মোহরানার বিনিময়ে জমি কেনা কি বৈধ? স্ত্রী ও স্বামীর উপর হজ ফরজ হওয়ার শর্ত কী? প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার যাকাতের বিধান কী?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
ঐ মহিলার স্বামীর কাছে জমানো টাকা আছে ৯লাখ, প্রভিডেন্ট ফান্ড এ জমা আছে ৪লাখ। এখন তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড এর টাকা ঋন হিসেবে উঠিয়ে নিয়েছেন যেটা প্রতি মাসে উনার বেতন থেকে কেটে নিবে। মোট ১৩লাখ টাকা থেকে মোহরানা বাবদ ৭.৫ লাখ ও স্ত্রীর জমানো ৩লাখ দিয়ে তিনি স্ত্রীকে জমি কিনে দিতে চান, এবং বাকি ৫.৫ লাখ দিয়ে নিজের জন্য জমি রাখতে চান। (উল্লেখ্য, স্ত্রীর মোহরানার টাকা স্ত্রীকে সরাসরি না দিয়ে জমি কিনে আদায় করতে চান।)
প্রশ্ন ১- এক্ষেত্রে ২ জনের উপর হজ্জের বিধান কি?
এবং
প্রশ্ন ২- স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ড এর ৪ লাখের উপর যাকাতের বিধান কি?
উল্লেখ্য যে স্বামী ও স্ত্রী এর বাকি টাকার ও স্বর্নের যাকাত আলহামদুলিল্লাহ প্রতিবছর আদায় করা হয়েছে।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এতে হজ, মোহরানা আদায়ের পদ্ধতি ও যাকাত—তিনটি বিষয় জড়িত। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে ধারাবাহিকভাবে উত্তর দেওয়া হলো।
প্রথমে একটি মৌলিক বিষয়: মোহরানা আদায়ের পদ্ধতি
প্রশ্নে বলা হয়েছে, স্বামী স্ত্রীর মোহরানার টাকা সরাসরি স্ত্রীকে না দিয়ে তার নামে জমি কিনে দিতে চান। ফিকহের দৃষ্টিতে এটি মোহরানা আদায়ের একটি বৈধ পদ্ধতি, তবে শর্ত হলো—
১. জমিটি স্ত্রীর নামে ও তার মালিকানায় হতে হবে (রেজিস্ট্রি/দলিলে স্ত্রীর নাম থাকতে হবে)। ২. স্ত্রীকে জমিটি সম্মতিসহ গ্রহণ করতে হবে; জোরপূর্বক বা তার অজান্তে নয়। ৩. জমির মূল্য যদি মোহরানার সমপরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং উভয়ে সম্মত হন, তবে মোহরানা আদায় হয়ে যাবে।
দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—
«وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً» "তোমরা নারীদের তাদের মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে দাও।" (সূরা নিসা: ৪)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, মোহরানা স্ত্রীর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন; স্বামী তার অনুমতি ছাড়া তা ভোগ করতে পারবে না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে মোহরানার বিনিময়ে সম্পদ (জমি) প্রদান করা জায়েজ। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১০০-১০৫)
প্রশ্ন ১: এক্ষেত্রে দুইজনের উপর হজের বিধান কী?
হজ ফরজ হওয়ার শর্ত
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হজ ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো— ১. মুসলিম হওয়া, ২. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া, ৩. স্বাধীন হওয়া, ৪. মালিকানা (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া) — অর্থাৎ হজের খরচ এবং যাওয়া-আসার খরচ এবং বাড়িতে পরিবারের ভরণপোষণের অতিরিক্ত সম্পদ থাকা, ৫. পথের নিরাপত্তা, ৬. নারীদের জন্য মাহরাম همراه থাকা।
দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—
«وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا» "আল্লাহর জন্য মানুষের উপর বাইতুল্লাহর হজ ফরজ, যে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।" (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«تَعَجَّلُوا الْحَجَّ فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَا يَدْرِي مَا يَعْرِضُ لَهُ» "তোমরা হজে দ্রুত করো; কারণ তোমাদের কেউ জানে না তার সামনে কী আসবে।" (মুসনাদে আহমাদ; সুনানে আবু দাউদ: ১৭৩২)
স্ত্রীর হজের বিধান
স্ত্রীর মোট সম্পদ:
- জমানো টাকা: ৩ লাখ
- স্বর্ণের বিক্রয়মূল্য: ৪–৪.৫ লাখ
- স্বামীর কাছে মোহরানা পাওনা: ৭.৫ লাখ
মোট প্রাপ্য/মালিকানাধীন সম্পদ ≈ ১৪.৫–১৫ লাখ টাকা।
এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:
