রোযা অবস্থায় দাঁতে খাবার বা মিসওয়াকের আঁশ আটকে থাকার সন্দেহ হলে রোযা ভঙ্গ হয় কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এখন বুঝতেছি না সাহরীর কোন খাবার কি দাতে আটকে ছিল কি না, নাকি ফজরের পর মিসওয়াকের কোন আশ দাতে আটকেছিল। আবার একদিন খেয়াল করেছিলাম দাতের মাড়ি কেমন যেন অল্প অংশ দাতের গোড়ার সাথে লাগানো ছিল না, তখন ও মনে হচ্ছিল দাতের গোড়ায় কিছু আটকে আছে। এখন কি দাতের মাড়ির কারণে দাতের ভিতরে কিছু আটকানো অনুভব হচ্ছিল কি না বুঝতেছি না।
রোযা কি সঠিক হবে কি না?
Answer
রোযা সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী রোযা অবস্থায় ফজরের পর কিছু নামাজ আদায় করেছেন এবং ওযু-মিসওয়াক করেছেন। নামাজের সময় মনে হয়েছে দাঁতের ফাঁকে কিছু আটকে আছে; কিন্তু নামাজের পর দাঁত চেক করেননি। পরে অফিসে এসে আয়না ও নখ দিয়ে চেক করে কিছু দেখতে পাননি। তবে তিনি নিশ্চিত নন যে সাহরীর খাবার বা মিসওয়াকের আঁশ দাঁতে আটকে ছিল কি না, বা তা গিলেছেন কি না। তিনি জানতে চান—এ অবস্থায় তাঁর রোযা সঠিক হবে কি না।
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. মূলনীতি: সন্দেহের কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না
ইসলামের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো—"আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযুলু বিদ-দ্বাক" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না)। অর্থাৎ, রোযা যে শুরু হয়েছে—এটি নিশ্চিত; আর তা ভেঙেছে কি না—এটি সন্দেহ। সুতরাং সন্দেহের ভিত্তিতে রোযাকে ভঙ্গ বলে গণ্য করা যাবে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوْا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ "আর তোমরা তা খেয়ো না, যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি।" (সূরা আনআম: ১২১)
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى... "যখন তোমাদের কেউ নামাজে সন্দেহে পড়ে এবং কত রাকআত পড়েছে তা জানে না..." (সহীহ বুখারী: ৪০১, সহীহ মুসলিম: ৫৭২)
এই হাদীসের মূলনীতি হলো—সন্দেহের ক্ষেত্রে নিশ্চিত বিষয়ের উপর ভিত্তি করা। রোযার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
২. দাঁতে আটকে থাকা খাবার গিলে ফেলার বিধান
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়া অনুযায়ী:
- যদি দাঁতে আটকে থাকা খাবার এত ছোট হয় যে তা চিবানো বা গিলে ফেলার অনুভূতি হয় না (যেমন তিল পরিমাণ বা তার কম), তবে তা গিলে ফেললেও রোযা ভঙ্গ হবে না।
- আর যদি তা ছোলা পরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তবে রোযা ভঙ্গ হবে।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:
ولو أكل ما بين أسنانه مما هو دون الحمصة لا يفطر، وإن كان فوق الحمصة يفطر "যদি দাঁতের ফাঁকে ছোলার কম পরিমাণ খাবার খায়, রোযা ভঙ্গ হবে না; আর যদি ছোলা পরিমাণ বা বেশি হয়, তবে ভঙ্গ হবে।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/৩৯৬)
ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তেও অনুরূপ বর্ণিত আছে:
ما بقي بين الأسنان من الطعام إذا كان قليلا لا يفطر "দাঁতের মাঝে অবশিষ্ট খাবার যদি অল্প হয়, রোযা ভঙ্গ হবে না।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/২০৪)
৩. মিসওয়াকের আঁশ বা তন্তুর বিধান
মিসওয়াকের আঁশ বা তন্তু যদি দাঁতে আটকে থাকে এবং তা অতি ক্ষুদ্র হয় (যা সাধারণত গিলে ফেলার অনুভূতি হয় না), তবে তা গিলে ফেললেও রোযা ভঙ্গ হবে না। কেননা এটি খাদ্য নয় এবং সাধারণত এত ক্ষুদ্র যে তা পেটে পৌঁছালেও খাদ্য হিসেবে গণ্য হয় না।
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ উল্লেখ করেন যে, দাঁতে আটকে থাকা অতি ক্ষুদ্র বস্তু যা চিবানো বা গিলে ফেলার স্বাদ অনুভূত হয় না, তা রোযা ভঙ্গের কারণ নয়।
৪. আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির মূল্যায়ন
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- আপনি নিশ্চিত নন যে দাঁতে কিছু আটকে ছিল কি না।
- আপনি নিশ্চিত নন যে তা গিলেছেন কি না।
- আয়না ও নখ দিয়ে চেক করে কিছু পাননি—অর্থাৎ দৃশ্যত কিছু ছিল না বা অতি ক্ষুদ্র ছিল।
- দাঁতের মাড়ির অবস্থাও একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আপনার মনে হয়েছে।
এই অবস্থায় ফিকহি সিদ্ধান্ত হলো:
সন্দেহের ভিত্তিতে রোযাকে ভঙ্গ বলা যাবে না। আপনার রোযা সঠিক হয়েছে।
কারণ:
- রোযা শুরু হয়েছে—এটি নিশ্চিত।
- রোযা ভঙ্গ হয়েছে—এটি সন্দেহ।
- নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না।
- উপরন্তু, যদি কিছু আটকে থেকেও থাকে, তা অতি ক্ষুদ্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি (কারণ আপনি আয়না ও নখ দিয়ে কিছু দেখেননি), যা গিলে ফেললেও রোযা ভঙ্গ করে না।
ফতোয়া
আপনার রোযা সঠিক হয়েছে এবং তা পূর্ণ হয়েছে। সন্দেহের কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না। ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্দেহ হলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোযাকে ভঙ্গ বলে গণ্য করবেন না। তবে সতর্কতা হিসেবে নামাজের পর দাঁত চেক করে নেওয়া ভালো।
করণীয়
- আপনার রোযা পূর্ণ হয়েছে—কাযা বা কাফফারা কিছুই লাগবে না।
- ভবিষ্যতে সাহরীর পর ও ফজরের পর দাঁত ভালোভাবে মিসওয়াক ও কুলি করে পরিষ্কার করে নিন।
- নামাজের সময় দাঁতে কিছু আটকে থাকার সন্দেহ হলে নামাজ শেষে একবার চেক করে নিন।
- সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রোযা ভেঙে ফেলবেন না—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে।
তথ্যসূত্র
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ২/৩৯৬
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/২০৪
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী): সূরা বাকারা ১৮৭-এর তাফসীর
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী): ২/১৩০
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকী উসমানি): ১/৪৫০
- সহীহ বুখারী: ৪০১
- সহীহ মুসলিম: ৫৭২
আল্লাহ ভালো জানেন।