ফেসবুক, ইউটিউব ও ওয়েবসাইটে নিউজ চ্যানেল খুলে অ্যাডসেন্স/বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা কি জায়েজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7578
Questioner: Mohammad Masum
Question Asked: 29 Oct 2026, 09:00 PM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 09:11 PM
Views: 21
Tokens: 6,052
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি ফেসবুক এবং ইউটিউবে এবং ওয়েব সাইটের মাধ্যমে নিউজ চ্যানেল খুলে নিউজ পাবলিস্ট করার কার্যক্রম শুরু করতে চাচ্ছি। এক্ষেত্রে আমার প্রাথমিক ইনকামের একমাত্র পথ হবে ফেসবুক এবং ইউটিউবে এডসেন্সের মাধ্যমে ইনকাম। নিউজ চ্যানেলের মাধ্যমে নিউজ পাবলিস্ট করে ফেসবুক এবং ইউটিউব থেকে কিংবা ওয়েবসাইট থেকে টাকা নেওয়া জায়েজ আছে কিনা? যদি না থাকে তাহলে নিউজ চ্যানেলের এছাড়া ইনকামের পথ কি? যদি একেবারে নিউজ চ্যানেল ইসলামপন্থীদের না থাকে তাহলেও তো সমস্যা!

Answer

ফেসবুক/ইউটিউব/ওয়েবসাইটে নিউজ চ্যানেল খুলে বিজ্ঞাপন থেকে আয় — শরয়ী বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর (উত্তরটি আগে পড়ুন)

নিউজ চ্যানেল খোলা ও পরিচালনা করা নিজে হারাম নয়; বরং সত্য-নিষ্ঠ ও শরয়ী সীমা রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন করা বৈধ ও অনেক ক্ষেত্রে সাওয়াবের কাজ। তবে এতে আয়ের হালাল-হারাম নির্ভর করবে কী ধরনের কনটেন্ট পরিবেশন করা হচ্ছে এবং বিজ্ঞাপনদাতার বিজ্ঞাপন কী ধরনের — এই দুই বিষয়ের উপর।

  • যদি চ্যানেলের কনটেন্ট শরীয়তসম্মত হয় (মিথ্যা, গীবত, ছবি/ভিডিওর শরয়ী নিষেধাজ্ঞা, নাচ-গান, অশ্লীলতা, কুফর-শিরক, ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি থেকে মুক্ত) এবং বিজ্ঞাপনও হালাল পণ্য/সেবার হয় — তাহলে ইউটিউব অ্যাডসেন্স, ফেসবুক ইন-স্ট্রিম/স্টার/অ্যাড ব্রেক, ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন থেকে আয় হালাল।
  • আর যদি কনটেন্টে হারাম কিছু থাকে, বা বিজ্ঞাপনে হারাম পণ্য (সুদি ব্যাংক-বিমা, মদ, জুয়া, বাজি, অশ্লীল ছবি, নাচ-গান, কুফরি/শিরকি বিষয়) প্রচারিত হয় — তাহলে সেই আয় হারাম বা অন্ততপক্ষে সন্দেহযুক্ত (মশবুহ), যা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

১. মূল নীতি: আয়ের মাধ্যম ও বিষয়বস্তু উভয়টাই হালাল হতে হবে

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো— "الإجارة على المعاصي باطلة" (গুনাহের কাজে পারিশ্রমিক/চুক্তি বাতিল)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ» — "নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো বস্তুকে হারাম করেছেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেছেন।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৮৮; মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, যে কাজ নিজে করা হারাম, তার উপর উজরত (পারিশ্রমিক) নেওয়াও হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারা)

আর অন্যদিকে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

«وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ» — "সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)

সুতরাং বিজ্ঞাপন থেকে আয় তখনই হালাল হবে, যখন বিজ্ঞাপনটি হালাল পণ্যের হবে এবং যে কনটেন্টে বিজ্ঞাপনটি বসছে সেটিও হালাল হবে।


