অনিয়মিত পিরিয়ড হলে নামাজ পড়া যাবে কি
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার একটি বিষয়ে জানার ছিল। আমার টিউমার ও হরমোনের সমস্যার কারণে পিরিয়ড অনিয়মিত হয়ে গেছে। এখন ব্যথা হলে রক্ত আসে, অন্যথায় আসে না।
যেমন, ধরুন দুই দিন আগে ব্যথার সঙ্গে রক্ত গেল। এরপর আবার দুই দিন পর কিংবা ১৫ দিনের মধ্যে ব্যথার সঙ্গে রক্ত গেল এবং একটানা ৩–৪ দিন রক্তপাত হলো।
এখন আমার প্রশ্ন হলো, এ অবস্থায় আমি কি রক্তপাত শুরু হওয়ার পর অপেক্ষা করব যে এটি ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) পূর্ণ হয় কি না? নাকি এটিকে ইস্তিহাযা ধরে সালাত আদায় করতে থাকব?
আমার শারীরিক সমস্যার কারণে রক্তপাত অনিয়মিত হচ্ছে। তাই হায়েয ও ইস্তিহাযার বিধান কীভাবে নির্ধারণ করব এবং কখন থেকে সালাত আদায় করতে হবে, বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বললে উপকৃত হতাম, আপু। জাযাকিল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার টিউমার ও হরমোনজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে সৃষ্ট অনিয়মিত রক্তপাত এবং সালাত সংক্রান্ত ফিকহী জিজ্ঞাসার প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট শরঈ সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
১৫ দিন পবিত্র থাকার পর রক্তপাত শুরু হওয়া মাত্রই (যদি তা ৩ দিন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) সেটিকে প্রাথমিক অবস্থায় হায়েজ গণ্য করে সালাত আদায় স্থগিত রাখতে হবে। শুরুতেই ইস্তিহাযা ধরে সালাত আদায় করা যাবে না এবং রক্ত আসার সাথে সাথে ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
২. হায়েজ ও ইস্তিহাযা নির্ধারণ এবং কখন সালাত আদায় করতে হবে (৩টি অবস্থা):
শারীরিক সমস্যার কারণে রক্তপাত যতই অনিয়মিত হোক না কেন, ফিকহে হানাফী অনুযায়ী নিচে বর্ণিত ৩টি অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিধান নির্ধারিত হবে:
অবস্থা ১: রক্ত ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) বা তার বেশি স্থায়ী হলে (সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত)
- শরঈ হুকুম: রক্ত শুরু হওয়ার পর যদি তা অন্তত টানা ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) স্থায়ী হয় (এবং ১০ দিন অতিক্রম না করে), তবে নিশ্চিত হওয়া গেল যে এটি হায়েজ।
- সালাতের নিয়ম: এই দিনগুলোতে স্থগিত রাখা ওয়াক্তগুলোর কোনো ক্বাযা আদায় করতে হবে না। রক্ত বন্ধ হওয়ার পর ফরয গোসল করে স্বাভাবিকভাবে সালাত পড়া শুরু করবেন।
অবস্থা ২: রক্ত ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) পূর্ণ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে গেলে (যেমন: ১ বা ২ দিন পর বন্ধ হওয়া)
- শরঈ হুকুম: রক্ত শুরু হওয়ার পর যদি ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) পূর্ণ হওয়ার আগেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় (যেমন: আপনার ক্ষেত্রে ২ দিন ব্যথার সাথে আসার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া), তবে পেছনের হিসাব অনুযায়ী প্রমাণিত হবে যে উক্ত রক্ত হায়েজ ছিল না; বরং তা ছিল ইস্তিহাযা (অসুস্থতাজনিত রক্ত)।
- সালাতের নিয়ম: রক্ত বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে অযু বা গোসল করে পবিত্র হয়ে যাবেন এবং হায়েজ মনে করে যে ২ দিন সালাত স্থগিত রেখেছিলেন, উক্ত ওয়াক্তগুলোর ফরয সালাতের ক্বাযা আদায় করে নিতে হবে।
অবস্থা ৩: দুই পিরিয়ডের মধ্যবর্তী পবিত্রতার বিরতি ১৫ দিনের কম হলে
- শরঈ হুকুম: একটি হায়েজ শেষ হওয়ার পর পুনরায় নতুন হায়েজ শুরু হতে হলে মধ্যবর্তী সময়ে কমপক্ষে ১৫ দিন সম্পূর্ণ পবিত্র (তুহুর) থাকা শরীয়তের আবশ্যিক শর্ত। যদি ১৫ দিন পূর্ণ না হতেই আবার রক্ত দেখা দেয় (যেমন: ২ দিন পর আবার এলো), তবে পরবর্তী এই রক্ত সরাসরি ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে।
- সালাতের নিয়ম: এই রক্ত আসার কারণে সালাত বন্ধ রাখা যাবে না। শরীর পরিষ্কার ও পবিত্রতা অর্জন করে (প্রয়োজনে প্রতি ওয়াক্তের জন্য নতুন অযু করে) নিয়মিত সালাত আদায় করে যেতে হবে।
৩. টিউমার ও হরমোনের ব্যথার সাথে রক্তপাতের ফিকহী বিচার:
টিউমার বা হরমোনের সমস্যার কারণে ব্যথার সাথে রক্ত আসলেও ফিকহী মূলনীতি পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ ব্যথার সাথে আসুক বা ব্যথা ছাড়া আসুক—যদি পূর্ববর্তী হায়েজের পর অন্তত ১৫ দিন তুহুর (পবিত্রতা) বজায় থাকে এবং রক্ত আসার পর তা ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) বা তার বেশি স্থায়ী হয়, তবে তা হায়েজ। আর ৩ দিনের কম স্থায়ী হলে বা ১৫ দিন তুহুর পূর্ণ হওয়ার আগেই এলে তা ইস্তিহাযা।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১১৩–১১৫ (অধ্যায়: তাহারাত, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: 'মহিলাদের খাস রক্তসমূহের বিবরণ' — ১ম অনুচ্ছেদ: হায়েজের মেয়াদী শর্তাবলী ও সালাত স্থগিতের নিয়ম; ৩য় অনুচ্ছেদ: ইস্তিহাজার আহকাম ও ক্বাযা সালাতের ফতোয়া)।
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৪৬–৪৭ (পরিচ্ছেদ: 'হায়েজ, নেফাস ও ইস্তিহাজা' — সর্বনিম্ন ৩ দিন ৩ রাত ও সর্বোচ্চ ১০ দিনের মেয়াদ এবং দুই হায়েজের মাঝে ১৫ দিন তুহুর থাকার শর্ত)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৮–১৯৯ (অধ্যায়: 'বাবুল হায়েজ ওয়াল নিফাস ওয়াল ইস্তিহাজা' — রক্ত আসার পর সালাত বন্ধ রাখা ও কম হলে কাজা করার বিবরণ)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭৬–১৭৭ (অধ্যায়: কিতাবুস সালাত — ইস্তিহাযার দরুন সালাতের ক্বাযা সংক্রান্ত মাসআলা)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭৭–২৭৮ (অনুচ্ছেদ: 'হায়েজ ও ইস্তিহাজার সাধারণ ফিকহী মূলনীতি')।
আল্লাহ তাআলা আপনার অসুস্থতা দূর করে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা ও ইবাদত সহজ করে দিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।