ইসলামে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের ইনসাফবিত্তিক সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,
ইলমে ফারায়েজ তো উত্তরাধিকারগণের অংশ নির্ধারিত করে দেয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, চুড়ান্ত বন্টনের সময় আমার খাল বা ডাঙ্গা, সামনে বা পিছনের জমি, বা শহরের জমি ও গ্রামের জমি অথবা রাস্তার পাশের জমি বা ভিতরের কৃষি জমি এগুলোর ক্ষেত্রে ইনসাফ কেমনে করব? এ বিষয়ে উত্তম পদ্ধতি কোনটা?
দিতীয়তঃ ইসলামী ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারগণ কি মৃত ব্যাক্তির জমির প্রতি দাগে দাগে তাদের অংশ বের করবে এটা জরুরী? নাকি মৃত ব্যাক্তির সমস্ত সম্পদ আগে হিসেব করে বের করবে তারপরে সবার সম্মতিতে একেকজন একেক প্লট নিবে? সেটা হতে পারে একই দাগে বা বিভিন্ন দাগে। দয়া করে উত্তম পদ্ধতিগুলো যদি বলতেন খুবই ভালো হতো।শুকরিয়া।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর (সংক্ষেপে): ইসলামী উত্তরাধিকার (ফারায়েজ) অনুযায়ী প্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পূর্ণ সম্পদ (সব জমি, দাগ, প্লট, টাকা-পয়সা, আসবাব ইত্যাদি) একত্রে হিসাব করে প্রত্যেক ওয়ারিসের শরীয়ত নির্ধারিত অংশ (শেয়ার) বের করা জরুরি। এরপর ওয়ারিসদের সর্বসম্মতিতে সম্পদকে ভৌতভাবে ভাগ করা যাবে—একই দাগে বা ভিন্ন দাগে, একেকজন একেক প্লট নিতে পারে; এমনকি কেউ নগদ মূল্য নিয়ে জমি ছেড়ে দিতে পারে। তবে প্রত্যেক দাগে দাগে আলাদা করে অংশ বের করা শরীয়তের আবশ্যকতা নয়; বরং সামগ্রিক শেয়ার নির্ধারণ করে পারস্পরিক সম্মতি ও ইনসাফের ভিত্তিতে ভাগ করাই উত্তম। জমির ভালো-মন্দ, অবস্থান, কৃষিযোগ্যতা ইত্যাদি বিবেচনায় সমতা রাখতে হবে; প্রয়োজনে মূল্য নির্ধারণ (তাকসিম বা বিক্রয়) করে সমন্বয় করতে হবে। কোনো ওয়ারিসকে জবরদস্তি করে কম/খারাপ জমি দেওয়া যাবে না।
বিস্তারিত উত্তর
১. মূলনীতি: প্রথমে সামগ্রিক হিসাব, পরে ভাগ
ইসলামী ফারায়েজের মূলনীতি হলো—মৃত ব্যক্তির তরকা (সম্পদ) থেকে প্রথমে দাফন-কাফন, ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত (এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে) সম্পন্ন হবে; এরপর অবশিষ্ট সম্পদ ওয়ারিসদের মাঝে শরীয়ত নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
«يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ...» “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন—পুত্রের জন্য দুই কন্যার অংশের সমান...” (সূরা নিসা: ১১)
«وَلِكُلٍّ جَعَلْنَا مَوَالِيَ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ...» “পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয় যা রেখে যায়, তার প্রত্যেকের জন্য আমরা উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করেছি...” (সূরা নিসা: ৩৩)
হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন:
«أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا، فَمَا بَقِيَ فَهُوَ لِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ» “ফারায়েজ (নির্ধারিত অংশ) তার হকদারকে দিয়ে দাও; এরপর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের জন্য।” (সহীহ বুখারী: ৬৭৩২; সহীহ মুসলিম: ১৬১৫)
সুতরাং প্রথম কাজ হলো সমগ্র সম্পদের হিসাব করে প্রত্যেকের শেয়ার নির্ধারণ করা—এটি ফরজ পর্যায়ের দায়িত্ব। এরপর বাস্তব ভাগ-বণ্টন হবে।
২. দাগে দাগে অংশ বের করা কি জরুরি?
শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরি নয়। ফিকহের মূলনীতি হলো—ওয়ারিসরা মৃতের সম্পদে শেয়ার অনুপাতে শিরকত (অংশীদারিত্ব) হিসেবে হক রাখে; নির্দিষ্ট দাগ বা প্লটে তাদের হক সীমাবদ্ধ নয়। তাই সামগ্রিক শেয়ার ঠিক থাকলে ভিন্ন দাগে বা একই দাগে ভাগ হলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই, যদি সবাই সম্মত হয় এবং কারো প্রতি জুলুম না হয়।
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ তাকসিম ও ইজারা-সংক্রান্ত আলোচনায় বলেন, অংশীদারদের মাঝে সম্পত্তি ভাগ করা যায়, তবে কোনো অংশীদারের ক্ষতি হলে তা বৈধ নয়; প্রয়োজনে আদালত বা আমিনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে সমতা আনা হবে। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল কিসমাহ)
«ফাতাওয়া আলমগিরি»-তেও অংশীদারি সম্পত্তি ভাগের নীতিমালায় বলা হয়েছে—অংশীদারদের সম্মতিতে বা শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে ভাগ হবে, এবং কারো হক কম দেওয়া যাবে না। (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কিসমাহ)
৩. ইনসাফ (সমতা) রক্ষার উত্তম পদ্ধতি
জমি সবসময় সমমানের হয় না—কোনোটা শহরে, কোনোটা গ্রামে; কোনোটা রাস্তার পাশে, কোনোটা ভেতরে; কোনোটা খাল/ডাঙ্গা, কোনোটা কৃষিযোগ্য। এ ক্ষেত্রে ইনসাফের উত্তম পদ্ধতি নিম্নরূপ:
(ক) প্রথমে সব সম্পদের তালিকা ও মূল্যায়ন: সব জমি, দাগ, প্লট, ঘর, আসবাব, নগদ—সবকিছুর বাজারমূল্য বা উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করুন (নিরপেক্ষ ব্যক্তি/আমিনের মাধ্যমে)। এতে মোট সম্পদের মূল্য জানা যাবে এবং প্রত্যেকের শেয়ারের আর্থিক মূল্য বের হবে।
(খ) শরীয়ত নির্ধারিত শেয়ার হিসাব: ফারায়েজ অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ (যেমন পুত্রের দ্বিগুণ, কন্যার একগুণ ইত্যাদি) নির্ধারণ করুন।
(গ) সম্মতিতে ভাগ বা সমন্বয়: এরপর ওয়ারিসদের সর্বসম্মতিতে—
- একেকজন একেক প্লট/দাগ নিতে পারে;
- কেউ জমি নিয়ে অন্যদের নগদ সমন্বয় (তাওয়াদু/বদল) করতে পারে;
- কেউ জমি ছেড়ে নগদ মূল্য নিতে পারে;
- প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে পাওনা অনুপাতে টাকা ভাগ করা যায়।
এতে ইনসাফ রক্ষা সহজ হয়, কারণ মূল্যায়নের মাধ্যমে ভালো-মন্দ জমির পার্থক্য সমন্বয় করা যায়।
(ঘ) জবরদস্তি নিষিদ্ধ: কোনো ওয়ারিসকে তার সম্মতি ছাড়া কম মূল্যের বা অনুপযুক্ত জমি চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। রাসূল ﷺ বলেন:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» “ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির শিকারও হওয়া যাবে না।” (সুনানে ইবন মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ)
(ঙ) প্রয়োজনে লটারি/কুরআ: সবাই সম্মত হলে সমমানের ভাগগুলোতে লটারি (কুরআ) করা জায়েজ; এটি বিবাদ এড়ানোর বৈধ উপায়। তবে লটারির আগে অবশ্যই মূল্যায়ন করে ভাগগুলো সমমানের করতে হবে।
(চ) লিখিত দলিল: ভাগ-বণ্টন লিখিতভাবে সম্পন্ন করুন এবং সব ওয়ারিস স্বাক্ষর করুন; ভবিষ্যতে বিবাদ এড়ানো যাবে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী নামজারি/রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা জায়েজ ও বাঞ্ছনীয়, কারণ এটি হক সংরক্ষণের الوسيلة।
