সন্তান হ‌ওয়ার জন্য পান পড়া, কলা পড়া, গাছের শেকড়, ইত্যাদি দ্বারা তাবিজ বানিয়ে কোমড়ে দেওয়া কি জায়েয?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 699
Questioner: Fahmida Binte Anwar
Question Asked: 24 May 2026, 07:34 PM
Reviewed & Published: 24 May 2026, 07:47 PM
Views: 114
Tokens: 3,629
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
সন্তান হ‌ওয়ার জন্য যে গ্ৰামে বা বিভিন্ন স্থানে পান পড়া কলা পড়া গাছের শেকড় তাবিজ বানিয়ে কোমড়ে দেওয়া হয়। এগুলো কি জায়েজ? আর আল্লাহ সন্তান দিবেন এগুলো শুধু ঔষধ এই নিয়তে খেলে?

Answer

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। সন্তান হওয়ার জন্য প্রচলিত কিছু কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন পদ্ধতি সম্পর্কে আপনি জানতে চেয়েছেন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

উত্তরের সংক্ষিপ্তসার:

প্রশ্নে উল্লেখিত "পান-কলা পড়া" বা "গাছের শেকড় তাবিজ বানিয়ে কোমরে বাঁধা"—এ সকল কাজ জায়েজ নয়। এটি বিদআত, কুসংস্কার (খুরাফাত) এবং শিরকের দিকে ধাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আকিদা বিশ্বাস ঠিক রেখে তথা সবকিছুর খালিক ও মালিক আল্লাহ, সেই আকিদা বিশ্বাস রেখে, সেটিকে "ঔষধ" মনে করে খাওয়ার রুখসত কিছু উলামায়ে কেরাম দিয়ে থাকেন। মোটকথা, আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বৈধ দুআ ও জায়েয চিকিৎসা করাই ইসলামের নির্দেশ।


বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল:

১. কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন আমলের নিষিদ্ধতা:

গ্রামে বা বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত এই ধরনের আমল (যেমন—নির্দিষ্ট মন্ত্র পড়া, গাছের শেকড় বা অলীক বস্তু ব্যবহার করা) ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এগুলো আরব্য জাহেলিয়াতের সময়ের কুসংস্কার, যা ইসলাম বাতিল করে দিয়েছে।

  • হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

    "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে (বিদআত করে) যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত (গ্রহণযোগ্য নয়)।" (সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)

  • হাদীস: তিনি আরও বলেন:

    "তোমরা কুসংস্কার (তিয়ারা, ফাল-নেগেটিভ) থেকে বেঁচে থাকো।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৯১০)

এই হাদীসগুলোর আলোকে, পান-কলা পড়া ও গাছের শেকড় ব্যবহার করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।

২. তাবিজ ও ঝাড়-ফুঁকের বিধান:

ইসলামে তাবিজের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। শুধুমাত্র কুরআন ও হাদীসের বর্ণিত দুআ-কালাম লেখা তাবিজ (বিনা শর্তে বিশ্বাস না করে শুধু মাধ্যম মনে করে) ব্যবহার করার অনুমতি কিছু হানাফী আলেম দিয়েছেন, তবে সেটিও আধুনিক যুগে বিভিন্ন শিরকী বিশ্বাসের কারণে নিরুৎসাহিত।

  • হানাফী ফতোয়ার কিতাব: ফতোয়ায়ে আলমগীরী ও রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে, যে তাবিজ কুরআনের আয়াত বা হাদীসের দুআ দ্বারা লিখিত এবং তাতে কোনো শিরকী বিশ্বাস না থাকে, তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েয আছে। কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত "পান-কলা পড়া" বা "গাছের শেকড়" এসবে যদি কুরআন-হাদীসের কোনো দুআ না থাকে; তাহলে তা অন্ধবিশ্বাস ও জাদুটোনার পর্যায়ে পড়বে তখন জায়েয হবে না।

  • মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "তাবিজের আকারে কুরআনের আয়াত লিখে ব্যবহার করা জায়েয, তবে এটাকে নিজে নিজে ফলদাতা না মনে করে আল্লাহর মাধ্যম মনে করতে হবে। কিন্তু অমুক গাছের শেকড়, অমুক মন্ত্র—এগুলো সবই হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।" (মা'আরিফুল কুরআন)

৩. শিরকের সম্ভাবনা:

এই কাজগুলোতে শিরকের (আল্লাহর সাথে অংশীদার করা) প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ মানুষ মনে করে "এই মন্ত্র", "এই শেকড়" বা "এই পড়া" নিজেই সন্তান দেবে, অথচ সন্তানদাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।

  • কুরআন: আল্লাহ বলেন: "আল্লাহর জন্যই আসমান ও জমিনের রাজত্ব। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০)

৪. শুধু "ঔষধ" নিয়তে খাওয়ার বিধান:

আপনি যদি মনে করেন, "এটা শুধু একটি ঔষধ, আল্লাহই দেবেন"—তাহলেও এটি জায়েয হতে পারে। কারণ ইসলামী চিকিৎসার জন্য যা বৈধ (হালাল), তা-ই ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কুরআন-হাদীসে বর্ণিত দুআ ও জায়েয ভেষজ (যেমন—কালোজিরা, মধু, জিনজির ইত্যাদি) ব্যবহার করা সর্বোত্তম।

  • ইবনে আবেদীন (রহ.) 'রদ্দুল মুহতার' গ্রন্থে বলেন: "যে বস্তুকে শরীয়ত নাজায়েয বা শিরকী ঘোষণা করেছে, তাকে ঔষধ বানিয়ে নেওয়াও জায়েয নয়, কারণ এর মধ্যে দ্বীনের সীমা লঙ্ঘন ও কুসংস্কার পোষণ করা হয়।"

সন্তান লাভের ইসলামী পদ্ধতি:

আল্লাহর কাছে সন্তান চাওয়ার জন্য শরীয়তসম্মত পথ গ্রহণ করাই একমাত্র কর্তব্য। যেমন:

১. দুআ: নবী করীম (সা.)-এর শেখানো দুআ পড়া। যেমন—সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭৪): "রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিন ওয়াজ'আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।" (হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ করুন।)

২. দুআ: সূরা আলে-ইমরান (৩:৩৮) এ যাকারিয়্যা (আ.)-এর দুআ: "রাব্বি হাবলী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামী'উদ দু'আ।" (হে আমার রব, আপনার কাছ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দুআ শ্রবণকারী।)

৩. বৈধ চিকিৎসা: ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করা (যা হালাল ও বৈধ)।

৪. তাওবা ও ইস্তিগফার: গুনাহ থেকে তাওবা করে বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়া, যেমন—সূরা নূহ (৭১:১০-১২): "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর ধারাবাহিক বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী দেবেন।"

ফাতাওয়া ওসমানী ও অন্যান্য মারজেহ কিতাবের নির্দেশনা:

  • ফাতাওয়া উসমানী: এসব অলীক ও কুসংস্কারমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে দ্বীনী ও বৈধ উপায়ে সন্তান কামনা করার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, জাদু-টোনা, শেকড়-বাকড়, ও অচেনা মন্ত্র পড়া নাজায়েয ও কবিরা গুনাহ।

শেষ কথা:

আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। শুধুমাত্র তাকওয়া, ধৈর্য ও দ্বীনী আমলের মাধ্যমেই আল্লাহ সন্তান দান করেন। পানি-কলা পড়া বা গাছের শেকড় তাবিজ বানানো সম্পূর্ণ অনিরাপদ, বিদআত ও শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এসব পরিত্যাগ করে সরাসরি আল্লাহর কাছে দুআ করুন এবং হালাল উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে কুসংস্কার ও শিরক থেকে হেফাজত করুন এবং নেক সন্তান দান করুন। (আমিন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.