(ক) মোহরানা কি তার মালিকানায় গণ্য হবে? হ্যাঁ। মোহরানা আদায় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা স্ত্রীর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সম্পদ। তবে প্রশ্নে বলা হয়েছে, স্বামী মোহরানার টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে জমি কিনে দিতে চান—অর্থাৎ মোহরানা এখনো আদায় হয়নি, কেবল আদায়ের প্রক্রিয়াধীন। যতক্ষণ মোহরানা প্রকৃতপক্ষে আদায় না হয় (স্ত্রীর মালিকানায় জমি বা টাকা না আসে), ততক্ষণ তা হজ ফরজ হওয়ার হিসাবে গণ্য হবে না। কারণ পাওনা (দেনা) হাতে না আসা পর্যন্ত মালিকানা পূর্ণ হয় না।
(খ) বর্তমানে তার হাতে থাকা সম্পদ: ৩ লাখ টাকা + ৪–৪.৫ লাখ মূল্যের স্বর্ণ = ৭–৭.৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশে হজের বর্তমান খরচ (প্রায় ৫–৬ লাখ টাকা) এবং যাওয়া-আসা ও পরিবারের খরচ বাদ দিয়ে যদি অতিরিক্ত থাকে, তবে তার উপর হজ ফরজ হবে। তবে নারী হিসেবে মাহরাম (স্বামী, পিতা, ভাই, পুত্র প্রভৃতি) همراه থাকা শর্ত। স্বামীসহ হজে যাওয়া সম্ভব হলে এবং খরচের সামর্থ্য থাকলে তার উপর হজ ফরজ হবে।
সতর্কতা: যদি হজ ফরজ হয় এবং সে বিলম্ব করে, তবে গুনাহগার হবে; তবে হজ ফরজ হওয়ার পরও যদি মোহরানার টাকা দিয়ে জমি কেনা হয়, তাতে হজ ফরজ হওয়ার বিধান বদলাবে না—কারণ হজ ফরজ হয়ে গেলে সম্পদ হজে ব্যয় করা অগ্রাধিকারযোগ্য।
স্বামীর হজের বিধান
স্বামীর সম্পদ:
- জমানো টাকা: ৯ লাখ
- প্রভিডেন্ট ফান্ড: ৪ লাখ (যা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন, বেতন থেকে কাটা হবে)
মোট ≈ ১৩ লাখ টাকা।
কিন্তু তিনি এই টাকা থেকে ৭.৫ লাখ মোহরানা ও ৩ লাখ স্ত্রীর জমানো টাকা মিলিয়ে স্ত্রীর নামে জমি কিনতে চান, এবং ৫.৫ লাখ দিয়ে নিজের জমি রাখতে চান। এখানে বিবেচ্য—
১. মোহরানা প্রদান করা তার উপর ফরজ দায়। মোহরানা পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা দিয়েই হজ ফরজ হওয়া নির্ণয় হবে। ২. প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখ: এটি ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যা মাসিক বেতন থেকে কাটা হবে। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উপর হজ ফরজ হওয়ার জন্য ঋণ পরিশোধের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকা শর্ত। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি ঋণ পরিশোধের পর হজের সামর্থ্য রাখে, তবেই তার উপর হজ ফরজ। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৪৫৫)
সারসংক্ষেপ: বর্তমানে স্বামীর হাতে ৯ লাখ টাকা থাকলেও তার উপর ৭.৫ লাখ মোহরানার দায় রয়েছে এবং ৪ লাখ প্রভিডেন্ট ঋণ রয়েছে। মোহরানা ও ঋণ পরিশোধের পর যদি হজের খরচ ও পরিবারের ভরণপোষণের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, তবেই তার উপর হজ ফরজ হবে। প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী, মোহরানা ও জমি কেনার পর তার হাতে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সম্পদ থাকছে না—তাই বর্তমানে তার উপর হজ ফরজ হওয়ার সম্ভাবনা কম; তবে ভবিষ্যতে সামর্থ্য হলে ফরজ হবে।
মনে রাখতে হবে: হজ ফরজ হওয়ার হিসাবে "জমি কেনা" বা "সম্পদ বিনিয়োগ" হজ ফরজ হওয়া রোধ করে না, যদি প্রকৃতপক্ষে হজের সামর্থ্য (খরচের অতিরিক্ত সম্পদ) থাকে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হজ এড়াতে সম্পদ বিনিয়োগ করলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে।
প্রশ্ন ২: স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখের উপর যাকাতের বিধান
প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যাকাতযোগ্য সম্পদ হিসেবে গণ্য হওয়ার শর্ত
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তখনই যাকাতের হিসাবে গণ্য হবে যখন তা কর্মচারীর পূর্ণ মালিকানায় ও হস্তগত (কবজা) হয়। যতক্ষণ তা সরকারি/প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা থাকে এবং কর্মচারী তা উত্তোলন করতে না পারে, ততক্ষণ তা "মালিকানাধীন সম্পদ" হিসেবে গণ্য হয় না; ফলে তার উপর যাকাত ফরজ হয় না।
