স্বামীর ভরণপোষণ না দেওয়া, দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা ও শ্বশুর-শ্বশুরীর কঠোরতার ক্ষেত্রে ইসলামী নির্দেশনা। ইস্তিখারা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা, দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়, দাম্পত্য সমস্যার শরীয়াহসম্মত সমাধান ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7444
Questioner: Jakia Moon
Question Asked: 27 Oct 2026, 04:13 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 07:07 PM
Views: 18
Tokens: 9,826
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আশা করি ভালো আছেন। দীর্ঘ ৬ মাস যাবত আমি দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন আছি। প্রসঙ্গত আমার স্বামী বিয়ের বয়স ৪ বছর।বিয়ের ৬ মাস পর, সাড়ে ৩ বছর আগে বাহিরে যায় এবং ডকুমেন্টস না হওয়ায় সে এখনো আসতে পারছে না, এবং কবে আসবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। ৬ মাস কিংবা বছরও লাগতে পারে।
এদিকে আমার শ্বশুড় শ্বাশুড়ি শুরু থেকেই আমার প্রতি একটু কঠোর। আমার ননাস তার সন্তান ও স্বামী সহ আমার শ্বশুর বাড়িতেই থাকেন। যার কারণে সব কিছুতেই আমার খুব হ্যাসেল পোহাতে হয়। শুরু থেকেই আমাদের বাড়ির আদান প্রদান এ তারা কখনোই সন্তুষ্ট হন না এবং আমার সব কাজেই তাদের ভুল চোখে পরে। গত রোজার ঈদে তারা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে আমরা ১৫ জন মানুষ কে জামা কাপড় দেই যা তাদের পছন্দ হয় না এবং পুরাতন জামা দিয়েছি বলে নানা গালিগালাজ করে।এদিকে আমার স্বামী তার পরিবার যা বলে তাতেই বিশ্বাস করেন এবং সেভাবে কাজ করেন। সে ৬ মাস ধরে আমার সাথে কোনো যোগাযোগ ই করছে না,,এমনকি বিয়ের পর থেকেও সে আমার ভরণ পোষণ খুব একটা দেয় নি। মাঝখানে কয়েক মাস ই হয়তো আমাদের দাম্পত্য জীবনে ভালো কেটেছিলো। সে জানে তার মা এবং বোন এমন। কিন্তু আমাকে সব সময় ই বলে সব মেনে নিতে। গত ৪-৫ দিন আগে আমার বোন খুব চেষ্টায় তার সাথে যোগাযোগ করলে সে বলে- আমার মা বোন কে তেলায় না চলতে পারলে সে মেয়ের সাথে আমি সংসার করবো না,,আর আমার বাবা গালি দিয়েছে, ঠিক করেছে আরও নানান কিছু।
একয় মাস খুব ইস্তেগফার, দুরুদ,সুরাহ বাকারা, (মাঝে মাঝে তাহাজ্জুদ) পড়ার পরওএখন আমি আর নিতে পারছি না। দুই দিন যাবত ইস্তেখারা করছি। অনেক ইস্তেগফার, দুরুদ করার পর, গতকাল স্বপ্নে দেখি আমি খুবই খোলামেলা অবস্থায় একটা গাড়িতে বসা, সামনে থেকে আমাকে কেউ বলে আরও ঠিলে পোশাক পরতে, আমি তা করার পর বলি আমার পক্ষে আর সম্ভব না, তখন সামনে তাকিয়ে দেখি যাকে আমি স্বামী ভাবতাম সে অন্য কেউ ( অন্য রূপী চেহারা), ভয়ে আমি গাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নারীরুপি কেউ আমাকে আরও হ্যারেস করার চেষ্টা করছে।
জানি ইস্তেখারা নামাজ টা স্বপ্নের সাথে রিলেটেড না বাট গতকাল এ স্বপ্ন দেখার পর আমি আতংকিত হলেও আজ একটু শান্ত। মনে হচ্ছে যা হয় হবে। জানিনা এ স্বপ্ন কি শয়তানের পক্ষ থেকে নাকি কোনো বাস্তব জীবনের ইংগিত।
প্রিয় শায়েখ, আশা করি বিষয় টিতে একটু কেয়ারফুলি আমাকে গাইড করবেন।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আল-হামদুলিল্লাহ, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিল্লাহ


প্রথমত: স্বপ্নের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের দুটি দিক আছে — একটি হলো স্বপ্নের ব্যাখ্যা, অন্যটি হলো আপনার দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সমস্যা। ইসলামে স্বপ্নের ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ»

"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।"

— সহীহ বুখারী (৬৯৮৪), সহীহ মুসলিম (২২৬৩)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ فَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَلَا يُحَدِّثْ بِهِ أَحَدًا، فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّهُ»

"যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় কিছু স্বপ্ন দেখে, সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে, শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। নিশ্চয়ই তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।"

— সহীহ মুসলিম (২২৬২)