২. ইউটিউব অ্যাডসেন্স ও ফেসবুকের আয়ের হুকুম

(ক) হালাল হলে

ইউটিউব/ফেসবুকের বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত অর্থ মূলত একটি ইজারার উজরত (সেবার পারিশ্রমিক) — আপনি প্ল্যাটফর্মকে কনটেন্ট ও দর্শক-মনোযোগ "সেবা" হিসেবে দিচ্ছেন, বিনিময়ে প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপনদাতার পক্ষ থেকে আপনাকে অর্থ দিচ্ছে। ফিকহের দৃষ্টিতে এটি ইজারা/জুয়ালা (contract of service)-এর অন্তর্ভুক্ত। শর্ত হলো— সেবাটি (কনটেন্ট) হালাল হওয়া এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়টি (বিজ্ঞাপন) হালাল হওয়া।

ইমাম সারাখসি (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ এবং ইমাম কাসানি (রহ.) «বাদায়িউস সানায়ি»-এ স্পষ্ট করেছেন— ইজারার বৈধতার জন্য "المعقود عليه" (যে কাজটি করা হচ্ছে) হালাল হওয়া শর্ত। হারাম কাজের ইজারা বাতিল।

(খ) হারাম বা সন্দেহযুক্ত হলে

  • কনটেন্টে হারাম: নাচ-গান, অশ্লীল দৃশ্য, মিথ্যা সংবাদ, গীবত, কারও সম্মানহানি, কুফরি/শিরকি প্রচার, ইসলামবিদ্বেষ — এসব থাকলে সেই ভিডিওর বিজ্ঞাপন আয় হারাম।
  • বিজ্ঞাপনে হারাম: সুদি ব্যাংক/বিমা, মদ, জুয়া, বাজি, অশ্লীল অ্যাপ, নাচ-গানের প্রমোশন — এসব বিজ্ঞাপন থেকে আয় হারাম। কারণ আপনি হারাম প্রচারে সহযোগিতা করছেন (সূরা মায়িদা: ২)।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, "যে ব্যক্তি গুনাহের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, তার জন্য সেই কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)


৩. নিউজ চ্যানেলের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

সংবাদ পরিবেশনে কয়েকটি শরয়ী সীমা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে:

  1. সত্যতা যাচাই: মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন কবিরা গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলল..." — এবং সাধারণভাবে মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
  2. গীবত ও সম্মানহানি এড়ানো: «وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا» (সূরা হুজুরাত: ১২)।
  3. ছবি/ভিডিওর বিধান: জীবন্ত প্রাণীর ছবি সংক্রান্ত হাদিস (সহিহ বুখারি ৫৯৫১, সহিহ মুসলিম ২১১০) অনুযায়ী হানাফি ফকীহগণ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেন। নিউজ চ্যানেলে যদি মানব-ছবি/ভিডিও অনিবার্য হয়, তবে ফকীহগণের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; তবে অশ্লীলতা ও ফিতনার দৃশ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  4. নারীদের ছবি/ভিডিও: পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে এমন দৃশ্য সম্পূর্ণ হারাম।
  5. মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, ফিতনা সৃষ্টি, রাজনৈতিক মিথ্যা — এসব থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফিকহুল বুয়ূ ওয়া আত-তামওয়ীল আল-ইসলামি»-তে এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ স্পষ্ট করেছেন— মিডিয়া/বিজ্ঞাপন থেকে আয় হালাল হওয়ার শর্ত হলো কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপন উভয়টি শরীয়তসম্মত হওয়া।


৪. "ইসলামপন্থী না হলেও সমস্যা" — এই আশঙ্কার জবাব

আপনার আশঙ্কাটি অমূলক নয়, তবে সমাধানও আছে। নিউজ চ্যানেল ইসলামপন্থী হওয়া জরুরি নয়; জরুরি হলো কনটেন্ট শরীয়তসম্মত হওয়া। অর্থাৎ—

  • আপনি নিরপেক্ষ/সাধারণ সংবাদ চ্যানেল রাখতে পারেন, যেখানে সত্য সংবাদ, শিক্ষামূলক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয় থাকবে — এতে ইসলামপন্থী না হলেও সমস্যা নেই, যতক্ষণ হারাম কিছু না থাকে।
  • বরং ইসলামপন্থী না হওয়াটাই বাধ্যতামূলক নয়; বাধ্যতামূলক হলো হারাম থেকে মুক্ত থাকা।

