"বিবাহের জন্য হাজির করলাম/আর্জি করলাম" শব্দে ইজাব-কবুল সহিহ হয়েছে কি না, কনের স্পষ্ট উকিল নিযুক্তি না থাকলে বিবাহ শুদ্ধ হয় কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেব,
একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে কাজী প্রথমে কনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অমুকের ছেলে অমুকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে তিনি রাজি আছেন কি না। কনে সম্মতি জানান। তবে কনে কাজীকে স্পষ্টভাবে উকিল নিযুক্ত করেননি এবং কাজীও উকিল বানানোর কথা বলেছেন বলে জানা নেই। কনে জানতেন যে তাঁর বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে, তবে ওই ব্যক্তিই বিবাহ পড়াবেন, নাকি অন্য কেউ পড়াবেন, তা হয়তো নিশ্চিতভাবে জানতেন না।
এরপর কাজী বিবাহের মজলিসে উপস্থিত বহু সাক্ষীর সামনে বরের সঙ্গে নিম্নোক্ত কথোপকথন করেন—(ভিডিও দেখে "তোমার নিকট বিবাহের জন্য" এতোদূর বুঝা যায় বাকিটা বার বার শুনে বুঝা যায় না)
কাজী: অমুকের মেয়ে অমুককে এত টাকা মোহরানায় তোমার নিকট বিবাহের জন্য হাজির করলাম/আর্জি করলাম।
বর: কবুল করলাম/কবুল।
কাজী: আলহামদুলিল্লাহ বলো।
বর: আলহামদুলিল্লাহ।
কাজী: জোরে বলো।
বর: আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
উল্লেখ্য, কাজী ‘বিবাহের জন্য হাজির করলাম’ নাকি ‘বিবাহের জন্য আর্জি করলাম’—এই দুটি বাক্যের ঠিক কোনটি বলেছেন, তা নিশ্চিতভাবে মনে নেই। তবে এ দুটির যেকোনো একটি বলেছেন বলে মনে হচ্ছে। কাজী ইজাব দেওয়ার সময় ‘আমি কনের উকিল হিসেবে’ বা ‘কনের পক্ষ থেকে’—এমন কোনো কথা বলেননি।
এটি প্রকৃত বিবাহের মজলিস ছিল। সবাই বিবাহ সম্পাদনের উদ্দেশ্যেই উপস্থিত হয়েছিলেন এবং কাজী ও বর উভয়েই বিবাহ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেছেন।
(১)
প্রশ্ন: উপরোক্ত পরিস্থিতিতে কাজীর ব্যবহৃত ‘বিবাহের জন্য হাজির করলাম’ অথবা ‘বিবাহের জন্য আর্জি করলাম’ শব্দের মাধ্যমে শরয়ি ইজাব সংঘটিত হয়েছে কি না এবং কনের পূর্বসম্মতি থাকা সত্ত্বেও স্পষ্টভাবে উকিল নিযুক্ত না করার কারণে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না—এসব বিবেচনায় হানাফি মাজহাব অনুযায়ী উক্ত বিবাহ সহিহ হয়েছে, নাকি পুনরায় ইজাব-কবুল করা আবশ্যক?
(২) এই ইজাব কবুল নিয়ে স্বামী কিছু দিন থেকে খুব দুটানায় আছে৷ ভিডিও বের করলেও মূল কথা সম্পূর্ন বুঝতেছেও না। এখন সব মিলিয়ে তার কি করণীয়
অনুগ্রহ করে নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের দলিলসহ জানালে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উক্ত বিবাহ কি শুদ্ধ হয়েছে?