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ইস্তিখারার স্বপ্ন দেখা শর্ত নয়। ইস্তিখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং সিদ্ধান্তে আল্লাহর উপর ভরসা করা। শায়খ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ইস্তিখারার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়; বরং অন্তরে যে দিক সহজ হয় বা যে বিষয়ে কল্যাণ হয়, সেদিকেই অগ্রসর হতে হবে (মাজমূ' ফাতাওয়া ইবন উসাইমীন)।

আপনার স্বপ্ন সম্পর্কে: এটি একটি দুঃস্বপ্ন (حلم) হিসেবে গণ্য, যা শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে অথবা আপনার মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। এটি কারো সাথে বর্ণনা করবেন না, এবং এর উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। বরং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন।


দ্বিতীয়ত: আপনার দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সমস্যা

১. স্বামীর ভরণপোষণ (নাফাকা) না দেওয়া — এটি তার গুনাহ

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ﴾

"সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।"

— সূরা আত-তালাক: ৭

রাসূলুল্লাহ ﷺ হিন্দ বিনতে উতবার প্রতি বলেছিলেন:

«خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ»

"তুমি ন্যায়সংগতভাবে তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যা যথেষ্ট, তা নিয়ে নাও।"

— সহীহ বুখারী (৫৩৬৪)

শায়খ ইবন বায রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব; তা না দেওয়া তার গুনাহ (মাজমূ' ফাতাওয়া ইবন বায)।

২. স্বামীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা — এটি ইসলামে নিষিদ্ধ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ»

"কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন রাতের বেশি পরিত্যাগ করা হালাল নয়।"

— সহীহ বুখারী (৬০৭৭), সহীহ মুসলিম (২৫৬০)

স্ত্রীর ক্ষেত্রে এটি আরও গুরুতর। ছয় মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা এবং ভরণপোষণ না দেওয়া — এটি ইসলামী দৃষ্টিতে স্বামীর পক্ষ থেকে গুরুতর অন্যায়।

৩. শ্বশুর-শ্বশুরীর সাথে সম্পর্ক

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾

"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"

— সূরা আন-নিসা: ১৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي»

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"

— সুনান আত-তিরমিযী (৩৮৯৫), সহীহ

শায়খ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন, স্বামীর উপর ওয়াজিব হলো স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ করা এবং তার পরিবারের কথা শুনে স্ত্রীর প্রতি জুলুম না করা (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)।


তৃতীয়ত: আপনার করণীয়

১. ধৈর্য ও দু'আ অব্যাহত রাখুন

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾

"তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।"

— সূরা আল-আনফাল: ৪৬

২. স্বামীর সাথে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করুন

তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন — হয়তো কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের বড় কেউ মধ্যস্থতা করতে পারেন। আল্লাহ বলেন:

﴿وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا﴾

"যদি তোমরা তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে তার পরিবার থেকে একজন এবং তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী পাঠাও।"

— সূরা আন-নিসা: ৩৫

৩. শ্বশুর-শ্বশুরীর সাথে ধৈর্য ও ইহসান

তাদের সাথে সদাচরণ করুন, তবে নিজের উপর জুলুম হতে দেবেন না। শায়খ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন, স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শ্বশুরীর সেবা করা ওয়াজিব নয়; বরং সদাচরণ করা কর্তব্য (আল-মুলাখখাস আল-ফিকহী)।

৪. ইস্তিখারার সঠিক পদ্ধতি

ইস্তিখারার পর আপনি অন্তরে যে দিক সহজ ও প্রশান্তি বোধ করবেন, সেদিকে অগ্রসর হবেন। স্বপ্নের উপর নির্ভর করবেন না। শায়খ আল-আলবানী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ইস্তিখারার স্বপ্ন দেখা শর্ত নয় (সিলসিলা সহীহা)।

৫. প্রয়োজনে পারিবারিক সালিশ

যদি স্বামী যোগাযোগ না করে, ভরণপোষণ না দেয় এবং সম্পর্ক ছিন্ন রাখে, তাহলে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলিম বা ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হোন।

৬. দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়

  • বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলুন
  • শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান (আউযুবিল্লাহ)
  • কারো কাছে বর্ণনা করবেন না
  • নামাজে দাঁড়িয়ে যান

সারসংক্ষেপ

প্রিয় বোন, আপনার স্বপ্নটি শয়তানি বা মানসিক চাপের প্রতিফলন — এটি ভবিষ্যতের নিশ্চিত সংকেত নয়। আপনার বাস্তব সমস্যা হলো স্বামীর ভরণপোষণ না দেওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা এবং শ্বশুর-শ্বশুরীর কঠোরতা। ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ ওয়াজিব, এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা নিষিদ্ধ। আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, দু'আ করুন, পারিবারিক মধ্যস্থতার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا﴾

"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।"

— সূরা আত-তালাক: ২

আল্লাহ তা'আলা আপনার সমস্যা সহজ করে দিন এবং কল্যাণময় সমাধান দান করুন। আমীন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.