৫. বিকল্প হালাল আয়ের পথ

যদি অ্যাডসেন্স/ফেসবুক বিজ্ঞাপন থেকে আয় শরয়ী শর্ত পূরণ না করে বা সন্দেহ থেকে যায়, তাহলে নিম্নলিখিত হালাল পথগুলো বিবেচনা করুন:

  1. স্পনসরশিপ/বিজ্ঞাপন সরাসরি হালাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া — যেমন হালাল খাদ্য, ইসলামি বই, হালাল ই-কমার্স, শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। এতে বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু নিজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
  2. পেইড সাবস্ক্রিপশন/মেম্বারশিপ — দর্শকদের কাছ থেকে সরাসরি ফি নেওয়া (হালাল কনটেন্টের বিনিময়ে)।
  3. হালাল পণ্য/সেবা বিক্রি — যেমন ইসলামি বই, কোর্স, ক্যালিগ্রাফি, হালাল ফুড ডেলিভারি ইত্যাদি।
  4. ইউটিউব/ফেসবুকের "সুপার চ্যাট/স্টার" — যদি দর্শকদের পাঠানো অর্থ হালাল হয় এবং কনটেন্টও হালাল হয়।
  5. ফ্রিল্যান্সিং/কনটেন্ট রাইটিং/ভিডিও এডিটিং — হালাল কাজের বিনিময়ে।
  6. ওয়েবসাইটে হালাল অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং — হালাল পণ্যের প্রমোশন।
  7. দান/সদকা — দর্শকদের স্বেচ্ছা দান (তবে এটি আয়ের প্রধান পথ হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয়)।

মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ এবং «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে উল্লেখ করেছেন— ব্যবসা/আয়ের ক্ষেত্রে "মালে খাবিস" (অপবিত্র/হারাম মাল) থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক; সন্দেহযুক্ত ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা কর্তব্য।


৬. ব্যবহারিক পরামর্শ (খুতবা আকারে)

  1. চ্যানেলের কনটেন্ট পলিসি লিখিতভাবে ঠিক করুন — কী কী বিষয় থাকবে, কী থাকবে না।
  2. বিজ্ঞাপন ফিল্টার করুন — ইউটিউব/ফেসবুকে "ব্লকড ক্যাটাগরি" সেট করুন (মদ, জুয়া, ডেটিং, অশ্লীলতা ইত্যাদি ব্লক)।
  3. সন্দেহ হলে সেই নির্দিষ্ট ভিডিওর আয় আলাদা করে রাখুন এবং হালাল কাজে দান করে দিন (তবে হারাম আয় দান করলেও গুনাহ মাফ হয় না — তাই মূল উৎস পরিশুদ্ধ করাই আসল)।
  4. নিয়ত ঠিক রাখুন — সত্য সংবাদ পরিবেশন ও মুসলিম উম্মাহর উপকারের নিয়ত করুন; ইনশাআল্লাহ আয়েও বরকত হবে।

উপসংহার

নিউজ চ্যানেল খোলা ও বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা মূলত জায়েজ — শর্ত হলো কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপন উভয়টি শরীয়তসম্মত হওয়া। ইসলামপন্থী না হলেও সমস্যা নেই, যদি হারাম বিষয়বস্তু ও হারাম বিজ্ঞাপন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। আর যদি তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে সরাসরি হালাল ব্যবসায়ীদের স্পনসরশিপ, মেম্বারশিপ, হালাল পণ্য বিক্রি ইত্যাদি বিকল্প পথ অবলম্বন করুন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।


তথ্যসূত্র (References):

  • আল-কুরআন: সূরা মায়িদা ২, সূরা হুজুরাত ১২
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৮৮; মুসনাদে আহমাদ
  • সহিহ বুখারি ৫৯৫১; সহিহ মুসলিম ২১১০
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুল ইজারা ও কিতাবুল হাযর
  • আল-মাবসূত (সারাখসি), কিতাবুল ইজারা
  • বাদায়িউস সানায়ি (কাসানি), কিতাবুল ইজারা

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.