শাশুড়ির গালে চুমু, নন-মাহরামকে গোসল করানো ও ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7283
Questioner: Md Yousuf Ali
Question Asked: 23 Oct 2026, 07:52 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 09:29 AM
Views: 22
Tokens: 7,634
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

1. একদিন আমি আমার দাদি শাশুড়ির গালে চুমু দিয়েছিলাম। সে সময় আমার স্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল। আমি, আমার দাদি শাশুড়ি এবং আমার স্ত্রী—আমরা সবাই হাসছিলাম। আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।
2. হুরমতে মুসাহারাতের বিষয়টি জানার পর থেকে আমি ভয়ের কারণে আমার মায়ের কাছে বা পাশে যেতে পারি না। কারণ, আমার মনের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত নানা চিন্তা আসে। এমনকি আমার মাকে মোটরসাইকেলে করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেও ভয় লাগে।
3. একদিন আমার স্ত্রী আমার নানাকে গোসল করিয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত, সেখানে আমার মাও উপস্থিত ছিলেন। পরে আমি আমার নানাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, গোসল করানোর সময় তাঁর শরীরে কোনো উত্তেজনা অনুভূত হয়েছিল কি না বা কোনো খারাপ চিন্তা এসেছিল কি না। তিনি বলেছিলেন, এমন কিছুই হয়নি।
4.3. এর আগে আমি হুজুরের কাছে তালাকের বিষয়ে ফতোয়া নিয়েছি। কিন্তু ফতোয়া নেওয়ার পর আবার নতুন নতুন কথা মনে পড়ে এবং সেগুলো নিয়ে সন্দেহ ও আশঙ্কা তৈরি হয়। বারবার এমন হয়। আমার মনে আশঙ্কা থাকে যে, একটি প্রশ্নের উত্তর জানার পর আবার অন্য কোনো নতুন বিষয় মনে পড়বে এবং সে বিষয়ে আবার প্রশ্ন করার প্রয়োজন অনুভব করব। এ ক্ষেত্রে আমার কী করণীয়?

Answer

ফতোয়া: হুরমতে মুসাহারাত, চুমু, গোসল করানো ও ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নের চারটি অংশ রয়েছে। প্রতিটির উত্তর নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। প্রথমেই একটি মূল বিষয় স্পষ্ট করে নিন: হুরমতে মুসাহারাত (শ্বশুর-শাশুড়ি ও সন্তানের স্ত্রী-জামাতার মধ্যে বিবাহ-নিষিদ্ধতা) কেবল তখনই সাব্যস্ত হয়, যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ-নারী পরস্পরের প্রতি شهوة (কাম-উত্তেজনা) নিয়ে স্পর্শ বা দৃষ্টিপাত করে। নিছক স্নেহ-ভালোবাসা, হাসি-ঠাট্টা বা নিরুদ্দেশ চুমুতে এটি সাব্যস্ত হয় না। এই মূলনীতি মনে রাখলে আপনার অধিকাংশ সংশয় দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।


১. দাদি শাশুড়ির গালে চুমু দেওয়া সংক্রান্ত ফায়সালা:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত:
    দাদি শাশুড়ির গালে স্নেহের বশে বা হাসিখুশি অবস্থায় চুমু দেওয়ার কারণে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হয়নি এবং হুরমতে মুসাহারা (বিবাহ হারাম হওয়া) সাব্যস্ত হয়নি। আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্বের ন্যায় শতভাগ সহীহ ও বহাল রয়েছে।

  • ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
    ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, শাশুড়ি বা দাদি শাশুড়িকে স্পর্শ করা বা চুমু দেওয়ার দ্বারা 'হুরমতে মুসাহারা' (যার ফলে স্ত্রীর সাথে বিবাহ ভেঙে যায়) সাব্যস্ত হওয়ার জন্য স্পর্শ/চুমুর ঠিক ওই মুহূর্তে কামভাব বা যৌন উত্তেজনা (شهوة) থাকা বাধ্যতামূলক শর্ত।
    যেহেতু আপনার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য বা কামভাব ছিল না; বরং সাধারণ পরিবারের হাসিখুশি ও শ্রদ্ধার পরিবেশে এ ঘটনা ঘটেছে, তাই ফিকহের বিচারে কোনো হুরমত হয়নি ।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

    1. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৪৬ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারাত: কিছু জটিলতা ও সমাধান — কামভাব সহকারে স্পর্শ করার শর্তাবলী এবং স্পর্শের সময় উত্তেজনা থাকা আবশ্যক হওয়ার অকাট্য নিয়ম)।
    2. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭৪–২৭৫ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, মাহরাম ও হুরমতে মুসাহারা পরিচ্ছেদ)।
    3. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব ওয়াল ইস্তিজান — বয়স্ক বা সম্মানীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে কামভাব ছাড়া স্বাভাবিক চুমু বা স্পর্শে হুরমত না হওয়া)।

২. মায়ের পাশে যেতে ভয় পাওয়া ও অনিচ্ছাকৃত চিন্তার ফায়সালা:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত:
    মায়ের ব্যাপারে মনে আসা অনিচ্ছাকৃত চিন্তা বা ভয় সম্পূর্ণ শয়তানি ওয়াসওয়াসা। এর দ্বারা আপনার কোনো গুনাহ হবে না এবং মা-ছেলের সম্পর্কের পবিত্রতায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটবে না। মায়ের থেকে দূরে থাকা বা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে ভয় পাওয়া সম্পূর্ণ ভুল ও অনুচিত; আপনাকে স্বাভাবিকভাবে মায়ের খেদমত করে যেতে হবে।

  • ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
    ১. নিজের জন্মদাত্রী মা হলেন চিরন্তন 'আবাদী মাহরাম'। মানুষের অন্তরে অনিচ্ছাকৃত যেসব কুচিন্তা বা অহেতুক ভয় শয়তান নিক্ষেপ করে (যার ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না), ইসলামি শরীআতে তার কোনো প্রভাব বা ফায়সালা নেই।
    ২. ফিকহের অকাট্য মূলনীতি হলো—«اليقين لا يزول بالشك» (সুনিশ্চিত সম্পর্ক বা বিধান অহেতুক সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না)। তাই মনে যতই অনিচ্ছাকৃত বাজে চিন্তা আসুক না কেন, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা (Ignore) করে মায়ের পাশে যাবেন এবং তার সেবা করবেন।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

    1. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (অধ্যায়: মা ইয়াতা'আল্লাকু বিল ঈমান — অনিচ্ছাকৃত ওয়াসওয়াসা ও কুচিন্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার শরয়ী হুকুম)।
    2. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৫ (অধ্যায়: বাব মা يتعلق بالجنات — শয়তানের সৃষ্টি করা মানসিক ওয়াসওয়াসা এবং তা থেকে বাঁচার উপায়)।
    3. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮১ & ৩৬০ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারা ও অনুমানের শরয়ী অবস্থান — অহেতুক সন্দেহের ওপর কোনো ফায়সালা নির্ভর না হওয়া)।

৩. স্ত্রীকে দিয়ে নানাকে গোসল করানো সংক্রান্ত ফায়সালা:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত:
    আপনার স্ত্রী আপনার বৃদ্ধ নানাকে গোসল করিয়ে দেওয়ার দরুন আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কে বা স্ত্রীর সাথে আপনার বিবাহবন্ধনে কোনো প্রভাব পড়েনি।

  • ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
    এখানেও ফিকহের মূলনীতি একই। সেবা করার উদ্দেশ্যে গোসল করানোর সময় যদি নানার অন্তরে কোনো প্রকার যৌন উত্তেজনা বা খারাপ চিন্তা না এসে থাকে (যেটি আপনার নানা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন), তবে এতে 'হুরমতে মুসাহারা' সাব্যস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই । তাই আপনারা নিশ্চিন্তে বৈবাহিক জীবন পরিচালনা করুন।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

    1. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৪৫–১৪৬ (অধ্যায়: হুরমতে মুসাহারাত — সেবা করার সময় উত্তেজনা না থাকলে হুরমত সাব্যস্ত না হওয়া)।
    2. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: অসুস্থ বা বৃদ্ধের খেদমতে স্বাভাবিক স্পর্শে হুরমত না হওয়া)।

৪. ফতোয়া নেওয়ার পর বারবার নতুন সন্দেহ ও অহেতুক আশঙ্কার স্থায়ী সমাধান:

বারবার নতুন কথা মনে পড়া, অতীতের কথা নিয়ে খটকা লাগা এবং মনে করা যে "আবার ফতোয়া নিতে হবে"—এটি শয়তানের একটি বিশেষ জাল বা চক্রান্ত (Obsessive Doubts/Waswasah), যা মানুষকে ইবাদত ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

এই ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য আপনাকে ৩টি কাজ স্থায়ীভাবে মেনে চলতে হবে:

১. নতুন প্রশ্ন বা ফতোয়া চাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা:
একবার যখন আলেম/মুফতি সাহেবের কাছ থেকে ফতোয়া নেওয়া হয়ে গেছে, এরপর অতীতের বিষয়ে যতই নতুন কথা মনে পড়ুক বা সন্দেহ আসুক, তা নিয়ে আর কারো কাছে প্রশ্ন করবেন না এবং নতুন ফতোয়া খুঁজবেন না। কারণ আপনি যতবার প্রশ্ন করবেন, শয়তান ততবার নতুন সন্দেহ তৈরি করবে।

২. অতীতের সব স্মৃতির ওপর 'অকার্যকর' হুকুম দেওয়া:
ফিকহের মূলনীতি হলো—পরবর্তী সময়ে জেগে ওঠা অস্পষ্ট স্মৃতি বা সন্দেহের শরীআতে কোনো মূল্য নেই । আপনার পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ সহীহ ও স্থায়ী । তাই মনে মনে বলবেন: "আমার ফতোয়া নেওয়া শেষ, আর কোনো প্রশ্ন নেই।"

৩. সুন্নাহসম্মত মাসনুন আমল:
যখনই মনে এমন অহেতুক সন্দেহ বা পুরনো কথা উঁকি দেবে, তখন পড়া বা ভাবা বন্ধ করে মুখে পাঠ করবেন:

«آمَنْتُ بِاللهِ وَرُسُلِهِ» (অর্থ: আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের ওপর ঈমান আনলাম)
এবং «أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» পড়ে বাঁ দিকে ইশারা করে থুতু ফেলার মতো ফুঁ দেবেন এবং সাথে সাথে অন্য কোনো বাস্তব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন [১৯৫, ২৫]।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    1. নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা: ১৩৮ (পরিচ্ছেদ: ফি শক্কি — পরবর্তী অহেতুক ও কাল্পনিক সন্দেহের কোনো শরয়ী اعتبار বা মূল্য না থাকা)।
    2. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির অহেতুক প্রশ্ন করা বন্ধ করা ও শয়তানি সন্দেহ উপেক্ষা করার নির্দেশ)।
    3. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৬ (অহেতুক সন্দেহের বশে তালাক সাব্যস্ত না হওয়ার প্রামাণ্য ফতোয়া) ।

والله تعالى أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.