- হুরমত নিয়ে সন্দেহ হলে করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
তবে আমি সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করলেও কুচিন্তা ও শারীরিক উত্তেজনা চলে যায়নি। আমি সেগুলোতে পাত্তা দিইনি, কিন্তু তারপরও সেগুলো অব্যাহত ছিল। পরে কুচিন্তা ও উত্তেজনা চলতে থাকায় আমি অন্য একটি মেয়েকে কল্পনায় নিয়ে আসি। আমার উদ্দেশ্য ছিল কুচিন্তা ও উত্তেজনা অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া। এ কারণে আমার খুবই খারাপ লেগেছিল।
পরে আমি হুরমতে মুসাহারাত সম্পর্কে জানার পর থেকে আমার মাকে স্পর্শ করতে ভয় লাগে। আমি তাঁকে স্পর্শ করা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। একদিন আমার মা ডাক্তারের কাছে যাবেন বলে ঠিক হয়েছিল। আমার তাঁর সঙ্গে বাইকে পেছনে বসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন আমি তাঁকে পরে যেতে বলি। মূলত, আমি তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটেছে।
বর্তমানে আমি বিদেশে থাকি। দেশে ফিরে গেলে আমার মা আবেগের বশে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারেন—এই আশঙ্কায়ও আমি ভয় পাই।
এর আগেও অনেকবার আমার মাকে দেখলে বা এমনিতেই আমার মাথায় কুচিন্তা এসেছে। এসব চিন্তার কারণে আমি খুবই কষ্ট পাই। আমি মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ি এবং এ নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করি যে, আমার মাথায় এ ধরনের চিন্তা কেন আসে।
2. একদিন আমার শাশুড়ি কান্নাকাটি করছিলেন। তখন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আমি তাঁর হাত ধরে তাঁর পায়ের ওপর আমার হাত রেখে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি, যেন তিনি কান্না না করেন। তখন আমার হাত ছিল তাঁর হাঁটুর ওপর, তার ওপর ছিল তাঁর হাত এবং সবার ওপরে ছিল আমার আরেকটি হাত। এ সময় আমার স্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল।
আরেক দিনও আমার শাশুড়ি কান্নাকাটি করছিলেন। তখন আগের মতোই আমি তাঁর হাত ধরে তাঁর পায়ের ওপর রেখে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি, যেন তিনি কান্না না করেন। সে সময়ও আমার স্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিল।
আরেক দিন আমি অসুস্থ ছিলাম। তখন আমার স্ত্রী আমার মাথায় পানি ঢালছিল এবং আমার শাশুড়ি আমার মাথার চুলের মধ্যে আঙুল দিয়ে দিচ্ছিলেন।
Answer
প্রশ্নোক্ত বিষয়গুলোর শরয়ি সমাধান
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
আপনার মনের গভীর ব্যাকুলতা, কষ্ট এবং ওয়াসওয়াসাজনিত মানসিক অস্থিরতা অনুধাবন করতে পারছি। আপনার বর্ণিত ১ ও ২ নম্বর ঘটনার প্রতিটি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট শরয়ী ফায়সালা ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের সিদ্ধান্ত ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় উপস্থাপন করা হলো:
১ নম্বর ঘটনার ফায়সালা (মায়ের তেল মালিশ, অনিচ্ছাকৃত চিন্তা ও দূরীকরণে অন্য নারীর কল্পনা):
- শরয়ী সিদ্ধান্ত: ১. মায়ের তেল মালিশের সময় যে শারীরিক উত্তেজনা বা কুচিন্তা এসেছিল, তা যেহেতু আপনার সম্পূর্ণ ইচ্ছার বাইরে ছিল (ওয়াসওয়াসা), এবং আপনি তা দূর করার চেষ্টা করেছিলেন—এর দ্বারা মা-ছেলের সম্পর্কের পবিত্রতায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটেনি এবং কোনো হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয়নি । ২. উত্তেজনা অন্যদিকে সরানোর উদ্দেশ্যে অন্য কোনো পরনারীকে (বান্ধবী/মেয়েকে) কল্পনা করার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও, এর দ্বারাও মায়ের ক্ষেত্রে কোনো হুরমতে মুসাহারা হয়নি। ৩. আপনার ও আপনার স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ সহীহ ও বহাল রয়েছে । মাকে স্পর্শ করা এড়িয়ে চলা, বাইকে না নেওয়া বা জড়িয়ে ধরার ভয়ে থাকা সম্পূর্ণ ভুল ও অহেতুক শয়তানি ওয়াসওয়াসা; আপনার মায়ের সেবা করা ও স্বাভাবিক মেলামেশা করা সম্পূর্ণ জায়েয ও ওয়াজিব।
- ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
- ওয়াসওয়াসা ও অনিচ্ছাকৃত চিন্তা: ইসলামি শরীআতে অনিচ্ছাকৃত কুচিন্তা বা অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক উত্তেজনার ওপর মানুষের কোনো হাত থাকে না। শরীআতের নিয়ম হলো—অনিচ্ছাকৃত ওয়াসওয়াসার কারণে কোনো বিধান সাব্যস্ত হয় না এবং কোনো গুনাহও লেখা হয় না।
