মসজিদের বিদ্যুৎ থেকে ইমামের মোবাইল চার্জ করা ও মসজিদে পড়ে থাকা সন্দেহজনক টাকার শরীয়ত বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২, অনেকদিন ধরে মসজিদে 5 টাকা পড়ে আছে, এটা কেউ মসজিদে দিয়েছে নাকি পড়ে পাওয়া টাকা এখানে রেখে দেওয়া সেটা সন্দেহজনক! এখন এই টাকা মসজিদ ফান্ডে দান করে দিব নাকি কোন দারিদ্র্য কে দান করে দিব?
Answer
মসজিদের বিদ্যুৎ ও সন্দেহজনক টাকা — ফিকহি বিধান
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্ন ১: মসজিদের বিদ্যুৎ থেকে ইমাম সাহেবের মোবাইল চার্জ
মসজিদের বিদ্যুৎ মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি। ওয়াকফের সম্পদ ওয়াকফের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে। মসজিদের বিদ্যুৎ মূলত নামাজ, আলো, ফ্যান, মাইক ইত্যাদি মসজিদের কাজে ব্যবহারের জন্য ওয়াকফ হয়েছে। ব্যক্তিগত মোবাইল চার্জ করা ওয়াকফের উদ্দেশ্যের বাইরে।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: ওয়াকফের সম্পদে ওয়াকিফ (দাতা) কর্তৃক নির্ধারিত খাতে ব্যয় করা আবশ্যক। মসজিদের বিদ্যুৎ মসজিদের খাতে ওয়াকফ, ইমামের ব্যক্তিগত খাতে নয়।
কমিটি অনুমতি দিলে কী হবে?
এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:
১. কমিটির অনুমতি থাকলেও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা: যদি কমিটি অনুমতি দেয় এবং ইমাম সাহেব সেই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল মসজিদ ফান্ডে জমা দেন, তাহলে এটি জায়েয। কারণ তখন মসজিদের ক্ষতি পূরণ হয়ে যায় এবং এটি কার্যত মসজিদ থেকে বিদ্যুৎ কেনা-বেচার মতো হয়ে যায়। তবে উত্তম হলো সরাসরি নিজের বিদ্যুৎ/চার্জার ব্যবহার করা।
২. কমিটির অনুমতি আছে, বিল পরিশোধ করছেন না: এটি জায়েয নয়। কারণ কমিটি ওয়াকফের সম্পত্তি হস্তান্তরের মালিক নয়; তারা কেবল তত্ত্বাবধায়ক। ওয়াকফের শর্তের বাইরে ব্যয় করার অধিকার তাদের নেই। ইমাম সাহেবের জন্য এভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা মসজিদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার শামিল হবে।
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে ওয়াকফের সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের ব্যাপারে কঠোর নিষেধ এসেছে। রাদ্দুল মুহতার-এও ওয়াকফের সম্পদ নির্ধারিত খাতে ব্যয় করার তাগিদ রয়েছে।
সারকথা: কমিটির অনুমতি একা যথেষ্ট নয়; বরং ব্যবহৃত বিদ্যুতের সমপরিমাণ বিল মসজিদ ফান্ডে পরিশোধ করলেই তা জায়েয হবে। অন্যথায় চার্জ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। উত্তম ও নিরাপদ পন্থা হলো মসজিদের বিদ্যুৎ ব্যবহার না করা।
প্রশ্ন ২: মসজিদে পড়ে থাকা ৫ টাকা
প্রথমে বিষয়টি নির্ণয় করা জরুরি
টাকাটি যদি কেউ মসজিদে দান হিসেবে রেখে দিয়ে থাকে, তবে তা মসজিদের সম্পত্তি — মসজিদ ফান্ডেই ব্যয় করা হবে।
আর যদি পড়ে পাওয়া (লুকতা) হয়, তবে তার হুকুম ভিন্ন। পড়ে পাওয়া টাকার মালিককে খুঁজে বের করা আবশ্যক। মালিক না পাওয়া গেলে তা সদকা করে দেওয়া যায়। তবে সদকায়ে নফল হিসেবে দরিদ্রকে দেওয়া যাবে, মসজিদ ফান্ডে দেওয়া যাবে না — কারণ মসজিদ ফান্ডে দেওয়া মানে ওয়াকফ, আর লুকতার মালিক অজানা থাকায় তা ওয়াকফ করা যায় না।
সন্দেহজনক অবস্থায় করণীয়
যেহেতু সন্দেহ রয়েছে — দান না লুকতা — তাই সতর্কতামূলক পন্থা:
১. টাকাটি মসজিদ ফান্ডে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, যতক্ষণ না নিশ্চিত হন যে তা কেউ দান করেছে।
২. মসজিদের মুসল্লিদের কাছে ঘোষণা দিন — কেউ যদি এই টাকা দিয়ে থাকে বা তার হারানো টাকা হয়, তবে প্রমাণসহ নিয়ে যেতে পারে।
৩. নির্দিষ্ট সময় (যেমন কয়েক সপ্তাহ) অপেক্ষার পর কেউ দাবি না করলে, তা সদকা হিসেবে কোনো দরিদ্র, অভাবী বা মিসকিনকে দিয়ে দিন — মসজিদ ফান্ডে নয়।
৪. সদকা করার সময় নিয়ত করবেন যে এটি লুকতার টাকা, এর সওয়াব মালিকের কাছে পৌঁছাবে (যদি মালিক অজানা থাকে)।
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, لُقَطَةُ الْمَسْجِدِ تُعَرَّفُ سَنَةً (মসজিদে পড়ে পাওয়া বস্তু এক বছর ঘোষণা করতে হবে) — তবে এখানে টাকাটি মসজিদে রাখা হয়েছে, মসজিদের ভেতরে হারানো নয়; তাই এটি সাধারণ লুকতার হুকুমে পড়বে। ফাতাওয়া আলমগিরি ও রাদ্দুল মুহতার-এ লুকতার বিধান বিস্তারিত এসেছে: মালিককে খোঁজা, ঘোষণা দেওয়া, তারপর সদকা করা।
সারকথা: সন্দেহজনক অবস্থায় মসজিদ ফান্ডে না দিয়ে, ঘোষণা দেওয়ার পর মালিক না পাওয়া গেলে দরিদ্রকে সদকা করে দেওয়াই শরীয়তসম্মত ও নিরাপদ পন্থা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
| প্রশ্ন | বিধান | |---|---| | মসজিদের বিদ্যুতে মোবাইল চার্জ | কমিটির অনুমতি একা যথেষ্ট নয়; ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল মসজিদ ফান্ডে পরিশোধ করলে জায়েয, অন্যথায় নয়। উত্তম: নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহার। | | পড়ে থাকা ৫ টাকা | সন্দেহজনক হওয়ায় মসজিদ ফান্ডে নয়; ঘোষণা দেওয়ার পর মালিক না পাওয়া গেলে দরিদ্রকে সদকা করা। |
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।