হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নারীদের সালাত ও সিজদা।
Salah-Prayer · Hanafi
Question
এখন আমার একটু ওয়াসওয়াসা আসছে যে রাসূল সাঃ একটা শুদ্ধ হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু আমি সেটা পালন করছিলাম আমি এতে গুনাহগার নয় তো?? আমার তো ইলম এর বুঝ নাই। তাই হানাফী মাযহাব অনুযায়ী যদি সালাত পড়ি সালাত শুদ্ধ হবে তো??
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের দলিলসহ বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, আপনি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সালাত পড়লে আপনার সালাত সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও সহীহ হবে। আপনি কোনো গুনাহগার নন। মায়ের কথা শুনে বা ওয়াসওয়াসায় পড়ে মাযহাব পরিবর্তন করা আপনার জন্য জরুরি নয়; বরং নিজের মাযহাব (হানাফী) অনুযায়ী আমল চালিয়ে যাওয়াই আপনার জন্য কর্তব্য। তবে মায়ের সাথে সদাচরণ ও ধৈর্য ধারণ করা আবশ্যক।
১. মাযহাব অনুসরণ করা কি জরুরি? — শরীয়তের মূলনীতি
কুরআন-সুন্নাহর আহকাম বোঝার ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইমামগণের (আবু হানীফা, শাফেঈ, মালিক, আহমাদ রহ.) ইজতিহাদী পদ্ধতি ভিন্ন। একজন সাধারণ মুসলিম (মুকাল্লিদ) যার নিজে ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই, তার জন্য নির্দিষ্ট একটি মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব। এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত নীতি।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ উল্লেখ আছে: "আওয়াম্মের (সাধারণ মানুষের) জন্য মাযহাব অনুসরণ করা আবশ্যক, কারণ কুরআন-হাদীসের যাহিরী অর্থ থেকে স্বাধীনভাবে মাসআলা বের করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।"
উসূলুশ শাশী-তে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উসূল অনুযায়ী, কুরআন-সুন্নাহর দলিলের মধ্যে পরস্পর বিরোধ দেখা দিলে হানাফী উসূল অনুযায়ী সমন্বয় (জম) করা হয়, অথবা নাসিখ-মানসুখ, তারজীহ ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা হয়। তাই কোনো একটি হাদীস দেখে সরাসরি আমল করা এবং অন্য মাযহাবের আমলকে "ভুল" বলা ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
২. নারীদের সালাতে "জড়ো হয়ে" (সংকুচিত হয়ে) পড়ার দলিল
হানাফী মাযহাব মতে নারীদের সালাতে পুরুষদের তুলনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে — এটি কোনো মনগড়া নয়; বরং হাদীসের সরাসরি নির্দেশনার ভিত্তিতে।
(ক) সিজদায় নারীদের সংকুচিত হওয়ার হাদীস
ইমাম আবু দাউদ (রহ.) তাঁর সুনানে আবু দাউদ-এ এবং ইমাম বায়হাকী সুনানে কুবরা-তে বর্ণনা করেছেন:
عن يزيد بن أبي حبيب أن رسول الله ﷺ مرّ على امرأتين تصليان فقال: «إذا سجدتما فضمّا بعض اللحم إلى الأرض، فإن المرأة ليست في ذلك كالرجل» অর্থ: ইয়াযীদ ইবনে আবী হাবীব (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ দু'জন নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যারা সালাত আদায় করছিল। তিনি বললেন: "যখন তোমরা সিজদা করবে, তখন শরীরের কিছু অংশ জমিনের সাথে মিলিয়ে (সংকুচিত হয়ে) সিজদা করো; কারণ এ বিষয়ে নারী পুরুষের সমান নয়।" — সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুস সালাত; সুনানে বায়হাকী, কিতাবুস সালাত (মুরসাল সনদ, তবে হানাফী ফিকহে এটি গ্রহণযোগ্য)
মারফূ' হিসেবে ইমাম বায়হাকী ও তাবরানী বর্ণনা করেছেন:
«يا عليّ، لا تُبرز عضديك، ولا تُلصق ذراعيك بالأرض، ولا تضطجع، ولا تفتل قدميك...» — তবে নারীদের সম্পর্কে আলাদা নির্দেশনা এসেছে।
(খ) হানাফী ফিকহের মূল কিতাবসমূহের বক্তব্য
আল-হিদায়া (মারগীনানী) — কিতাবুস সালাত, সিজদার বিবরণে:
"وَالْمَرْأَةُ تَنْخَفِضُ فِي السُّجُودِ وَلَا تُجَافِي، لِأَنَّهَا عَوْرَةٌ" অর্থ: "নারী সিজদায় নিচু হয়ে (সংকুচিত হয়ে) যাবে, বাহু ফাঁক করবে না; কারণ সে (সতরের দিক থেকে) আওরাহ।"
ফাতাওয়া আলমগীরী (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) — কিতাবুস সালাত:
