উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে এমন বিষয় উল্লেখ করা যা ইসলামে হারাম

Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7368
Questioner: Ritika
Question Asked: 25 Oct 2026, 08:20 AM
Reviewed & Published: 25 Oct 2026, 09:48 AM
Views: 21
Tokens: 9,976
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি লেখালেখি করতে খুবই পছন্দ করি। আমার উদ্দেশ্য হলো কোনো হারামকে আকর্ষনীয় করে না দেখানো। আমি মূলত লেখালেখি করি ফেসবুকে। ভিডিও এর মাধ্যমে ইনকাম তো হারাম, আমি এজন্য লেখালেখির মাধ্যমে ইনকাম করতে চাচ্ছি। একটা উপন্যাস লিখতে চাচ্ছি, যেটার সময়কাল বা প্রেক্ষাপট হলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের। যখন তুরস্কের সুলতানদের আধিপত্য ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো বিশ্ব জুড়ে। যেমন: সুলতান সুলেমান, সুলতান সেলিম, সুলতান আহমেদ, সুলতান মুরাদ। এই সুলতানদের সময়কাল বা প্রেক্ষাপটে যেসব নিয়মাবলী ছিল সেগুলো উপন্যাসে লেখা জায়েজ? সবচেয়ে দ্বিধার বিষয়গুলো হলো কয়েকটা।
(০১)..ওই সময় দাসপ্রথা ছিল। আসলে নিয়ম ছিল সুলতানের নিজস্ব একটা হেরেম বা হারেম রাখার। যেখানে যুদ্ধাপরাধ দাসি এবং ক্রয় করা দাসিদের রাখা হতো সুলতানের জন্য।
আমার প্রশ্ন হলো যে ওই সময় এই দাসপ্রথা নিয়ে যে নিয়ম বা রীতি বা সংস্কৃতি ছিল সেটা উপন্যাসে লেখা যাবে?
(০২)... এই উপন্যাসে অনেক সময় ষড়যন্ত্র লেখা লাগতে পারে। যেমন- প্রাসাদের মধ্যে একজন সুলতানা, অন্য আরেকজন সুলতানা থেকে কীভাবে আরও ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে। কীভাবে হারেমের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, কীভাবে একজন দাসি অন্য দাসির চেয়ে বেশি ক্ষমতা পেতে পারে ইত্যাদি ষড়যন্ত্র লেখা লাগতে পারে।
এখানে মূলত আমার প্রশ্ন হলো যে উপন্যাসের প্রয়োজনে আমি কি এসব ষড়যন্ত্র(যেখানে গীবত, সমালোচনা, মিথ্যা বলা অন্যের নামে বা নিজেকে বাঁচানোর জন্য, অপবাদ দিয়ে নিচে নামানো বা প্রতিশোধ নেয়া, আক্রমণ করা) লিখতে পারব?
আমি আসলে এগুলোকে উৎসাহ দিতে চাই না, তবে এগুলো তো আগেও ওইসব সুলতানদের জীবনে ছিল। আর আমি সম্পূর্ণ বাস্তব একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে চাই না। আমি মূলত প্রেক্ষাপট বা ওই সময়কার সংস্কৃতি, রীতিনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, নিয়মাবলি ইত্যাদির উপর উপন্যাসটা লিখতে চাই। তবে চরিত্রগুলো এবং কাহিনি আমার কল্পনা থেকে লিখব।
এখন আমার করণীয় কী? কীভাবে এই উপন্যাসটা লিখব? দয়া করে রেফারেন্সসহ উত্তর দিলেন খুবই উপকৃত হতাম।

Answer

উপন্যাসে হারাম বিষয়, দাসপ্রথা ও ষড়যন্ত্র তুলে ধরার বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা বর্ণনা করা যাবে, কিন্তু হারাম কাজকে আকর্ষণীয় করা, বিস্তারিত বর্ণনা করা, বা ষড়যন্ত্র-মিথ্যা-গীবতকে বৈধ বা প্রশংসনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। ইসলামের দাওয়াহ ও সত্যের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট রাখতে হবে।


১. মূল নীতি: হারামকে আকর্ষণীয় না দেখানো

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করো এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা করো সেই আগুন থেকে, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।" (সূরা আত-তাহরীম: ৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখাল, সে তার অনুসরণকারীদের সমান প্রতিদান পাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজের পথ দেখাল, সে তার অনুসরণকারীদের সমান গুনাহ পাবে।" (সহীহ মুসলিম: ১৮৯৩)

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত রূপের বিপরীতে চিত্রিত করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।" (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন)

সুতরাং: আপনার উদ্দেশ্য সঠিক — হারামকে আকর্ষণীয় না দেখানো। কিন্তু শুধু নিয়ত ভালো থাকলেই হারাম কাজের বিস্তারিত বর্ণনা জায়েজ হয় না।


২. প্রশ্ন (০১): দাসপ্রথা ও হেরেমের নিয়ম লেখা যাবে?

