জামাতে এশার নামাজে ইমামের কিরাত এবং রাকাতসংক্রান্ত ভুলের বিধান জানতে চাই।
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
হুজুর, আমি দুটি মাসআলা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি মাজহাবের আলোকে সঠিক শরয়ি বিধান জানতে চাই।
প্রথম ঘটনা:
একদিন আমি এশার ফরজ নামাজ জামাতে আদায় করছিলাম। ইমাম সাহেব নামাজ শুরু করার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবির দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম রাকাতে তিনি জোরে কিরাত পড়ছিলেন কি না, তা আমার মনে নেই। আমার ধারণা, তিনি হয়তো মনে মনে বা আস্তে কিরাত পড়ছিলেন।
এরপর হঠাৎ একজন মুসল্লি জোরে ‘أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ’ এবং ‘بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ’ পড়ে সূরা ফাতিহার ‘الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ’ থেকে জোরে তিলাওয়াত শুরু করেন।
এ অবস্থায় আমার জানার বিষয়গুলো হলো:
১. এশার ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে ইমাম যদি ভুলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে আস্তে কিরাত পড়েন, তাহলে শরয়ি বিধান কী?
২. ইমামকে সংশোধন করার জন্য কোনো মুক্তাদি নিজে জোরে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতে পারবেন কি? নাকি শুধু ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে সতর্ক করবেন?
৩. ওই মুসল্লির এভাবে জোরে কিরাত পড়ার কারণে জামাতের নামাজের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না? ইমাম ও অন্যান্য মুক্তাদির নামাজের হুকুম কী হবে?
৪. যেহেতু ইমাম আস্তে কিরাত পড়ছিলেন কি না, তা নিয়ে আমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই, শুধু সন্দেহ ছিল—এ অবস্থায় আমাদের নামাজের সহিহ হওয়া সম্পর্কে কী বিধান?
দ্বিতীয় ঘটনা:
এশার চার রাকাত ফরজ নামাজে যদি ইমাম সাহেব ভুলবশত তিন রাকাত পড়ে চতুর্থ রাকাতের পরিবর্তে বসে থাকেন এবং নিজে থেকে চতুর্থ রাকাতে দাঁড়ান না, তাহলে মুক্তাদিদের করণীয় কী?
১. মুক্তাদিরা ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে সতর্ক করার পরও ইমাম যদি দাঁড়াতে ভুলে যান, তাহলে কী করতে হবে?
২. ইমাম যদি সতর্ক করার পরও দাঁড়াতে অস্বীকার করেন বা নামাজ শেষ করে দেন, তাহলে মুক্তাদিদের নামাজের বিধান কী হবে? তাদের কি নামাজ পুনরায় পড়তে হবে?
৩. এ অবস্থায় ইমাম ও মুক্তাদিদের সিজদায়ে সাহু করার বিধান কী?
৪. যদি ইমাম ভুল করে তিন রাকাত পড়েই সালাম ফিরিয়ে দেন, তাহলে মুক্তাদিদের করণীয় কী হবে?
হুজুরের কাছে বিনীত অনুরোধ, প্রতিটি মাসআলার উত্তর হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের দলিলসহ জানালে উপকৃত হব। বিশেষ করে কোন অবস্থায় নামাজ সহিহ হবে, কোন অবস্থায় সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হবে এবং কোন অবস্থায় নামাজ পুনরায় পড়তে হবে—তা স্পষ্ট করে জানালে ভালো হয়।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
জামাতে এশার নামাজে ইমামের কিরাত ও রাকাতসংক্রান্ত ভুলের বিধান
উত্তর (হানাফি মাজহাব অনুযায়ী)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد
ভূমিকা: এশার নামাজে কিরাতের মূল বিধান
হানাফি মাজহাবে এশার ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে ইমামের জন্য জোরে (সিররি নয়, জাহরি) কিরাত পড়া সুন্নত। দলিল:
«وَفِي الْعِشَاءِ يَجْهَرُ فِي الْأُولَيَيْنِ وَيُسِرُّ فِي الْأُخْرَيَيْنِ» — আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত
রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَجْهَرُ فِي الْعِشَاءِ» — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৭৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৯৮
সারকথা: এশার প্রথম দুই রাকাতে জোরে কিরাত পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দেওয়া গুনাহ, তবে নামাজ বাতিল হয় না; ভুলে ছেড়ে দিলে সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব।
প্রথম ঘটনা: ইমাম আস্তে কিরাত পড়লে এবং মুক্তাদি জোরে কিরাত শুরু করলে
প্রশ্ন ১: এশার প্রথম দুই রাকাতে ইমাম যদি ভুলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে আস্তে কিরাত পড়েন, তাহলে বিধান কী?
উত্তর: এক্ষেত্রে সেজদায়ে সাহু আবশ্যক হবে।
«الْجَهْرُ فِي مَوْضِعِ الْإِسْرَارِ وَالْإِسْرَارُ فِي مَوْضِعِ الْجَهْرِ سَهْوٌ يُوجِبُ سَجْدَةَ السَّهْوِ» — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১২৭
প্রশ্ন ২: ইমামকে সংশোধন করার জন্য মুক্তাদি নিজে জোরে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতে পারবেন কি?