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার উত্থাপিত প্রশ্ন দুটির ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাব থেকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত শরঈ সমাধান নিচে প্রদান করা হলো:
(১) ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর (বিবাহের সহীহ হওয়া ও ইজাব-কবুল প্রসঙ্গ):
উত্তর: উক্ত পরিস্থিতিতে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী আপনাদের বিবাহ সম্পূর্ণ সহীহ, শুদ্ধ ও বৈধ হয়েছে। পুনরায় ইজাব-কবুল করার বিন্দুমাত্র কোনো প্রয়োজন নেই।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. কনের পূর্বসম্মতি ও উকালতের শরঈ বিধান: একজন বালেগা ও আকিল (প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের) নারীর বিবাহে তার নিজ সম্মতিই মূল। কাজী সাহেব যখন কনের নিকট গিয়ে পাত্রের নাম-পরিচয় উল্লেখ করে বিবাহের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন এবং কনে তাতে সম্মতি প্রদান করেন, তখনই কাজী সাহেবের জন্য বিবাহ পড়ানোর শর'য়ী ইজাজত (অনুমতি/উকালত) হাসিল হয়ে যায়। এর জন্য কনেকে মুখে স্পষ্টভাবে "আপনাকে উকিল বানাইলাম" শব্দ উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। কনের এই পূর্বসম্মতির পর কাজী সাহেব যে ইজাব করেছেন, তা কনের পক্ষ থেকে অনুমোদিত বলেই ধর্তব্য।
২. ইজাবের শব্দাবলি ("হাজির করলাম" বা "আর্জি করলাম"): বিবাহের প্রকৃত মজলিসে (আকদের অনুষ্ঠানে) উপস্থিত সাক্ষীগণের সামনে বিবাহ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে কাজী সাহেবের বলা শব্দ— "অমুকের মেয়ে অমুককে এত টাকা মোহরানায় তোমার নিকট বিবাহের জন্য হাজির করলাম/আর্জি করলাম"—এটি হানাফী ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্ট ও সঠিক ইজাব (প্রস্তাব) হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। কারণ প্রচলিত প্রথা (উরফ) ও মজলিসের প্রেক্ষাপট দ্বারা বিবাহের প্রস্তাবই সুনির্দিষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে।
৩. "কনের উকিল হিসেবে" উল্লেখ না করার হুকুম: ইজাব প্রদানকালে কাজী সাহেব মুখে "আমি কনের উকিল" বা "কনের পক্ষ থেকে" কথাটি না বললেও বিবাহের বৈধতায় কোনো ত্রুটি আসে না। কনের নাম ও পিতার নাম উল্লেখ করে প্রস্তাব উত্থাপন করাই যথেষ্ট।
(২) ২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর (স্বামীর দুটানা, ওয়াসওয়াসা ও করণীয়):
উত্তর: স্বামী যে অহেতুক দুটানায় ভুগছেন এবং ভিডিও ক্লিপ বারবার শুনে মূল কথা বের করার চেষ্টা করছেন—এটি ফিকহের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অহেতুক 'ওয়াসওয়াসা' (শয়তানী কূচিন্তা ও সন্দেহ)।
স্বামীর করণীয়: ১. ভিডিও দেখা ও অহেতুক সন্দেহ সম্পূর্ণ বন্ধ করা: ফিকহে হানাফীর অন্যতম প্রধান মূলনীতি হলো— "সুনিশ্চিত বিষয় নিছক সন্দেহের কারণে বাতিল বা অসিদ্ধ হয় না" (اليقين لا يزول بالشك)। যেহেতু বিবাহ অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে ইজাব ও বর কর্তৃক "কবুল করলাম" বলা নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাই অস্পষ্ট অডিও নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা শরীয়তে সম্পূর্ণ নিরর্থক। ২. নিশ্চিন্ত মনে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করা: আপনাদের আকদ সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত হয়েছে। মনে কোনো প্রকার ভয় বা সংশয় না রেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে নিশ্চিন্তে বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করুন।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৯–২৭০ ও ২৭৪–২৭৫ (কিতাবুন নিকাহ, 'কনের অনুমতি ও ইজাব-কবুলের শর্তাবলী')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৯৪–২৯৫ (৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: 'বিবাহে উকিল নিয়োগ করার বিবরণ' — কনের অনুমতিতে উকিল কর্তৃক ইজাব করা); এবং পৃষ্ঠা: ২৯৮–২৯৯ (ফযূলী ও অনুমোদিত ব্যক্তির আকদ)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫২৯–৫৩০ (অধ্যায়: নিকাহ, ফাসলুন ফিত-তাউকীল ফিন নিকাহ / 'নিকাহে উকালতের বিবরণ')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩, ১৫৬–১৫৮ (অধ্যায়: নিকাহ, 'ইজাব-কবুল ও কনের রেযামন্দি')।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৭০ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, 'ইজাব-কবুল ও উকালতের শর'য়ী শর্তসমূহ')।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২১–১২২ (কায়দা: 'আল-ইয়াকীনু লা ইযালু বিশ-শাক্ক' — সুনিশ্চিত বিষয় সন্দেহে বাতিল হয় না)।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক ফিকহি বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।