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«لَيْسَ فِي الْمَالِ الَّذِي لَمْ يَحُلْ عَلَيْهِ الْحَوْلُ زَكَاةٌ» "যে সম্পদের উপর এক বছর অতিক্রান্ত হয়নি, তাতে যাকাত নেই।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৭৩)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, যে সম্পদ কর্মচারীর হস্তগত নয় বা উত্তোলনের অধিকার নেই, তা যাকাতের নিসাব হিসাবে গণ্য হবে না। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৬৭)
প্রশ্নের নির্দিষ্ট অবস্থা
প্রশ্নে বলা হয়েছে, স্বামী প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন, যা প্রতি মাসে বেতন থেকে কাটা হবে। অর্থাৎ—
১. টাকাটি এখন তার হস্তগত হয়েছে — সুতরাং এটি এখন তার মালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। ২. তবে এটি ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ তার উপর এই ৪ লাখ পরিশোধের দায় রয়েছে। ৩. যাকাতের হিসাবে নিট সম্পদ (মালিকানাধীন সম্পদ − ঋণ) গণ্য হয়। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ঋণ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ (সোনা-রুপার হিসাবে ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণ বা ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপার মূল্য) হলে এবং এক বছর অতিক্রান্ত হলে যাকাত ফরজ হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাতের হিসাবে ঋণ বাদ দেওয়া হবে। (আল-হিদায়া: ১/১০৫; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১৭৯)
ব্যবহারিক নির্দেশনা
- যদি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন করে হাতে নিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদের সঙ্গে মিলিত হয় এবং এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তবে তার উপর যাকাত ফরজ হবে।
- তবে যেহেতু এটি ঋণ এবং মাসিক বেতন থেকে কাটা হচ্ছে, তাই যাকাতের হিসাবে ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদের উপর যাকাত গণ্য হবে। যদি নিট সম্পদ নিসাব পরিমাণ না হয়, তবে যাকাত ফরজ নয়।
- প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা থাকা অবস্থায় (উত্তোলনের আগে) তার উপর যাকাত ফরজ ছিল না—কারণ তখন তা হস্তগত ছিল না।
- প্রশ্নে বলা হয়েছে, "বাকি টাকার ও স্বর্ণের যাকাত প্রতিবছর আদায় করা হয়েছে"—আলহামদুলিল্লাহ। এখন প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখ উত্তোলনের পর তা যাকাতের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তবে ঋণের দায় বিবেচনায় নিতে হবে।
সতর্কতা: যাকাতের হিসাব সর্বদা হিজরি বছরের নির্দিষ্ট তারিখে (যাকাতের বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে) মালিকানাধীন নিট সম্পদের উপর গণনা করতে হবে। ঋণ বাদ দেওয়ার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | স্ত্রীর হজ | মোহরানা প্রকৃতপক্ষে আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা হিসাবে গণ্য হবে না। বর্তমানে হাতে থাকা ৩ লাখ টাকা + ৪–৪.৫ লাখের স্বর্ণ = ৭–৭.৫ লাখ। হজের খরচ ও পরিবারের খরচের অতিরিক্ত থাকলে এবং মাহরামসহ যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ ফরজ। | | স্বামীর হজ | ৭.৫ লাখ মোহরানার দায় ও ৪ লাখ প্রভিডেন্ট ঋণ পরিশোধের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকলে হজ ফরজ। বর্ণনা অনুযায়ী বর্তমানে ফরজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। | | মোহরানার বিনিময়ে জমি | বৈধ, শর্ত হলো জমি স্ত্রীর নামে ও মালিকানায় হবে এবং সে সম্মত থাকবে। | | প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখ | উত্তোলনের পর হস্তগত সম্পদ হিসেবে গণ্য; তবে ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হবে। জমা থাকা অবস্থায় যাকাত ফরজ ছিল না। |
পরামর্শ: উভয়ের হজের হিসাব সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট হিজরি তারিখে সম্পদ ও ঋণের পূর্ণ হিসাব করে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি/দারুল ইফতার সঙ্গে পরামর্শ করুন। বিশেষ করে মোহরানা আদায়ের দলিল ও জমির মালিকানা বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করুন।
والله أعلم بالصواب وإليه المرجع والمآب