ক. দাসপ্রথার ঐতিহাসিক বর্ণনা

যাবে, শর্তসহ:

  • ইসলাম দাসপ্রথাকে উৎসাহিত করেনি; বরং দাস মুক্তিকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন: "আর দাস মুক্তির জন্য... " (সূরা আল-বাকারা: ১৭৭)
  • রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম দাসকে মুক্ত করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে তার অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।" (সহীহ বুখারী: ২৫১৭)
  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা যাবে, কিন্তু দাসপ্রথাকে বৈধ বা প্রশংসনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না — কারণ বর্তমানে দাসপ্রথা বিলুপ্ত এবং ইসলামের মূল লক্ষ্য ছিল এর বিলোপ।

খ. হেরেম ও যৌন দাসীর বিষয়

এখানে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি:

আল্লাহ বলেন:

"তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)

"আর মুমিনগণ... নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে।" (সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭)

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "অশ্লীল বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা করা — যদিও তা নিষেধ করার উদ্দেশ্যে হয় — সাধারণত মানুষের অন্তরে কুপ্রবৃত্তি জাগায়। তাই সংক্ষেপে ইঙ্গিতই যথেষ্ট।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, সংকলিত)

সিদ্ধান্ত:

  • হেরেমের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা যাবে (যেমন: "সুলতানের প্রাসাদে দাসীরা ছিল")।
  • কিন্তু যৌন দৃশ্য, শয্যা-কক্ষের বর্ণনা, দাসীদের রূপ-সৌন্দর্যের বিস্তারিত চিত্রণ — সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি আধুনিক উপন্যাসের সবচেয়ে বড় ফিতনা।
  • শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যে লেখা পাঠকের অন্তরে হারামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে, তা লেখকের জন্য ক্ষতিকর।" (সিলসিলা সহীহা ভূমিকা)

৩. প্রশ্ন (০২): ষড়যন্ত্র, গীবত, মিথ্যা, অপবাদ লেখা যাবে?

ক. গীবত ও অপবাদের বিধান

আল্লাহ বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা كثير ধারণা থেকে বেঁচে থাকো... আর তোমরা একে অপরের গীবত করো না।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

"তোমরা কি জানো গীবত কী? তারা বলল: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালো জানেন। তিনি বললেন: তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯)

"যে ব্যক্তি নিজের চোখ দিয়ে দেখেনি, সে যা বলে তা অপবাদ।" (সহীহ বুখারী, আদাবুল মুফরাদ: ৫৯৬ — হাসান)

খ. কল্পকাহিনীতে ষড়যন্ত্র লেখার বিধান

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | বাস্তব ব্যক্তির নামে মিথ্যা/গীবত | হারাম — এটি অপবাদ | | কাল্পনিক চরিত্রের ষড়যন্ত্র (নিন্দা না করে, শুধু ঘটনা হিসেবে) | শর্তসহ জায়েয | | ষড়যন্ত্রকে প্রশংসনীয়/অনুকরণীয় দেখানো | হারাম | | ষড়যন্ত্রের পরিণাম ও ক্ষতি দেখানো | জায়েয, বরং উত্তম |

শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "কল্পকাহিনী যদি সত্য ও ন্যায়ের প্রতি উৎসাহ দেয় এবং মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের পরিণতি দেখায়, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি তা পাঠককে মন্দ কাজে উৎসাহিত করে, তবে নিষিদ্ধ।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায)

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: "মিথ্যা ও প্রতারণার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে তা শেখানো যাবে না; শুধু পরিণতি ও নিষেধাজ্ঞা বর্ণনা করাই যথেষ্ট।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান)

গ. বাস্তব সুলতানদের নাম ব্যবহার

সতর্কতা: সুলতান সুলেমান, সেলিম প্রমুখ বাস্তব ব্যক্তি। তাঁদের সম্পর্কে প্রমাণিত ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া মিথ্যা, গীবত বা অপবাদ লেখা হারাম। আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্যায়কারীদেরকে পথ দেখান না।" (সূরা ইব্রাহীম: ৪২)

সমাধান: কাল্পনিক চরিত্র ব্যবহার করুন (যেমন: "সুলতান খালিদ", "সুলতানা নূর")। অথবা বাস্তব নাম ব্যবহার করলে শুধু প্রমাণিত ঐতিহাসিক তথ্য লিখুন, কল্পিত অপবাদ নয়।


