দাঁতে ব্যথা থাকলে নামাজে ঠোঁট না নাড়িয়ে শুধু জিহবা নাড়িয়ে মনে মনে তেলাওয়াত করা যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
দুপুর থেকে আমার দাঁতে ব্যাথা। এর মধ্যে মুখ নাড়িয়ে লাগাতার জিকির করার কারনে ব্যাথার তীব্রতা এত বেড়ে গিয়েছে যে এখন সহনীয় মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় কি আমি ঠোঁট না নাড়িয়ে শুধু জিহবা কিছুটা নাড়াচাড়া করে মনে মনে নামাজে তেলাওয়াত করতে পারবো?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, পারবেন। তবে বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন: নামাজে "মনে মনে" তেলাওয়াত মানে নিঃশব্দে মনে পড়া নয়; বরং জিহবার নড়াচড়া সহ নিম্নস্বরে (নিঃশব্দে) উচ্চারণ করা — যা ফিকহের পরিভাষায় "ইখফা" বা নিম্নস্বরে পাঠ। শুধু ঠোঁট না নাড়িয়ে জিহবা নাড়িয়ে উচ্চারণ করলে নামাজ সহিহ হবে, ইনশাআল্লাহ। আর একান্তই মনে মনে (জিহবা না নাড়িয়ে) পড়লে তা নামাজের কিরাআত হিসেবে গণ্য হবে না।
বিস্তারিত দলিল ও আলোচনা
১. নামাজে কিরাআতের সর্বনিম্ন শর্ত
হানাফি মাজহাবে নামাজে কিরাআত সহিহ হওয়ার জন্য অন্তত নিম্নস্বরে হলেও জিহবা দ্বারা উচ্চারণ করা শর্ত। শুধু মনে মনে (قلب میں) পড়া কিরাআত হিসেবে ধর্তব্য নয়।
আল-হিদায়া: "القراءة أدنى ما يتحقق به القرآن" — কিরাআত হলো ন্যূনতম পরিমাণ যা দ্বারা কুরআন পাঠ সাব্যস্ত হয় (অর্থাৎ জিহবা নড়ানো)।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১: "لو قرأ بقلبه ولم يحرك لسانه لم يصح" — যদি কেউ অন্তরে পড়ে এবং জিহবা না নাড়ায়, তবে তা সহিহ হবে না।
ফাতাওয়া আলমগিরি: "القراءة لا بد فيها من تحريك اللسان" — কিরাআতে জিহবা নাড়ানো আবশ্যক।
২. নিম্নস্বরে পাঠের অনুমতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
হাদিস (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি): "لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب" — যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়েনি তার নামাজ নেই।
এবং নিম্নস্বরে কিরাআতের প্রমাণ:
সহিহ বুখারি ও মুসলিম: রাসূল ﷺ জাহরি নামাজে উচ্চস্বরে এবং সিররি নামাজে নিম্নস্বরে কিরাআত করতেন। সাহাবায়ে কেরামও নিম্নস্বরে পড়তেন।
ইমাম তহাবি (রহ.) শরহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেন যে, কিরাআতের সময় জিহবা নাড়ানো জরুরি, যদিও আওয়াজ শ্রবণযোগ্য না হয়।
৩. অসুস্থতা ও কষ্টের ক্ষেত্রে সুবিধা
আপনার দাঁতের ব্যথার কারণে মুখ না নাড়িয়ে জিহবা নাড়িয়ে পড়া জায়েজ। ইসলাম কষ্টের সময় সহজতা দেয়:
কুরআন (সূরা বাকারা: ১৮৫): "يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ" — আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।
হাদিস (সহিহ বুখারি): "إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ" — নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ।
তবে সতর্কতা: জিহবা নাড়ানো ছাড়া একেবারে মনে মনে পড়া যথেষ্ট নয় — এটি নামাজ ভঙ্গের কারণ হবে না, কিন্তু কিরাআতের ফরজ আদায় হবে না; ফলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।
৪. ব্যবহারিক সমাধান
- জিহবা নাড়িয়ে নিম্নস্বরে পড়ুন — ঠোঁট স্থির রাখলেও চলবে, শুধু জিহবা ও মুখের ভেতরের অঙ্গ নড়বে।
- যদি জিহবা নাড়াতেও কষ্ট হয়, তবে ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করে বা চিকিৎসা নিয়ে নামাজ আদায় করুন; প্রয়োজনে বসে বা শুয়ে ইশারায় নামাজের বিধান রয়েছে (মারিজের জন্য)।
- জিকির মুখে না করে অন্তরে বা আঙুলে তাসবিহ গণনা করে করুন, যাতে দাঁতের ব্যথা বাড়ে না।
উপসংহার
- ঠোঁট না নাড়িয়ে, শুধু জিহবা নাড়িয়ে নিম্নস্বরে তেলাওয়াত করা জায়েজ — নামাজ সহিহ হবে।
- একেবারে মনে মনে (জিহবা স্থির রেখে) পড়া নামাজে কিরাআত হিসেবে গণ্য হবে না — এতে নামাজ আদায় হবে না।
- ব্যথার কারণে কষ্ট হলে চিকিৎসা নিন এবং প্রয়োজনে বসে/শুয়ে নামাজের সুবিধা গ্রহণ করুন।
والله أعلم بالصواب