- অন্য নারীকে কল্পনা করা: অহেতুক চিন্তা বা উত্তেজনাকে মা থেকে সরানোর জন্য অন্য সাধারণ নারীকে কল্পনায় আনা যদিও একটি মানসিক চেষ্টা ছিল, কিন্তু ফিকহের দৃষ্টিতে হুরমতে মুসাহারা কেবল তখনই সাব্যস্ত হয়, যখন নির্দিষ্ট মাহরামের (যেমন মায়ের) প্রতি সরাসরি কামভাব বা যৌন কামনা নিয়ে স্পর্শ করা হয়। অন্য নারীর কল্পনার দ্বারা মায়ের সাথে হুরমত হওয়ার কোনো সুযোগ ফিকহে হানাফীতে নেই ।
- অহেতুক ভীতি ও ওয়াসওয়াসা দূরীকরণ: ফিকহের অকাট্য মূলনীতি—«اليقين لا يزول بالشك» (সুনিশ্চিত সম্পর্ক কেবল অহেতুক সন্দেহের দ্বারা বাতিল হয় না)। তাই দেশে ফিরে মায়ের সাথে সাধারণ সন্তানের মতো স্বাভাবিক আচরণ করবেন, জড়িয়ে ধরলে জড়িয়ে ধরবেন; শয়তানের এ জাতীয় ওয়াসওয়াসাকে ১০০% উপেক্ষা (Ignore) করবেন।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (অধ্যায়: মা ইয়াতা'আল্লাকু বিল ঈমান — অনিচ্ছাকৃত ওয়াসওয়াসা ও অহেতুক চিন্তার শরয়ী হুকুম)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৫ (অধ্যায়: বাব মা يتعلق بالجنات — মানসিক ওয়াসওয়াসা এবং তা থেকে বাঁচার উপায়)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৪৬ & ১৮১ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারাত — স্পর্শের সময় কামভাব আবশ্যক হওয়া এবং অহেতুক সন্দেহে বিবাহ/সম্পর্ক নষ্ট না হওয়া)।
২ নম্বর ঘটনার ফায়সালা (শাশুড়ির হাত ধরা, হাঁটুতে হাত রাখা ও মাথায় হাত বুলানো):
- শরয়ী সিদ্ধান্ত: শাশুড়ি কান্নাকাটি করার সময় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর হাত ধরে হাঁটুতে হাত রাখা কিংবা অসুস্থ অবস্থায় শাশুড়ি মাথায় আঙুল দিয়ে সেবা করে দেওয়ার কারণে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হয়নি এবং হুরমতে মুসাহারা হয়নি । আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পূর্বের ন্যায় শতভাগ বৈধভাবে সংসার চালিয়ে যাবেন ।
- ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
- কামভাব বা যৌন উত্তেজনার অনুপস্থিতি: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাশুড়ির শরীর বা মাথা স্পর্শ করার দ্বারা 'হুরমতে মুসাহারা' (স্ত্রীর সাথে বিবাহ হারাম হওয়া) সাব্যস্ত হওয়ার জন্য স্পর্শের ঠিক ওই মুহূর্তে সরাসরি কামভাব বা যৌন উত্তেজনা (شهوة) থাকা অকাট্য শর্ত ।
- স্নেহ ও সেবামূলক স্পর্শ: শাশুড়িকে কান্নার সময় সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা অসুস্থ অবস্থায় মাথায় আঙুল দিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ স্নেহ, শ্রদ্ধা ও মানবিক সেবামূলক কাজ । যেহেতু সেখানে আপনার বা আপনার শাশুড়ির কারো মনেই কোনো যৌন প্রবৃত্তি বা কামভাব ছিল না, তাই ফিকহের বিচারে এতে কোনো হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না ।
- সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৪৮ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারাত: জটিলতা ও সমাধান — স্নেহের বশে বা সান্ত্বনা দিতে স্পর্শ করলে হুরমত না হওয়া) ।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব ওয়াল ইস্তিজান — অসুস্থতা বা সান্ত্বনার সময়ে স্বাভাবিক স্পর্শে হুরমত না হওয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭৪–২৭৫ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, মাহরাম ও হুরমতে মুসাহারা পরিচ্ছেদ)।
ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বিশেষ নসীহত:
আপনি মূলত 'ওয়াসওয়াসা' (Obsessive Compulsive Thoughts) নামক মানসিক ও শয়তানি চক্রে আটকে গেছেন। শয়তান পবিত্র মন ও দ্বীনদার মানুষদের মনেই এসব জঘন্য চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে চায়।
এটি থেকে বাঁচার ৩টি গোল্ডেন রুল: ১. একদম চিন্তা করবেন না: মনে কোনো বাজে চিন্তা বা শারীরিক অনুভূতি হলেও ভাববেন "এটি শয়তানের চক্রান্ত, আমার মনের ইচ্ছা নয়"। ২. তর্ক বা ফতোয়া খোঁজা বন্ধ করুন: আপনার মা ও শাশুড়ি সংক্রান্ত বিষয়ে ফতোয়া নেওয়া পুরোপুরি শেষ। আর কখনো এসব পুরনো স্মৃতি মনে করে নতুন করে প্রশ্ন বা সন্দেহ তৈরি করবেন না [১৯৫]। ৩. মাসনুন দুআ: মনে কুচিন্তা এলেই মুখে পাঠ করবেন— «أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» এবং «آمَنْتُ بِاللهِ وَرُسُلِهِ» (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনলাম) পড়ে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন ।
আল্লাহ ভালো জানেন।