৪. আপনার করণীয় — ব্যবহারিক নির্দেশনা

✅ যা করবেন:

  1. প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুন — উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, আইন, সমাজব্যবস্থা — তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষভাবে।

  2. কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করুন — বাস্তব সুলতানদের নামে কল্পিত অপবাদ এড়িয়ে চলুন।

  3. হারামের পরিণতি দেখান — ষড়যন্ত্র, গীবত, দাসপ্রথার অন্যায় — এগুলোর ক্ষতিকর ফলাফল ও ইসলামের অবস্থান স্পষ্ট করুন।

  4. ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরুন — ন্যায়বিচার, দানশীলতা, ইলম, জিহাদ, দাস মুক্তি — এসব দিক চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলুন।

  5. সংক্ষেপে ইঙ্গিত দিন — যৌনতা বা অশ্লীলতার দৃশ্যে "রাত কাটল", "প্রাসাদের অন্তঃপুরে" — এ ধরনের সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত ব্যবহার করুন, বিস্তারিত নয়।

  6. নিজের নিয়ত পরীক্ষা করুন — লেখার প্রতিটি অংশে ভাবুন: "এটি কি পাঠককে হারামের প্রতি আকর্ষিত করছে?"

❌ যা করবেন না:

  1. যৌন দৃশ্য বা শয্যা-কক্ষের বিস্তারিত বর্ণনা।
  2. দাসীদের রূপ-সৌন্দর্যের আকর্ষণীয় চিত্রণ।
  3. বাস্তব ব্যক্তির নামে মিথ্যা, গীবত, অপবাদ।
  4. ষড়যন্ত্রকে বীরত্ব বা বুদ্ধিমত্তা হিসেবে প্রশংসা।
  5. হারাম কাজকে "স্বাভাবিক" বা "প্রয়োজনীয়" হিসেবে উপস্থাপন।
  6. কুফর, শিরক, বা ইসলামবিরোধী মতকে আকর্ষণীয় দেখানো।

৫. ইনকামের বিধান

আপনি বলেছেন ভিডিওর ইনকাম হারাম। লেখালেখির ইনকামও হালাল হতে হবে শর্তসহ:

  • লেখার বিষয়বস্তু হালাল হতে হবে।
  • বিজ্ঞাপন বা স্পনসরশিপে হারাম (সুদ, জুয়া, অশ্লীলতা) থাকা যাবে না।
  • শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে উপায়ে উপার্জন হয় তা যদি হারাম হয়, তবে উপার্জনও হারাম।" (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)

পরামর্শ: ফেসবুকে লেখালেখির ইনকাম (যেমন: ব্লগ, পেইড আর্টিকেল) জায়েয, যদি বিষয়বস্তু ও বিজ্ঞাপন হালাল হয়। ভিডিওর ইনকামও হারাম নয় — যদি ভিডিওর বিষয়বস্তু ও বিজ্ঞাপন হালাল হয়। মূল বিষয় হলো কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপনের হালালতা, মাধ্যম নয়।


৬. উপসংহার

আপনার নিয়ত প্রশংসনীয়। কিন্তু মনে রাখবেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যারা ন্যায়বিচার করে।" (সূরা আল-মুমতাহিনা: ৮)

একটি ইসলামী উপন্যাসের লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য, ন্যায় ও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা — শুধু ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়। উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে যেমন ন্যায়বিচার ও জিহাদ ছিল, তেমনি ষড়যন্ত্র ও অন্যায়ও ছিল। আপনি ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট রেখে লিখুন।

শেষ পরামর্শ: লেখা প্রকাশের আগে একজন বিশ্বস্ত আলিমকে দেখান। আল্লাহ আপনার ইলম ও আমল বাড়িয়ে দিন। আমীন।


রেফারেন্স সারসংক্ষেপ

| বিষয় | দলিল | |------|-------| | হারামকে আকর্ষণীয় না দেখানো | সূরা আত-তাহরীম: ৬; সহীহ মুসলিম: ১৮৯৩ | | যৌনতার কাছেও না যাওয়া | সূরা আল-ইসরা: ৩২; সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭ | | গীবত ও অপবাদ | সূরা আল-হুজুরাত: ১২; সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯ | | দাস মুক্তির ফযীলত | সহীহ বুখারী: ২৫১৭; সূরা আল-বাকারা: ১৭৭ | | কল্পকাহিনীর শর্ত | ইবন বায, মাজমুউ ফাতাওয়া; ফাওযান, আল-মুনতাকা | | উপার্জনের হালালতা | ইবন উসাইমীন, ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম |


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.