মা-বাবাকে সহবাস করতে দেখা বা মায়ের রাগের মাথায় বলা কথায় কি হুরমত সৃষ্টি হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
2. একদিন আমার মা রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছিলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আব্বা মাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলেন। তখন মা রাগের মাথায় বলেছিলেন, “সবাইকে গিয়ে বলো, সায়রা (আমার আম্মা) ইউসুফের (আমি) সঙ্গে বেরিয়ে গেছে।” তিনি আরও কিছু কথা বলেছিলেন, যা এখন আমার মনে নেই। এখন আমার মনে সন্দেহ হচ্ছে, মা রাগের মাথায় এমন কোনো কথা বলেননি তো যে, “ইউসুফই আমার স্বামী।”তখন আমার বয়স কত ছিল, তা-ও ঠিক মনে নেই।
এ পর্যন্ত আমার এগুলোই মনে পড়ছে। এর আগে আরও কিছু কথা মনে হয়েছিল, যেগুলো আমি আপনাদের এখানে জিজ্ঞাসা করেছি। ভবিষ্যতে যদি আবার নতুন কোনো কথা মনে পড়ে, তাহলে আমার কী করণীয় হবে? বারবার নতুন নতুন proshnoমনে আসার কারণে আমি খুব দুশ্চিন্তায় থাকি।
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
আপনার মনের অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক কষ্টের বিষয়টি আমরা অনুধাবন করতে পারছি। আপনার উল্লেখিত বিষয়গুলো মূলত শয়তানের সৃষ্টি করা অহেতুক ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ ও কুচিন্তা)। ইসলামি শরীআত ও হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য মূলনীতির আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ আপনার প্রতিটি পয়েন্টের স্পষ্ট উত্তর ও সমাধান নিচে দেওয়া হলো:
১. ছোটবেলায় মা-বাবাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে দেখে ফেলা সংক্রান্ত মাসআলা:
- শরয়ী সিদ্ধান্ত: ছোটবেলায় না বুঝে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মা-বাবার সহবাসের দৃশ্য দেখে ফেলার কারণে আপনার বিন্দুমাত্র কোনো গুনাহ হয়নি এবং এর জন্য শরীআতে কোনো পাকড়াও নেই ।
- ফিকহী ব্যাখ্যা: অবুঝ বয়সের কোনো দেখা বা অনিচ্ছাকৃত নজর পড়ার দ্বারা ঈমান, আমল বা পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতায় কোনো প্রকার ব্যাঘাত ঘটে না [১৯৫]। এটি নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা চিন্তার কোনো কারণ নেই ।
২. মায়ের রাগের মাথার কথা ও "ইউসুফই আমার স্বামী" জাতীয় কাল্পনিক সন্দেহের ফায়সালা:
- শরয়ী সিদ্ধান্ত: আপনার মনে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে—"মা এমন কথা বলেননি তো..."—এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও শয়তানের সৃষ্টি করা কাল্পনিক ওয়াসওয়াসা [২৫, ১০৩]। এর দ্বারা আপনার পরিবার, ঈমান বা সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হয়নি।
- ফিকহী ব্যাখ্যা:
১. সন্দেহ দ্বারা মূল বিধান বদলায় না: ফিকহে হানাফীর অকাট্য মূলনীতি হলো—«اليقين لا يزول بالشك» (অর্থাৎ, কেবল সন্দেহ বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সুনিশ্চিত শরয়ী বিধান বা সম্পর্ক বাতিল হয় না) ।
২. মা-ছেলের সম্পর্কের স্থায়িত্ব: মা ও ছেলের রক্ত সম্পর্কিত স্থায়ী 'মাহরাম' সম্পর্ক জন্মগত ও অকাট্য। মা রাগের মাথায় মুখে যা-ই বলুক না কেন (বা আপনার মনে যে কাল্পনিক ধারণাই আসুক না কেন), জন্মদাত্রী মা কখনো স্ত্রী হতে পারেন না এবং এই সম্পর্ক পৃথিবীর কোনো কথায় পরিবর্তিত হয় না।
৩. ভবিষ্যতে নতুন কথা মনে পড়লে করণীয় ও দুশ্চিন্তা দূর করার স্থায়ী উপায়:
বারবার নতুন নতুন পুরনো কথা মনে আসা এবং তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়াটি শয়তানের বিশেষ চক্রান্ত (ওয়াসওয়াসা), যাতে সে আপনাকে ইবাদত ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রাখতে পারে । এর স্থায়ী সমাধান নিচে দেওয়া হলো:
১. সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা (التجاهل التام): ভবিষ্যতে অতীতের বা ছোটবেলার অস্পষ্ট কোনো কথা বা দৃশ্য মনে উঠলে তা একেবারেই পাত্তা দেবেন না এবং সে বিষয়ে কাউকে আর নতুন করে কোনো প্রশ্ন করবেন না। মনে রাখবেন, অতীতের ঐসব অস্পষ্ট স্মৃতির কোনো শরয়ী মূল্য ইসলামে নেই।
২. জিজ্ঞাসা করার অভ্যাস বন্ধ করা: বারবার মনে প্রশ্ন আসা এবং তা কোথাও জিজ্ঞাসা করে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করলে ওয়াসওয়াসা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই মনের ভেতর যতই সন্দেহ আসুক, ধরে নেবেন এটি শয়তানের ধোঁকা এবং তৎক্ষণাৎ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
৩. সুন্নাহসম্মত দুআ ও আমল: যখনই মনে এমন অহেতুক সন্দেহ বা কাল্পনিক প্রশ্ন উঁকি দেবে, তখন পড়া বন্ধ করে দেবেন এবং মুখে বলবেন:
«آمَنْتُ بِاللهِ وَرُسُلِهِ» (অর্থ: আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনলাম)
এবং «أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» পড়ে থুতু ফেলার মতো বাঁ দিকে ইশারা করে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (অধ্যায়: মা ইয়াতা'আল্লাকু বিল ঈমান): (শয়তানের সৃষ্টি করা ওয়াসওয়াসা ও অহেতুক সন্দেহের কারণে ঈমান বা আমলের ক্ষতি না হওয়া এবং তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার প্রামাণ্য হুকুম)।
- ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫ (অধ্যায়: বাব মা يتعلق بالجنات): (মানুষের অন্তরে শয়তানি কুচিন্তা ও সন্দেহ সৃষ্টি এবং তা থেকে বাঁচার সুন্নাহসম্মত উপায়)।
- ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০৩ (অধ্যায়: বাবুল ইমামাহ): (অহেতুক অনুমান ও সন্দেহের ওপর শরীআতের কোনো ফায়সালা নির্ভর না হওয়া)।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ১৩৮ (পরিচ্ছেদ: ফি শক্কি — সন্দেহের বিবরণ): (অহেতুক ও পরবর্তী সন্দেহের কোনো শরয়ী اعتبار বা মূল্য না থাকা)।
৩. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮১ & ৩৬০ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারা ও অনুমানের শরয়ী অবস্থান): (নিছক অনুমানের ভিত্তিতে শরয়ী সম্পর্ক বা বিধান পরিবর্তন না হওয়া)।
৪. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৭৪ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, মাহরামের বিবরণ): (মা-ছেলের চিরন্তন মাহরাম সম্পর্ক ও তার অবিনশ্বরতা)।
আল্লাহ ভালো জানেন।