ময়দা ও ভুষি ব্যবসায় উৎপাদন ও মেয়াদ তারিখ না লেখার হুকুম কী?

Business and Job · Hanafi

Question No: 7092
Questioner: Allah Ta'alar Banda
Question Asked: 19 Oct 2026, 12:58 AM
Reviewed & Published: 19 Oct 2026, 06:08 AM
Views: 19
Tokens: 4,625
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি ময়দার মিল চালাই, গম থেকে ময়দার এবং ভুষি উৎপাদন করি। তবে কখনোই মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, উৎপাদন এর তারিখ এসব তথ্য উল্লেখ করি না। কারণ প্রয়োজন হয় না, কাস্টমার পন্য নেয়, শেষ করে আবার অর্ডার দেয়, এভাবেই চলছে। এর মানে এই না যে খারাপ বা নষ্ট পন্য দেয়া হচ্ছে, আমার ব্যবসার ধরন ই এটা, আলহামদুলিল্লাহ কম্প্লেইন আসে না কারণ করার মতো কিছু নেই (যেমন নষ্ট, পচা), তবে গুনগত মান কমবেশি হলে বললে আমি তা ঠিক করে দেই। তবে বাজারে উৎপাদন এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখেই এসব পন্য বেচা কেনা হয়।
এখন আমার ব্যবসা এবং আয় কি হালাল হচ্ছে?

Answer

ময়দা ও ভুষি ব্যবসায় তারিখ উল্লেখ না করার হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী ময়দার মিল চালান। গম থেকে ময়দা ও ভুষি উৎপাদন করেন। পণ্যে উৎপাদন তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করেন না। তাঁর যুক্তি—পণ্য নষ্ট বা পচা নয়, কাস্টমার সন্তুষ্ট, কমপ্লেইন নেই; গুণগত মান কম হলে তিনি ঠিক করে দেন। জানতে চান—এ ব্যবসা ও আয় হালাল কি না?

মূল নীতি (হানাফি ফিকহ)

ইসলামি শরিয়তে ব্যবসার হালাল হওয়ার শর্ত হলো:

  1. পণ্য হালাল ও পবিত্র (তাহির) হওয়া।
  2. পণ্যের অস্তিত্ব ও মালিকানা থাকা।
  3. ক্রেতাকে পণ্যের প্রকৃত অবস্থা জানানো এবং কোনো প্রকার ধোঁকা (গিশ/তাদলিস) না করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ» "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে ধোঁকা (গিশ) করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, পণ্যের এমন কোনো দোষ/ত্রুটি গোপন করা যা ক্রেতা জানলে মূল্য বা ক্রয়-সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে—তা নিষিদ্ধ তাদলিস। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/৫৬২; ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/১২৭)

প্রশ্নের বিশ্লেষণ

১. পণ্য নিজেই হালাল

ময়দা ও ভুষি হালাল ও পবিত্র খাদ্যপণ্য। এগুলো উৎপাদন ও বিক্রয় মূলত হালাল। এতে সন্দেহ নেই।

২. তারিখ উল্লেখ না করা—কী হুকুম?

এখানে দুটি দিক আলাদা করতে হবে:

(ক) শরিয়তের দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক দিক: ইসলামি ফিকহে খাদ্যপণ্যে উৎপাদন/মেয়াদ তারিখ লেখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রীয়/প্রশাসনিক নিয়ম (সরকারি আইন) ও ভোক্তা-সুরক্ষার প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সুতরাং শুধু তারিখ না লেখার কারণে ব্যবসা নিজে থেকে হারাম হয়ে যায় না।

(খ) ধোঁকা ও প্রতারণার দিক: তবে যদি তারিখ না লেখার কারণে ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণায় পড়ে, বা পুরনো/মান কমে যাওয়া পণ্য নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া হয়—তাহলে তা গিশ ও তাদলিসের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং হারাম হবে।

প্রশ্নকারীর বর্ণনা অনুযায়ী:

  • তিনি নষ্ট বা পচা পণ্য দেন না।
  • গুণগত মান কম হলে জানালে ঠিক করে দেন।
  • কাস্টমার সন্তুষ্ট, কমপ্লেইন নেই।

এ অবস্থায় যদি সত্যিই কোনো ধোঁকা না থাকে এবং ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত মান সম্পর্কে অবগত থাকে বা জানলে অসন্তুষ্ট না হয়—তাহলে মূল ব্যবসা ও আয় হালাল থাকবে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, তাদলিস নিষিদ্ধ那是因为 তাতে ক্রেতার ক্ষতি ও প্রতারণা রয়েছে; ক্ষতি ও প্রতারণা না থাকলে তা নিষিদ্ধ তাদলিসের অন্তর্ভুক্ত নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/৫৬২)

৩. সতর্কতার দিক

তবে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

  1. সরকারি আইন: বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদ তারিখ লেখা সংক্রান্ত সরকারি বিধান থাকলে তা মানা মুসলিম নাগরিক হিসেবে কর্তব্য। শরিয়তে "আমিরের আনুগত্য" (যা গুনাহ নয়) পালনীয়। (সূরা নিসা: ৫৯)
  2. মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য: ময়দা দীর্ঘদিন রাখলে তার গুণাগুণ কমে, পোকা বা দুর্গন্ধ হতে পারে। যদি কোনো ব্যাচ পুরনো হয়ে যায় এবং আপনি তা না জানিয়ে নতুন বলে বিক্রি করেন—তা হারাম। প্রশ্নে আপনি বলেছেন এমন হয় না; এ নিয়ত ও বাস্তবতা বজায় রাখতে হবে।
  3. লেবেলিং: ক্রেতা যদি তারিখ জানতে চায়, তা গোপন করা বা মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ। (সহিহ মুসলিম: ১০১)
  4. ভুষির ক্ষেত্রে: ভুষি সাধারণত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়; এখানে মেয়াদ বিষয়ক ঝুঁকি কম, তবে নষ্ট/পচা ভুষি পশুখাদ্য হিসেবে বিক্রি করাও ঠিক নয়।

ফাতাওয়া (সিদ্ধান্ত)

  1. ময়দা ও ভুষি উৎপাদন ও বিক্রয় মূলত হালাল; এ ব্যবসা ও আয় হালাল।
  2. শুধু উৎপাদন/মেয়াদ তারিখ না লেখা—যদি তাতে কোনো ধোঁকা, প্রতারণা বা ক্রেতার ক্ষতি না হয় এবং পণ্য প্রকৃতপক্ষে ভালো থাকে—তাহলে তা ব্যবসাকে হারাম করে না।
  3. তবে শর্ত: কোনো পুরনো, গুণগত মান কমে যাওয়া বা নষ্ট পণ্য নতুন/ভালো বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না; ক্রেতাকে প্রকৃত অবস্থা জানাতে হবে। এ শর্ত ভঙ্গ হলে আয় হারাম হবে।
  4. সরকারি বিধান থাকলে তারিখ উল্লেখ করা উচিত ও কর্তব্য; এটি দ্বীনি দায়িত্বের অংশ।

এমতাবস্থায় মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখের পর কোনো পন্য বিক্রয় করা যাবেনা।

  1. উত্তম ও সর্বোচ্চ সততার পথ হলো—স্বেচ্ছায় উৎপাদন ও মেয়াদ তারিখ উল্লেখ করা, যাতে ক্রেতার কোনো বিভ্রান্তি না থাকে এবং ব্যবসায় বরকত বাড়ে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «الْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا، فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُورِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا»—"ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বললে ও (পণ্যের দোষ) স্পষ্ট করলে তাদের বিক্রয়ে বরকত দেওয়া হয়।" (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)

সংক্ষেপে: আপনার ব্যবসা ও আয় হালাল, তবে সততা ও ধোঁকামুক্ত থাকার শর্তে; এবং সরকারি নিয়ম মানার চেষ্টা করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.