কাজা নামাজ কখন আদায় করা যাবে, ঋণ থাকা অবস্থায় দান-সদকা করা যাবে কি না, এবং মোবাইলে কোরআন খতম ও বাথরুমে মোবাইল নিয়ে যাওয়ার হুকুম কি? বিস্তারিত জানতে চাই?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7503
Questioner: Asad sarker
Question Asked: 28 Oct 2026, 08:12 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 09:05 PM
Views: 71
Tokens: 4,120
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আমি নামাজ শুরু করেছি, আমি সকালে উঠতে পারি না এজন্য কি ফজরের একটা জোহরের সময় বা অন্য সময় কাজা নামাজ আদায় করা যাবে?
২.আমার অনেক টাকা ঋণ আছে যেগুলো আমি আস্তে আস্তে পূরণ করব এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই ঋণগুলো থাকার পাশাপাশি আমি যে ছোটখাটো দান করতে পারবো? নাকি আমার উচিত আগে সেইগুলো পরিশোধ করা?
৩.মোবাইলে কোরআন শরীফ নামিয়ে সেই কোরআন খতম করলে কি সব পাওয়া যাবে কোরআন খতমের মোবাইল নিয়ে কি বাথরুমে যাওয়া যাবে কি?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর হানাফি ফিকহের আলোকে প্রদান করা হলো:


১. ফজরের কাজা নামাজ জোহর বা অন্য সময়ে আদায় করা যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, ফজরের কাজা নামাজ জোহর বা অন্য যেকোনো সময়ে আদায় করা যাবে। তবে কিছু নিয়ম মনে রাখতে হবে:

  • মাকরুহ সময় ছাড়া: সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং ঠিক দুপুরে (ইস্তিওয়া) — এই তিন সময়ে কোনো নামাজ (ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল, কাজা) আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি। এছাড়া অন্য সময়ে কাজা নামাজ আদায় করা জায়েজ।
  • কাজা নামাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই: ফজরের কাজা ফজরের ওয়াক্তে বা জোহরের ওয়াক্তে — যেকোনো সময় আদায় করা যায়। তবে উত্তম হলো যত দ্রুত সম্ভব আদায় করা।
  • ফজরের সুন্নতের কাজা: ফজরের দুই রাকাত সুন্নতও কাজা করা সুন্নত (তবে ফরজের পর নয়, বরং ফরজের আগে বা পরে আলাদাভাবে)। ফজরের ফরজ কাজা হলে সাথে সুন্নতও কাজা করা উত্তম।

দলিল:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا» — "যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে যায় বা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাফফারা হলো স্মরণ হওয়ামাত্র তা আদায় করা।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৮৪; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৭৭)
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কাজা নামাজ যেকোনো ওয়াক্তে আদায় করা যায়, শুধু মাকরুহ সময় ব্যতীত। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৪; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১২১)

পরামর্শ: সকালে ঘুম থেকে উঠতে না পারার সমস্যা সমাধানে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো, অ্যালার্ম ব্যবহার করা এবং নিয়ত দৃঢ় করা উচিত। তবে কাজা আদায় করা থেকে বিরত থাকা যাবে না।


২. ঋণ থাকা অবস্থায় ছোটখাটো দান করা যাবে কি?

উত্তর: এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

ক) ঋণ পরিশোধ করা প্রথম অগ্রাধিকার: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রথম কর্তব্য হলো ঋণ পরিশোধে সচেষ্ট হওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ» — "সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৪০০)

খ) নফল দান-সদকা: যদি আপনার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকে (অর্থাৎ আস্তে আস্তে হলেও পরিশোধ করতে পারবেন) এবং ঋণদাতা তাগাদা না দেয়, তাহলে ছোটখাটো নফল দান করা জায়েজ। তবে ঋণ পরিশোধের আগে নফল দান-সদকায় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়, কারণ ঋণ হলো আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ের সমন্বয়, যা আগে আদায় করা জরুরি।

গ) ওয়াজিব সদকা (যাকাত, ফিতরা): ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন, তাহলে তার উপর যাকাত ফরজ নয়। তবে ফিতরা ওয়াজিব হতে পারে।

সারসংক্ষেপ:

  • ঋণ পরিশোধ করা অগ্রাধিকার।
  • ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকলে এবং ঋণদাতার ক্ষতি না হলে ছোটখাটো নফল দান করা যাবে।
  • তবে ঋণ পরিশোধের আগে বেশি দান-সদকায় লিপ্ত হওয়া উচিত নয়, বিশেষত যদি ঋণদাতা তাগাদা দেয় বা আপনার আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়।

দলিল:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ قَضَاءً» — "তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি যে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৩৯৩)
  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য নফল দানের চেয়ে ঋণ পরিশোধে মনোযোগ দেওয়া উত্তম। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩০)

৩. মোবাইলে কোরআন শরিফ ডাউনলোড করে খতম করলে কি পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে? মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া যাবে কি?

উত্তর:

ক) মোবাইলে কোরআন খতমের সওয়াব: মোবাইলে কোরআন শরিফ ডাউনলোড করে পড়লে বা খতম করলে ইনশাআল্লাহ পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে। কারণ কোরআন পড়ার সওয়াব হলো তিলাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত, মাধ্যম যাই হোক না কেন। তবে মুসল্লায় বসে কাগজের মুসহাফ পড়ার মতো পূর্ণ ফজিলত ও আদব রক্ষা করা কঠিন, তাই কাগজের মুসহাফ পড়া উত্তম।

খ) মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া:

  • কোরআন অ্যাপ খোলা থাকা অবস্থায়: মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া মাকরুহ। কারণ কোরআনের আয়াত পর্দায় দৃশ্যমান থাকে।
  • অ্যাপ বন্ধ থাকলে বা স্ক্রিন লক থাকলে: মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া জায়েজ। কারণ তখন মোবাইল সাধারণ যন্ত্র হিসেবে গণ্য।
  • তবে সতর্কতা: বাথরুমে কোরআন তিলাওয়াত করা বা কোরআনের আয়াত দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

দলিল:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, কোরআনের আয়াত লেখা কাগজ বা বস্তু নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করা মাকরুহ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৬)
  • ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২৭)-তে উল্লেখ আছে, মোবাইলে কোরআন অ্যাপ চালু থাকা অবস্থায় বাথরুমে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

সারসংক্ষেপ:

  • মোবাইলে কোরআন খতম করলে সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
  • কোরআন অ্যাপ চালু থাকলে বাথরুমে নেওয়া মাকরুহ; বন্ধ থাকলে জায়েজ।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.