মৃত দাদি শাশুড়ীকে দেখতে না গেলে কি আত্মীয়তার হক নষ্ট হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 6899
Questioner: Amatullah Noor
Question Asked: 14 Oct 2026, 04:19 PM
Reviewed & Published: 14 Oct 2026, 05:02 PM
Views: 22
Tokens: 4,050
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম সম্মানিত উস্তাদ।

মৃত দাদি শাশুড়ীকে দেখতে না গেলে কি তার হক নষ্ট হবে?
উল্লেখ্য যে,মেয়েটির শশুরবাড়ির লোকজন তাকে দেখতে পারে না,কিছুদিন আগে তাকে ধ্বাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে,তার মাকে মারতে গিয়েছে আর এখন গেলে আবার বাড়ির সবাই আর পরিবারের সবাই তাকে আক্রমণ করতে পারে তাকে অনেক খারাপ কথা বলতে পারে এই আশঙ্কায় সে যায়নি।সে কি এতে গুনাহগার হয়েছে?

Answer

আত্মীয়ের হক ও দেখা-সাক্ষাতের বিধান

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্টভাবে বলার আগে কয়েকটি মূলনীতি তুলে ধরা প্রয়োজন:

১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا "আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাওয়া-পাওয়া কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষণকারী।" (সূরা নিসা: ১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৬)

২. তবে শরীয়ত কাউকে নিজের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয় না

ইসলামী বিধান অনুযায়ী, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। কিন্তু যদি কেউ শারীরিক নির্যাতন, অপমান, বা গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে শরীয়ত তাকে বাধ্য করে না যে সে নিজেকে বিপদে ফেলবে।

কুরআনের মূলনীতি:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)

হাদীসে এসেছে:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির শিকারও হওয়া যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১, মুসনাদে আহমাদ)

৩. প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থার বিশ্লেষণ

প্রশ্নে যা বর্ণিত হয়েছে:

  • শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে
  • তার মাকে মারতে গিয়েছে
  • এখন গেলে সবাই মিলে আক্রমণ করতে পারে, খারাপ কথা বলতে পারে
  • এই আশঙ্কায় সে যাচ্ছে না

এমতাবস্থায়:

(ক) মৃত দাদি শাশুড়ীকে দেখতে না যাওয়া প্রসঙ্গে:

মৃত ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া বা না যাওয়া সরাসরি আত্মীয়তার হক নষ্ট হওয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রক্ষার বিষয়টি মূলত জানাযা, দাফন, দুআ ও ইসালে সওয়াব এর সাথে সম্পৃক্ত। মৃত দাদি শাশুড়ীকে দেখতে না যাওয়ার কারণে আত্মীয়তার হক নষ্ট হবে না, বিশেষত যখন জীবিত অবস্থায় তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা হয়েছে।

তবে যদি মৃত ব্যক্তির জানাযায় উপস্থিত থাকা সম্ভব হতো এবং নিরাপত্তার আশঙ্কা না থাকত, তাহলে জানাযায় অংশগ্রহণ করা ছিল কর্তব্য। কিন্তু প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে যেহেতু জানাযার বিষয় উল্লেখ নেই, বরং মৃতকে দেখতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাই এতে গুনাহগার হওয়ার বিষয়টি সরাসরি প্রযোজ্য নয়।

(খ) শ্বশুরবাড়ির লোকদের সাথে সম্পর্ক প্রসঙ্গে:

শরীয়তের নীতি হলো:

১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব — তবে তা শরীয়তসিদ্ধ পন্থায়।

২. যদি কেউ নির্যাতন, অপমান, বা শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে সে দূর থেকে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে — যেমন: ফোনে সালাম দেওয়া, উপহার পাঠানো, দুআ করা, বা নিরাপদ কোনো মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া।

৩. নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকলে সরাসরি যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কারণ শরীয়ত নিজের জান-মালের হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

"আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব, তবে যদি সম্পর্ক রক্ষার কারণে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে নিরাপদ পন্থায় সম্পর্ক রক্ষা করা যাবে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৭)

ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ আছে:

"আত্মীয়তার হক আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু যদি কেউ নির্যাতনের শিকার হয় এবং সরাসরি যোগাযোগ করলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে দূর থেকে সম্পর্ক রক্ষা করবে — যেমন দুআ করা, খোঁজ নেওয়া, উপহার পাঠানো ইত্যাদি।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪৯৮)

৪. সিদ্ধান্ত

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে:

১. মৃত দাদি শাশুড়ীকে দেখতে না যাওয়ার কারণে আত্মীয়তার হক নষ্ট হবে না — যদি জীবিত অবস্থায় তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা হয়ে থাকে এবং জানাযায় উপস্থিত থাকার সুযোগ না থাকে বা নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকে।

২. শ্বশুরবাড়ির লোকদের সাথে সম্পর্ক প্রসঙ্গে: মেয়েটি যদি নিরাপত্তার আশঙ্কায় সরাসরি না যায়, তবে সে গুনাহগার হবে না — শর্ত হলো সে দূর থেকে হলেও সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করবে (যেমন: ফোনে সালাম, দুআ, খোঁজখবর নেওয়া, নিরাপদ মাধ্যমে উপহার পাঠানো)।

৩. তবে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা (কাটিং অফ) জায়েজ নয় — যদি নিরাপত্তার আশঙ্কা না থাকে। আর যদি নিরাপত্তার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সরাসরি যোগাযোগ না করলেও দূর থেকে সম্পর্ক রক্ষা করা কর্তব্য।

৪. মেয়েটির উচিত: স্বামী বা বিশ্বস্ত কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা, যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আর যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে দূর থেকে সম্পর্ক রক্ষা করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে হেদায়েত দান করুন এবং পারিবারিক সম্পর্ক সুস্থ রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.