মাসতুরাতের তালিমে বয়ান শেষে পুরুষদের সম্মিলিত দুআ কি বিদআত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
মাসতুরাতের তালিমে বয়ান শেষে পুরুষদের সম্মিলিত দুআ নিজে থেকে বিদআত নয়; বরং এটি মূলত জায়েয। তবে তা শর্তসাপেক্ষ। যদি সম্মিলিত দুআকে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা বিশেষ সওয়াবের আমল হিসেবে স্থির করা হয়, অথবা এমনভাবে করা হয় যা সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতির বিপরীত হয়, তাহলে বিদআত হবে।
আর সাধারণভাবে সবাই মিলে দুআ করা—যেমন বৃষ্টির জন্য, বিপদ দূরের জন্য, সফরের জন্য, খুতবায়—এসব ক্ষেত্রে জায়েয, বরং অনেক ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত।
১. মূলনীতি: দুআ ইবাদত, কিন্তু পদ্ধতি ও আকিদা গুরুত্বপূর্ণ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমাদের রব বলেছেন: আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।”
(সূরা গাফির: ৬০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ
“দুআই হলো ইবাদত।”
(সুনানে তিরমিজি: ৩৩৭২; সুনানে আবু দাউদ: ১৪৭৯—হাসান সহিহ)
কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: তাওকিফি—অর্থাৎ শরিয়ত যা নির্ধারণ করেছে, তাতে বাড়ানো-কমানো করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করবে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
(সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
ইমাম ইবন আবিদিন রহ. বলেন, বিদআত হলো এমন নতুন পদ্ধতি যা নবী ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না, অথচ দ্বীনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০; ফাতাওয়া শামি)
২. সম্মিলিত দুআ কখন জায়েয?
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে সম্মিলিত দুআ জায়েয, বরং অনেক ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত:
(ক) শরিয়তসম্মত কারণ ও প্রয়োজন থাকা
যেমন:
- বৃষ্টির জন্য দুআ (সালাতুল ইস্তিসকা)
- বিপদ, মহামারি, যুদ্ধ বা কঠিন পরিস্থিতিতে দুআ
- সফরের সময় বিদায়ী দুআ
- খুতবা ও ওয়াজের মধ্যে দুআ
- জামাতে নামাজের পর ইমাম ও মুক্তাদিদের দুআ—তবে প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থানে, একসাথে উচ্চস্বরে নয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বৃষ্টির জন্য বের হয়ে জামাতে দুআ করেছেন।
(সহিহ বুখারি: ১০১৪; সহিহ মুসলিম: ৮৯৪)
আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুআর অধিকাংশ ছিল:
اللَّهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
(সহিহ বুখারি: ৬৩৮৯; সহিহ মুসলিম: ২৬৯০)
(খ) দুআর মূল বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়া; কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে দ্বীনি বিধান বানানো না হলে
যেমন: বয়ান শেষে উপস্থিত সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা, হেদায়েত ও কল্যাণ চাইবে। এটি সাধারণ দুআর অন্তর্ভুক্ত। তবে এটিকে “তালিমের বয়ানের অবিচ্ছেদ্য সুন্নত” বা “নির্দিষ্ট সওয়াবের আমল” বলে বিশ্বাস করা যাবে না।
(গ) ইমাম বা বক্তা দুআ করবেন, উপস্থিতরা আমিন বলবে
এটি জায়েয। সাহাবায়ে কেরামের যুগে কেউ দুআ করলে অন্যদের আমিন বলা প্রমাণিত। তবে সবাই একসাথে উচ্চস্বরে দুআ পড়া বা সুর মিলিয়ে দুআ পড়া—এটি সাহাবায়ে কেরামের সাধারণ পদ্ধতি ছিল না।
৩. সম্মিলিত দুআ কখন বিদআত?
