কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত কী? ২ ভরি ৪ আনা সোনা থাকলে কুরবানি ওয়াজিব হবে কি না?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
আমি একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার মাসিক বেতন প্রায় ২১,০০০ টাকা। প্রতি মাসে সংসারের খরচসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে আমার সম্পূর্ণ বেতন খরচ হয়ে যায়। বর্তমানে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত কোনো টাকা জমা নেই এবং কোনো সঞ্চয় বা বিনিয়োগও নেই।
আমার সম্পদের বিবরণ নিম্নরূপ:
১। সোনা: আমার কাছে মোট ২ ভরি ৪ আনা সোনা রয়েছে।
১ ভরি ৩ আনা সোনা আমি নিজের টাকায় কিনেছি।
১ ভরি ১ আনা সোনা আমার বাবা কিছুদিন আগে আমাকে কিনে দিয়েছেন। তিনি সোনাটি ফেরত নেবেন না। এটি আমার নিজের সম্পদ হিসেবেই গণ্য হবে।
২। রুপা: আমার কোনো রুপা নেই।
৩। নগদ টাকা ও সঞ্চয়: বর্তমানে আমার কোনো অতিরিক্ত নগদ টাকা, ব্যাংক সঞ্চয় বা অন্য কোনো বিনিয়োগ নেই।
আমার জানার বিষয়:
আমার জন্য কোরবানির বিধান কি হবে ?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার বর্ণিত বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী (যদি কুরবানীর দিনগুলোতে আপনার কাছে কোনো রূপা, উদ্বৃত্ত নগদ টাকা বা নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সম্পদ না থাকে), আপনার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।
ফিকহে হানাফীর আলোকেও কিতাবের প্রামাণ্য হাওয়ালা (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) বিষয়টির বিস্তারিত শরঈ ব্যাখ্যা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
ফিকহী বিশ্লেষণ ও নিসাব নির্ধারণের দুটি অবস্থা:
১. প্রথম অবস্থা (শুধুমাত্র সোনা থাকা):
ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মালিকানায় যদি কেবল সোনা থাকে এবং তার সাথে রূপা, নগদ টাকা বা নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সম্পদ (ব্যবসার পণ্য বা প্রয়োজনাতিরিক্ত আসবাবপত্র/জমি) বিন্দুমাত্র না থাকে, তবে তার কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার নিসাব হলো সাড়ে ৭ ভরি (৭.৫ তোলা) সোনা।
- আপনার কাছে মোট ২ ভরি ৪ আনা সোনা রয়েছে (যা সাড়ে ৭ ভরির কম)।
- যেহেতু আপনার কোনো রূপা নেই এবং ২১,০০০ টাকা বেতনের পুরোটাই সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে ব্যয় হয়ে যায় (কোনো জমা বা উদ্বৃত্ত টাকা থাকে না), তাই কেবল সোনার নিসাবের দিক থেকে আপনার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয় না।
২. দ্বিতীয় অবস্থা (সোনার সাথে সামান্য নগদ টাকা বা অতিরিক্ত সম্পদ থাকা):
যদি কুরবানীর দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ) আপনার কাছে সংসারের স্বাভাবিক নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর সামান্য পরিমাণও নগদ উদ্বৃত্ত টাকা থাকে (অথবা রূপা/প্রয়োজনাতিরিক্ত কোনো বস্তুর মালিকানা থাকে), তবে ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী উক্ত টাকা সোনার সাথে যুক্ত হবে।
- সোনা ও নগদ টাকা একত্রে যুক্ত হলে তখন আর সোনার নিসাব (সাড়ে ৭ ভরি) ধরা হয় না; বরং সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) তোলা রূপার বাজার মূল্য অনুযায়ী নিসাব হিসাব করা হয়।
- বর্তমানে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার বাজার মূল্যের চেয়ে আপনার ২ ভরি ৪ আনা সোনার মূল্য অনেক বেশি। তাই কুরবানীর দিনগুলোতে যদি সংসারের খরচের পর সামান্য উদ্বৃত্ত টাকাও আপনার হাতে জমা থাকে, তবে রূপার নিসাব পূর্ণ হওয়ার কারণে আপনার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।
উপসংহার ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
- কুরবানী ওয়াজিব না হওয়া: কুরবানীর দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ) যদি আপনার কাছে কোনো অতিরিক্ত জমা টাকা বা প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ না থাকে এবং পুরো বেতনই সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ে শেষ হয়ে যায়, তবে আপনার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।
- কুরবানী ওয়াজিব হওয়া: আর যদি ওই দিনগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদে সামান্য নগদ টাকাও আপনার কাছে উদ্বৃত্ত থাকে, তবে সোনা ও টাকার সংমিশ্রণে রূপার নিসাব পূর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে আপনার ওপর কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব হবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৫৬–১৫৮ এবং ১৬৪–১৬৫ (অধ্যায়: যাকাত, ফিত্রা ও কুরবানীর নেসাব — 'কুরবানীর নেসাবের পরিচয়, শর্তাবলী ও সোনা-নগদের সংমিশ্রণ')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৮–১৭৯ (কিতাবুয যাকাত — সোনা ও নগদের সংমিশ্রণের বিধান); এবং ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৯২–২৯৩ (কিতাবুল ওযহিয়্যাহ, ১ম পরিচ্ছেদ: 'কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলী ও নিসাব')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৬, ১২৭ ও ১২৮ (অধ্যায়: কিতাবুল ওযহিয়্যাহ — 'কুরবানীর নিসাব ও কার ওপর কুরবানী ওয়াজিব')।
والله أعلم بالصواب