর জন্য দোয়া করতে হবে; আমরা তা পালন করছি।
দ্বিতীয় দিক—দোয়া করা মানে মর্যাদা কমে যাওয়া নয়:
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, নবী ﷺ সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর জন্য আরও রহমত ও বরকত প্রার্থনা করা আমাদের ইবাদত। যেমন পিতা-মাতা সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ চাইলেও সন্তান তাদের জন্য দোয়া করে—এতে পিতা-মাতার মর্যাদা কমে না; বরং সন্তানের আনুগত্য প্রকাশ পায়। তেমনি উম্মত হিসেবে আমরা নবীর জন্য দোয়া করি—এটি আমাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ।
তৃতীয় দিক—আজানের পর দোয়ার নির্দিষ্ট সময়:
আজান শেষে দরুদ ও ওসিলার দোয়া করার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত হয়েছে হাদিস দ্বারা। এটি একটি মুস্তাহাব আমল, যা প্রত্যেক নামাজের আগে পালন করা হয়। এতে উম্মতের জন্য সাওয়াব ও শাফাআতের সুসংবাদ রয়েছে।
চতুর্থ দিক—আল্লাহর হুকুম ও প্রজ্ঞা:
আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন, তার মধ্যে হিকমত (প্রজ্ঞা) থাকে—আমরা সব হিকমত পুরোপুরি জানি না। আমাদের কর্তব্য হলো আদেশ পালন করা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং মোল্লা আলী কারী (রহ.) «শরহু মাআনিল আছার»-এ আজানের পরের দোয়ার বিধান ও ফজিলত বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
সংক্ষেপে:
- আজানের পর দোয়া করা আল্লাহর নির্দেশ (সূরা আহযাব: ৫৬)।
- এটি নবীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নয়; বরং আমাদের শাফাআত লাভ ও সাওয়াবের জন্য।
- নবী ﷺ নিজেই এই দোয়া শিখিয়েছেন (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)।
- এটি আমাদের ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নবী ﷺ-এর প্রতি সঠিক আকিদা ও ভালোবাসা দান করুন এবং তাঁর শাফাআত নসীব করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।