নিম্নোক্ত অবস্থায় সম্মিলিত দুআ বিদআত বা নিন্দনীয় হবে:
(ক) একে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা বিশেষ সুন্নত মনে করা
যদি বলা হয়, “তালিমের বয়ান শেষে পুরুষদের সম্মিলিত দুআ না করলে তালিম অপূর্ণ,” অথবা “এটি বিশেষ সওয়াবের আমল”—এটি বিদআত। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে এমন নির্দিষ্ট বিধান প্রমাণিত নয়।
(খ) নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি আবিষ্কার করা
যেমন: প্রতি বয়ানের শেষে অবশ্যই অমুক দুআ অমুক সংখ্যায়, অমুক সুরে, সবাই একসাথে উচ্চস্বরে—এবং একে দ্বীনি রীতি বানানো। ইমাম শাতিবি রহ. বলেন, ইবাদতে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা বিদআত।
(আল-ইতিসাম, ১/৩৭)
(গ) সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতির বিপরীত করা
সাহাবায়ে কেরাম সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে দুআ করতেন; জামাতে দুআর ক্ষেত্রে ইমাম দুআ করতেন,其他人 আমিন বলতেন। সবাই একসাথে উচ্চস্বরে দুআ পড়া বা বিশেষ সুরে দুআ পড়া—এটি সাহাবায়ে কেরামের যুগে সাধারণভাবে প্রমাণিত নয়।
(ঘ) দুআকে আনুষ্ঠানিকতা বানানো
যেমন: বয়ান শেষে সবাই দাঁড়িয়ে, হাত তুলে, নির্দিষ্ট সুরে, নির্দিষ্ট সময় ধরে দুআ করা—এবং এটি বর্জন করলে লোকেরা দোষারোপ করে। এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
(ঙ) দুআর মধ্যে শরিয়তবিরোধী বিষয় থাকা
যেমন: গায়রুল্লাহর কাছে dua চাওয়া, মৃত ব্যক্তিকে আহ্বান করা, শরিয়তবিরোধী আকিদা বা বাক্য থাকা—এসব নিষিদ্ধ।
৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে সম্মিলিত দুআ
ইমাম ইবন আবিদিন রহ. বলেন, দুআ ইবাদত; তবে ইবাদতের পদ্ধতি শরিয়ত থেকে নিতে হবে। শরিয়তে যা প্রমাণিত নয়, তা দ্বীনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা বিদআত।
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০; ২/২৬৩)
আল্লামা আশরাফ আলী থানভি রহ. বলেন, ওয়াজ-বয়ানের পর দুআ করা জায়েয; তবে একে বাধ্যতামূলক বা বিশেষ সুন্নত মনে করা যাবে না।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৬০; বেহেশতি জেওর, দুআ অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. বলেন, সম্মিলিত দুআর মূল ভিত্তি হলো: দুআ করা জায়েয, কিন্তু নতুন পদ্ধতিকে দ্বীনি বিধান বানানো নিষিদ্ধ।
(মাআরিফুল কুরআন, সূরা গাফির: ৬০-এর তাফসির)
মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম বলেন, জামাতে দুআর ক্ষেত্রে ইমামের দুআ ও মুক্তাদিদের আমিন বলা সুন্নাহসম্মত; তবে সবাই একসাথে উচ্চস্বরে দুআ পড়া বা নির্দিষ্ট সুরে দুআ পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৪৫; ইসলাহি খুতবাত)
৫. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
মাসতুরাতের তালিমে বয়ান শেষে পুরুষদের সম্মিলিত দুআ কি বিদআত?
- যদি এটি সাধারণভাবে আল্লাহর কাছে দুআ হয়, কোনো বিশেষ সওয়াব বা দ্বীনি বিধান হিসেবে স্থির না করা হয়—তাহলে জায়েয।
- যদি একে তালিমের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ সুন্নত বা বিশেষ সওয়াবের আমল মনে করা হয়—তাহলে বিদআত।
- যদি সবাই একসাথে উচ্চস্বরে, নির্দিষ্ট সুরে, নির্দিষ্ট সংখ্যায় দুআ করে এবং তা বর্জন করলে দোষারোপ করা হয়—তাহলে বিদআতের আশঙ্কা।
- যদি ইমাম/বক্তা দুআ করেন এবং উপস্থিতরা আমিন বলেন—তাহলে জায়েয, বরং উত্তম।
সারকথা: সম্মিলিত দুআ নিজে বিদআত নয়; বরং তাকে দ্বীনি বিধান বানানো, নির্দিষ্ট পদ্ধতি আবিষ্কার করা এবং সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতির বিপরীত করা বিদআত। সাধারণভাবে দুআ করা জায়েয।
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
- বয়ান শেষে দুআ করা যাবে; তবে একে বাধ্যতামূলক বা বিশেষ সুন্নত মনে করা যাবে না।
- সবাই একসাথে উচ্চস্বরে দুআ না পড়ে, ইমাম/বক্তা দুআ করলে উপস্থিতরা আমিন বলা উত্তম।
- দুআয় শরিয়তসম্মত বিষয় থাকতে হবে; কোনো গায়রুল্লাহর কাছে দুআ বা শরিয়তবিরোধী আকিদা থাকা যাবে না।
- দুআকে আনুষ্ঠানিকতা বা লোক দেখানো আমলে পরিণত করা যাবে না।
- মাসতুরাতের তালিমে পুরুষদের উপস্থিতি ও দুআর ব্যবস্থাপনায় পর্দা ও শরিয়তের সীমা রক্ষা করতে হবে।
৭. দুআর ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ
“বান্দার দুআ ততক্ষণ কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ সে গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দুআ না করে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)
অতএব, দুআর মূল বিষয় হলো: আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে চাওয়া, শরিয়তসম্মত বিষয় চাওয়া এবং পদ্ধতিতে সুন্নাহ অনুসরণ করা।
উপসংহার:
মাসতুরাতের তালিমে বয়ান শেষে পুরুষদের সম্মিলিত দুআ নিজে বিদআত নয়; বরং সাধারণভাবে জায়েয। তবে একে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ সুন্নত বা নির্দিষ্ট সওয়াবের আমল বানানো, নির্দিষ্ট পদ্ধতি আবিষ্কার করা এবং সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতির বিপরীত করা বিদআত। উত্তম পদ্ধতি হলো: ইমাম/বক্তা দুআ করবেন, উপস্থিতরা আমিন বলবেন; সবাই একসাথে উচ্চস্বরে দুআ পড়া থেকে বিরত থাকবেন।
والله أعلم بالصواب