৪. ইসলামী ও প্রচলিত আইনের সমন্বয়
ইসলামী আইনে ওয়ারিসদের হক স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়; প্রচলিত আইনে দাগ/খতিয়ান নামজারি ইত্যাদি কেবল প্রমাণ ও সংরক্ষণের ওসিলা মাত্র। তাই—
- শরীয়ত অনুযায়ী শেয়ার নির্ধারণ করুন;
- প্রচলিত আইনের প্রক্রিয়া (নামজারি, রেজিস্ট্রি) অনুসরণ করুন, যাতে হক নষ্ট না হয়;
- তবে প্রচলিত আইন শরীয়তবিরোধী কিছু নির্দেশ করলে (যেমন কোনো ওয়ারিসকে বঞ্চিত করা) তা মানা যাবে না।
৫. সারসংক্ষেপ ও উত্তম পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
- মৃতের সব সম্পদের তালিকা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।
- দাফন-কাফন, ঋণ, ওসিয়ত বাদ দিয়ে নিট তরকা নির্ধারণ।
- ফারায়েজ অনুযায়ী প্রত্যেকের শেয়ার হিসাব।
- ওয়ারিসদের সর্বসম্মতিতে মূল্যায়নভিত্তিক ভাগ (প্লট/দাগ/নগদ সমন্বয়)।
- সম্মতি না হলে আমিন/আদালতের মাধ্যমে মূল্যায়ন ও ভাগ।
- লিখিত দলিল ও প্রচলিত আইনের নামজারি সম্পন্ন করা।
উত্তম পদ্ধতি: সামগ্রিক শেয়ার নির্ধারণ করে মূল্যায়নভিত্তিক সম্মত ভাগ—এটাই ইনসাফ ও বিবাদমুক্ত বণ্টনের সর্বোত্তম উপায়। দাগে দাগে আলাদা হিসাব করা আবশ্যক নয়; বরং সামগ্রিক ইনসাফই মূল লক্ষ্য।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
প্রথমে মৃতের সমগ্র সম্পদ হিসাব করে ফারায়েজ অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিসের শরীয়ত নির্ধারিত শেয়ার বের করা জরুরি। এরপর ওয়ারিসদের সর্বসম্মতিতে ও ইনসাফের ভিত্তিতে ভাগ করা যাবে—একই দাগে বা ভিন্ন দাগে, একেকজন একেক প্লট নিয়ে বা নগদ সমন্বয় করে। প্রত্যেক দাগে দাগে আলাদা অংশ বের করা শরীয়তের আবশ্যকতা নয়। জমির ভালো-মন্দ ও অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে মূল্যায়ন করে সমতা রাখা উত্তম; জবরদস্তি করে কম/খারাপ জমি চাপিয়ে দেওয়া হারাম। সম্মতি না হলে আমিন/আদালতের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে ভাগ করতে হবে। লিখিত দলিল ও প্রচলিত আইনের নামজারি হক সংরক্ষণের বৈধ الوسيلة।
والله أعلم بالصواب
রেফারেন্স (হানাফি কিতাব)
- সূরা নিসা: ১১, ৩৩; সহীহ বুখারী: ৬৭৩২; সহীহ মুসলিম: ১৬১৫; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৩৪১।
- ইমাম ইবন আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল কিসমাহ ও কিতাবুল ফারায়েজ।
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কিসমাহ ও কিতাবুল ফারায়েজ।
- ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.), আল-আসার ও কিতাবুল আসল-এর ফারায়েজ অধ্যায়।
- ইমাম তহাবি, শরহু মা‘আনিল আসার (ফারায়েজ ও কিসমাহ অধ্যায়)।
- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), বেহেশতী জেওর (উত্তরাধিকার ও সম্পদ বণ্টন অধ্যায়)।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.), মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা নিসার তাফসীর)।
- মুফতি তাকি উসমানি, ফাতাওয়া উসমানি (উত্তরাধিকার ও সম্পদ বণ্টন অধ্যায়)।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.), ইমদাদুল ফাতাওয়া (ফারায়েজ ও কিসমাহ অধ্যায়)।
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।