**উত্তর: এক্ষেত্রে লোকমা হিসেবে জোড়ে সামান্য তিলাওয়াত করতে পারবে,কিরাআত অব্যাহত রাখবেনা।
মুক্তাদির জন্য ইমামকে সতর্ক করার শরয়ি পদ্ধতি হলো ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা (পুরুষদের জন্য)।
তাই এই পদ্ধতি অবলম্বন করারই পরামর্শ থাকবে।
«مَنْ نَابَهُ شَيْءٌ فِي صَلَاتِهِ فَلْيُسَبِّحْ، فَإِنَّ التَّسْبِيحَ لِلرِّجَالِ» — সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২০৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৪২১
প্রশ্ন ৩: ওই মুসল্লির জোরে কিরাত পড়ার কারণে জামাতের নামাজের ক্ষতি হয়েছে কি? ইমাম ও মুক্তাদির নামাজের হুকুম কী?
উত্তর: মুক্তাদী যদি শুধুমাত্র সামান্য তিলাওয়াত করে লোকা দেয়,তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত নামাজের ক্ষতি হয়নি। এক্ষেত্রে ইমাম মুক্তাদী সকলে নামাজের শেষে সেজদায়ে সাহু আদায় করলে সকলের নামাজ হবে,অন্যথায় পুনরায় উক্ত নামাজ আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন ৪: ইমাম আস্তে কিরাত পড়ছিলেন কি না—এ নিয়ে নিশ্চিত জ্ঞান নেই, শুধু সন্দেহ ছিল—এ অবস্থায় নামাজের সহিহ হওয়া সম্পর্কে বিধান কী?
উত্তর: এ নিয়ে নিশ্চিত জ্ঞান কার নেই? এখানে সন্দেহ কার হচ্ছে?
এতো সংখ্যক মুক্তাদী থাকা সত্ত্বেও সন্দেহের কোনো অপশনই নেই।
দ্বিতীয় ঘটনা: ইমাম তিন রাকাত পড়ে চতুর্থ রাকাতে না দাঁড়ালে
প্রশ্ন ১: মুক্তাদিরা সুবহানাল্লাহ’ বলে সতর্ক করার পরও ইমাম যদি দাঁড়াতে ভুলে যান, তাহলে কী করতে হবে?
উত্তর: মুক্তাদি **আল্লাহু আকবার বলে সকলে দাঁড়িয়ে যাবে। এমতাবস্থায় ইমাম সাহেবও আপনা আপনি তাকবির বলে দাঁড়িয়ে যাবে।
প্রশ্ন ২: ইমাম যদি সতর্ক করার পরও দাঁড়াতে অস্বীকার করেন বা নামাজ শেষ করে দেন, তাহলে মুক্তাদিদের নামাজের বিধান কী? তাদের কি নামাজ পুনরায় পড়তে হবে?
উত্তর:
| অবস্থা | বিধান | |---|---| | ইমাম ভুলে তিন রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে দেন | ইমাম ও মুক্তাদি সবাই নামাজ পুনরায় পড়বেন (কারণ ফরজ রাকাত ছুটে গেছে) | | ইমাম তিন রাকাত পড়ে চতুর্থ রাকাতে না দাঁড়িয়ে বসে থাকেন এবং সালাম ফিরিয়ে দেন | একই বিধান—নামাজ বাতিল, পুনরায় পড়তে হবে | | ইমাম সতর্ক করার পরও না ওঠেন কিন্তু সালাম ফিরান না | মুক্তাদিরা ইমামের সাথে বসে থাকবেন; ইমাম যদি পরে ওঠেন, সবাই চতুর্থ রাকাত পড়বেন |
দলিল:
«وَلَوْ سَلَّمَ الْإِمَامُ عَلَى ثَلَاثِ رَكَعَاتٍ فِي الرَّبَاعِيَّةِ بَطَلَتْ صَلَاتُهُ وَصَلَاةُ الْقَوْمِ» — আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবুল সিজদায়ে সাহু
«إِذَا تَرَكَ الْإِمَامُ رَكْعَةً كَامِلَةً وَسَلَّمَ، فَسَدَتْ صَلَاتُهُ وَصَلَاةُ الْمُقْتَدِينَ» — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১২৮
মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) বলেন: "ফরজ রাকাত ছুটে গেলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়, সিজদায়ে সাহু দ্বারা তা পূরণ হয় না।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৫
প্রশ্ন ৩: এ অবস্থায় ইমাম ও মুক্তাদিদের সিজদায়ে সাহু করার বিধান কী?
উত্তর: এক্ষেত্রে ইমাম ৩ তাসবিহ সমপরিমাণ সময় বসে থাকলে সেজদায়ে সাহু আবশ্যক হবে। যদি তার আগেই উঠে যায়,তাহলে সেজদায়ে সাহু আবশ্যক হবেনা।
প্রশ্ন ৪: যদি ইমাম ভুল করে তিন রাকাত পড়েই সালাম ফিরিয়ে দেন, তাহলে মুক্তাদিদের করণীয় কী?
উত্তর: মুক্তাদি **আল্লাহু আকবার বলে সকলে দাঁড়িয়ে যাবে। এমতাবস্থায় ইমাম সাহেবও আপনা আপনি তাকবির বলে দাঁড়িয়ে যাবে।
ইমাম সাহেব তারপরেও না দাঁড়িয়ে নামাজ শেষ করলে মুক্তাদিরা ইমামের আনুগত্য করে তার সাথে নামাজ শেষ করবে।
পরবর্তীতে পুনরায় উক্ত নামাজ আদায় করবে।