"المرأة إذا سجدت تضمّ بعضها إلى بعض، ولا تجافي عضديها عن جنبيها، وتلصق بطنها بفخذيها" অর্থ: "নারী যখন সিজদা করে, তখন এক অঙ্গ অন্য অঙ্গের সাথে মিলিয়ে রাখবে, বাহু দু'পাশ থেকে ফাঁক করবে না, পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে।"
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — খণ্ড ১, সিজদার বিবরণ:
"المرأة تنخفض ولا تجافي، وتضم بعض أعضائها إلى بعض" — এবং ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, এটি ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত।
বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.) — সালাত অধ্যায়: নারীদের সিজদায় হাত পাঁজরের সাথে মিলিয়ে রাখা, পেট রানের সাথে মিলিয়ে রাখা, এবং সংকুচিত হয়ে সিজদা করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
(গ) হাত বিছানো নিষেধের হাদীস — নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
আপনার মা যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন — "কুকুরের মতো হাত বিছাবে না" — সেটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত:
عن أنس بن مالك رضي الله عنه عن النبي ﷺ قال: «اعتدلوا في السجود، ولا يبسط أحدكم ذراعيه انبساط الكلب» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৮২২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯৩
কিন্তু এই হাদীসটি পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য। হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো: পুরুষের জন্য নির্দেশিত হাদীস নারীর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়, যদি না নারীদের জন্য আলাদা নির্দেশনা না থাকে। যেহেতু নারীদের সিজদায় সংকুচিত হওয়ার আলাদা হাদীস ও ফিকহী নির্দেশনা রয়েছে, তাই নারীরা এই হাদীসের আওতাভুক্ত নন।
ইমাম তহাবী (রহ.) তাঁর শরহু মা'আনিল আছার-এ এবং ইমাম আবু জাফর তহাবী নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্য নিয়ে আলাদা অধ্যায় রচনা করেছেন এবং নারীদের সংকুচিত সিজদার দলিল পেশ করেছেন।
৩. "হাদীস মানলে গুনাহ হবে কি?" — এই ওয়াসওয়াসার সমাধান
না, আপনি গুনাহগার নন। কারণ:
-
আপনি হাদীস অস্বীকার করছেন না — বরং হাদীসটি পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য বলে হানাফী ফিকহের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমল করছেন। এটি হাদীসের প্রতি ঈমান রাখারই অন্তর্ভুক্ত।
-
আপনি ইজতিহাদী মাসআলায় মুকাল্লিদ — আপনার দায়িত্ব হলো যোগ্য মুজতাহিদ ইমামের বোঝা অনুযায়ী আমল করা। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এই হাদীসটি জানতেন এবং নারীদের জন্য আলাদা হুকুম দিয়েছেন — এটাই তাঁর ইজতিহাদ।
-
রাসূল ﷺ নিজেই নারী-পুরুষের সালাতে পার্থক্য করেছেন — উপরে উল্লিখিত হাদীসে তিনি স্পষ্ট বলেছেন: "নারীর বিষয়টি পুরুষের মতো নয়।" তাই পুরুষদের হাদীস নারীদের উপর প্রয়োগ করা রাসূল ﷺ-এর নির্দেশনার বিপরীত।
-
ওয়াসওয়াসা শয়তানের প্ররোচনা — ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেছেন, "الوسوسة من الشيطان، ولا يلتفت إليها" — ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে, তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না।
৪. মায়ের সাথে আচরণের নীতি
আপনার মা হানাফী মাযহাবের মাসআলা বোঝেন না — এটি তাঁর অজ্ঞতা, অপরাধ নয়। ইসলামে মায়ের সাথে সদাচরণ ফরজ:
কুরআন: «وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا» — "পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
হাদীস: «رَغِمَ أَنْفُهُ» — "সে ব্যর্থ হোক, যে তার পিতামাতার বৃদ্ধ বয়সে তাদের সেবা করল না।" (সহীহ মুসলিম)
করণীয়:
- মাকে ধৈর্য ও নরম ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করুন, বিতর্ক নয়।
- সম্ভব হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির সাথে কথা বলিয়ে দিন।
- নিজের সালাত হানাফী মাযহাব অনুযায়ীই চালিয়ে যান — এতে কোনো গুনাহ নেই।
- মায়ের সামনে সালাত পড়ার সময় বিতর্ক এড়িয়ে চলুন; প্রয়োজনে আলাদা জায়গায় পড়ুন।
- মায়ের জন্য দুআ করুন, তিনি যেন সঠিক বুঝ পান।
আল্লাহ তাআলা আপনার ইলম ও আমলে বারাকাহ দান করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।