নামাজের পর কোন সূরা পড়া সুন্নাহ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,
মাগরিবের পরে সুরা ওয়াকিয়া এবং এশার পরে সূরা মুলক পড়া কি সুন্নাহ সম্মত?
ফজরসহ আর কোন কোন নামাজের পরে কোন নির্দিষ্ট সূরা পড়া সুন্নাহ কিনা বা এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি বা কোরআন কখন কখন পড়বো সবিস্তারে দয়া করে জানাতেন খুবই ভালো হতো।
Answer
নামাজের পর নির্দিষ্ট সূরা তিলাওয়াত প্রসঙ্গে
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়গুলো কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মাগরিবের পর সূরা ওয়াকিয়া পড়া
সূরা ওয়াকিয়া মাগরিবের পর পড়া সংক্রান্ত হাদীস আছে —
- ইবনে সুননী ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলতেন: "যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া পড়বে, তার কখনো দারিদ্র্য আসবে না।" — এটি ইবনে মাসউদের উক্তি (মাওকূফ), মারফূ' নয়। (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)
সুতরাং উক্ত আমল করা যেতে পারে।
২. এশার পর সূরা মুলক পড়া
এশার পর সূরা মুলক (সূরা তাবারাকাল্লাযী) পড়া — এ বিষয়ে সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে:
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"কুরআনে ত্রিশ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। সূরাটি হলো: تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ"
— তিরমিযী: ২৮৯১, আবু দাউদ: ১৪০০, ইবনে মাজাহ: ৩৭৮৬ — ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
হযরত জাবির (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ সূরা সাজদা ও সূরা মুলক পড়া ছাড়া ঘুমাতেন না।
— তিরমিযী: ২৮৯২, নাসাঈ: ১৭৮৩ — ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন।
সিদ্ধান্ত: এশার পর বা ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এটি নিয়মিত আমল করা উত্তম।
৩. ফজরসহ অন্যান্য নামাজের পর নির্দিষ্ট সূরা পড়া
(ক) ফজরের পর
ফজরের ফরজ নামাজের পর সূরা ইয়াসীন পড়ার ব্যাপারে কিছু বর্ণনা আছে,
ফজরের পর আয়াতুল কুরসী পড়ার ফযীলত বর্ণিত আছে (নাসাঈ, সহীহ)। আর সাধারণভাবে তাসবীহ, তাহলীল, তাকবীর, তাসবিহে ফাতিমী (৩৩-৩৩-৩৪) পড়া সুন্নাহ।
(খ) প্রতিটি ফরজ নামাজের পর
সহীহ হাদীসে প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নিম্নলিখিত আমলগুলো সুন্নাহ হিসেবে প্রমাণিত:
- আয়াতুল কুরসী — (নাসাঈ: ৯৯২৮, সহীহ)
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস — (আবু দাউদ: ১৫২৩)
- তাসবীহ ৩৩ বার, তাহমীদ ৩৩ বার, তাকবীর ৩৩ বার — (মুসলিম: ৫৯৭)
- আয়াতুল কুরসী পড়ার পর জান্নাতে প্রবেশে বাধা থাকে না — (নাসাঈ)
(গ) মাগরিবের পর
মাগরিবের পর নির্দিষ্ট সূরার কোনো সহীহ সুন্নাহ নেই। তবে সাধারণ যিকর ও দোয়া করা সুন্নাহ।
(ঘ) এশার পর
- সূরা মুলক — সুন্নাহ (উপরের হাদীস)
- বিতরের পর — কিছু বর্ণনায় আছে, তবে বিতর নামাজের পর বিশেষ সূরা পড়ার নির্দিষ্ট সুন্নাহ নেই।
৪. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে করণীয়
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন:
"নামাজের পর যিকর ও তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে যা সহীহ হাদীসে প্রমাণিত, তা-ই আমলযোগ্য। আর যা প্রমাণিত নয়, তা সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।"
— (রাদ্দুল মুহতার: ২/৬৬৫, দারুল মা'রিফা)
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন:
"নামাজের পর নির্দিষ্ট সূরা পড়া যদি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, তবে তা সুন্নাহ। আর যদি প্রমাণিত না হয়, তবে তা নফল হিসেবে পড়া যাবে, কিন্তু সুন্নাহ বলা যাবে না।"
— (ফাতাওয়া উসমানী: ১/৩৪৫)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী যেওর»-এ নামাজের পরের আমলসমূহে আয়াতুল কুরসী, তাসবীহে ফাতিমী ও দোয়া উল্লেখ করেছেন, বিশেষ সূরার কথা উল্লেখ করেননি।
— (বেহেশতী যেওর: নামাজের পরের আমল অধ্যায়)
৫. কুরআন কখন পড়বেন — বিস্তারিত
কুরআন তিলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কিছু সময় বিশেষভাবে ফযীলতপূর্ণ:
| সময় | ফযীলত | |------|--------| | ফজরের পর | ফজরের কুরআন "মাশহূদ" (সাক্ষ্যদানকারী) — সূরা বনী ইসরাইল: ৭৮ | | তাহাজ্জুদে | সর্বোত্তম নফল ইবাদত | | এশার পর / ঘুমানোর আগে | সূরা মুলক, সূরা সাজদা, আয়াতুল কুরসী | | জুমার দিন | সূরা কাহফ — (হাকিম, সহীহ) | | সকাল-সন্ধ্যা | সূরা ইয়াসীন (দুর্বল বর্ণনা), সূরা রহমান | | যেকোনো সময় | সাধারণ তিলাওয়াত সর্বদা ফযীলতপূর্ণ |
বুযুর্গানে দ্বীনেরা নিয়মিত , ফজরের পর সুরা ইয়াসিন, জোহরের পর সুরা ফাতহ,আসর পর সুরা নাবা, মাগরিব পর সুরা ওয়াকিয়া,ইশার পর সুরা মুলক+সুরা আলিম মিম সাজদাহ তিলাওয়াতের আমল করেন।
তাই আমরাও করতে পারি।
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ বলেন:
"কুরআন তিলাওয়াতের জন্য উত্তম সময় হলো রাতের শেষ প্রহর ও ফজরের পর। তবে দিন-রাতের যেকোনো সময় তিলাওয়াত করা যায়।"
— (মা'আরিফুল কুরআন: ৫/৪৫০)