স্বামীর আনুগত্যের সীমারেখা কী? ইসলামে স্বামী আদেশ করলে মুবাহ কাজ ওয়াজিব হয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
স্বামী যদি এমন কারো সাথে সবসময় এটাচ থাকতে বলে যে সবসময় নীচু করে কথা বলে , আমার বাবা মাকে অপমান করে, মানসিক পীড়াতে রাখে। তাহলে কি করা উচিত?
Answer
স্বামীর আনুগত্যের সীমারেখা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ইসলামে স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ। স্বামী যা আদেশ করবেন, তা পালন করা স্ত্রীর উপর আবশ্যক কেবল তখনই, যখন তা শরীয়তসম্মত হয়। কিন্তু যদি স্বামী এমন কাজের আদেশ দেন যা গুনাহ, অন্যায়, বা পিতা-মাতার সাথে দুর্ব্যবহার ইত্যাদি হারাম কাজের দিকে নিয়ে যায় — তাহলে সেই আদেশ মানা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" — সহীহ বুখারী (৭১৪৫), সহীহ মুসলিম (১৮৪০)
স্বামীর আনুগত্যের মূল ভিত্তি ও সীমা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রীরা হলেন অনুগত..." (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
তবে এই আনুগত্য মারুফ (শরীয়তসম্মত) কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব কেবল সেই বিষয়ে যা শরীয়ত অনুমোদন করে; গুনাহের কাজে নয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৮৭
মুবাহ কাজ কি স্বামীর আদেশে ওয়াজিব হয়ে যায়?
সতর্কতা: মুবাহ কাজ স্বামীর আদেশে ওয়াজিব হয়ে যায় — এই কথাটি সর্বাবস্থায় সঠিক নয়। এটা নির্ভর করে:
- যদি মুবাহ কাজটি স্বামীর বৈধ হক সংশ্লিষ্ট হয় (যেমন: ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন) → তবে তা পালন করা কর্তব্য।
- যদি মুবাহ কাজটি নিছক ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি বা অন্যায়ের সহায়তা হয় → তবে তা পালন করা আবশ্যক নয়।
ইমাম আল-হাসকাফী (রহ.) আদ-দুররুল মুখতার-এ বলেন:
"নাফসের আনুগত্য নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্য; স্বামীর আনুগত্য শুধু বৈধ বিষয়ে।"
আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি
আপনি বলেছেন — স্বামী এমন কারো সাথে সবসময় সম্পর্ক রাখতে বলছেন যে:
- সবসময় নীচু করে কথা বলে
- আপনার বাবা-মাকে অপমান করে
- আপনাকে মানসিক পীড়া দেয়
এই পরিস্থিতিতে শরীয়তের বিধান:
(ক) পিতা-মাতার অপমান সহ্য করা যাবেনা,তাতে সহযোগিতা করা — জায়েজ নেই
আল্লাহ বলেন:
"তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
"পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া কবিরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত।" — সহীহ বুখারী (৫৯৭৩), সহীহ মুসলিম (৯০)
(খ) মানসিক পীড়া দেওয়া — নিষিদ্ধ
রাসূল ﷺ বলেছেন:
"কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইকে ভয় দেখিয়ে কষ্ট দেয়।" — সুনানে আবু দাউদ (৫০০৪)
(গ) স্বামীর এমন আদেশ — গুনাহের আদেশ
যেহেতু এই সম্পর্ক রাখার ফলে পিতা-মাতার অপমান, মানসিক পীড়া ও হারাম কাজে সহযোগিতা ঘটে, তাই স্বামীর এই আদেশ মানা জায়েয নয়।
করণীয় (আপনার জন্য পরামর্শ)
১. স্বামীকে শান্তভাবে বোঝান
- শরীয়তের দলিল পেশ করে বোঝান যে, পিতা-মাতার অপমান ও মানসিক পীড়া ইসলামে নিষিদ্ধ।
- মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) উল্লেখ করেন: "স্বামীর আনুগত্যের সীমা হলো শরীয়ত; শরীয়তবিরোধী আদেশ মানা যায় না।"
২. সীমিত সম্পর্ক রাখুন
- যদি সম্পর্ক রাখা একান্ত প্রয়োজন হয়, তবে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে রাখুন — অর্থাৎ, পিতা-মাতার অপমান বা মানসিক পীড়া সহ্য করতে বাধ্য নন।
- ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন: "স্ত্রী স্বামীর অবাধ্যতা করবে না, তবে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করবে না।"
৩. পরিবারের সম্মান রক্ষা করুন
- পিতা-মাতার সম্মান রক্ষা করা ফরজ। স্বামীর আনুগত্যের নামে পিতা-মাতার অপমান সহ্য করা জায়েয নয়।
- বাহিশতী যেওর-এ হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন: "স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব, কিন্তু পিতা-মাতার অপমান করা বা করানো কখনো জায়েয নয়।"
৪. প্রয়োজনে অভিভাবক বা মুফতির শরণাপন্ন হোন
- যদি স্বামী না বোঝেন এবং মানসিক পীড়া চলতে থাকে, তবে পরিবারের বড়দের বা বিশ্বস্ত মুফতি-এর পরামর্শ নিন।
- ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে: "স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হবে না, তবে গুনাহের কাজে তাকে সাহায্য করবে না।"
৫. ধৈর্য ও দু'আ
- আল্লাহর কাছে দু'আ করুন: "রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান-নার"
- ধৈর্য ধারণ করুন, কারণ আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)