মনের চিন্তা কি দুই কাঁধের ফেরেশতা দেখতে পান? হিংসা-বিদ্বেষের হিসাব কি কিরামান কাতিবীন লেখেন? হিংসা মনে চেপে রাখলে গুনাহ হবে কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6875
Questioner: No name
Question Asked: 14 Oct 2026, 12:54 AM
Reviewed & Published: 14 Oct 2026, 02:12 AM
Views: 9
Tokens: 3,908
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
আমাদের মনের চিন্তা কি দুই কাঁধের ফেরেশ্তারা দেখতে পারেন? আমাদের মনে যে হিংসা বিদ্বেষ থাকে এগুলোর হিসাব কি তারা লিখে রাখেন? কেউ যদি হিংসা মনের মধ্যে চেপে রাখে কিন্তু কিছু সেই হিংসা থেকে কোনো খারাপ কাজ না করে তাহলে কি তার গুনাহ হবে?

Answer

মনের চিন্তা, দুই কাঁধের ফেরেশতা ও হিংসার হিসাব

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথম প্রশ্ন: মনের চিন্তা কি দুই কাঁধের ফেরেশতা (কিরামান কাতিবীন) দেখতে পান?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, কিরামান কাতিবীন ফেরেশতারা মনের ভেতরের চিন্তা বা ইচ্ছা সরাসরি দেখতে পান না। তাঁরা শুধু সেই কাজ ও কথা লিপিবদ্ধ করেন যা প্রকাশ পায় বা যা ইচ্ছা-সংকল্প (আয্ম) হিসেবে স্থির হয়।

দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ ۝ كِرَامًا كَاتِبِينَ ۝ يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ

"নিশ্চয়ই তোমাদের উপর সংরক্ষণকারী (ফেরেশতা) রয়েছেন, সম্মানিত লেখকগণ, তারা জানেন যা তোমরা করো।" — (সূরা আল-ইনফিতার: ১০-১২)

এখানে "তারা জানেন যা তোমরা করো" — অর্থাৎ কাজ (আমাল), মনের গোপন খেয়াল নয়।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ أَوْ تَعْمَلْ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের খেয়াল (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা করে।" — (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম: ১২৭)

ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, কিরামান কাতিবীন শুধু সেই বিষয় লেখেন যা বান্দার ইচ্ছা-সংকল্পে পরিণত হয় এবং কাজের সূচনা হয়। নিছক মনের খেয়াল বা ওয়াসওয়াসা লিপিবদ্ধ হয় না। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৬০-এর কাছাকাছি আলোচনা)

তবে: ফেরেশতারা মনের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশে অবগত হতে পারেন, কারণ আল্লাহ মনের গোপন বিষয়ও জানেন। কিন্তু তাঁদের লেখার দায়িত্ব শুধু প্রকাশ্য আমল ও স্থির ইচ্ছার উপর।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: মনের হিংসা-বিদ্বেষের হিসাব কি ফেরেশতারা লেখেন?

উত্তর: হিংসা (হাসাদ) দুই প্রকার:

১. নিছক মনের খেয়াল (ওয়াসওয়াসা): যা অনিচ্ছায় মনে আসে, কিন্তু বান্দা তা অপছন্দ করে এবং দমন করে — এটা গুনাহ নয়, বরং ঈমানের দলিল। ফেরেশতারা এটা গুনাহ হিসেবে লেখেন না।

২. স্থির ইচ্ছা ও সংকল্প (আয্ম): যদি কেউ হিংসা পোষণ করে, তা নিয়ে ভাবে, এবং তা থেকে খারাপ কাজের ইচ্ছা করে — তবে এটা গুনাহ এবং ফেরেশতারা তা লিপিবদ্ধ করেন।

হাদিসে এসেছে:

إِذَا هَمَّ الْعَبْدُ بِسَيِّئَةٍ فَلَا تَكْتُبُوهَا عَلَيْهِ، فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا سَيِّئَةً

"যখন বান্দা কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করে, তখন তা লিখো না; যদি সে তা করে ফেলে, তখন এক মন্দ কাজ হিসেবে লেখো।" — (সহিহ বুখারি: ৭৫০১; সহিহ মুসলিম: ১৩১)

ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "হাম্ম" (ইচ্ছা) দ্বারা এখানে স্থির সংকল্প বোঝানো হয়েছে, নিছক খেয়াল নয়। (শরহু সহিহ মুসলিম: ২/১৫৩)


তৃতীয় প্রশ্ন: হিংসা মনে চেপে রাখলে, কোনো খারাপ কাজ না করলে কি গুনাহ হবে?

উত্তর: এখানে তিনটি অবস্থা:

অবস্থা ১ — হিংসা অনিচ্ছায় আসে, দমন করে ফেলে: কোনো গুনাহ নেই। বরং এটা ঈমানের শক্তি ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা।

অবস্থা ২ — হিংসা মনে পোষণ করে, কিন্তু কোনো কাজ বা কথা প্রকাশ করে না: এটা গুনাহ। কারণ হিংসা একটি মনের রোগ, যা কুরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:

وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

"আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে (আশ্রয় চাই), যখন সে হিংসা করে।" — (সূরা আল-ফালাক: ৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا

"তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না, পরস্পরে বিদ্বেষ করো না, পরস্পরে মুখ ফিরিয়ে নিও না।" — (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

তবে: যদি হিংসা মনে থাকে কিন্তু বান্দা তা ঘৃণা করে, দমনের চেষ্টা করে, এবং কোনো কাজে পরিণত না করে — তবে ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, এটা ক্ষমার যোগ্য, কারণ এটা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/১৭০-এর কাছাকাছি)

অবস্থা ৩ — হিংসা থেকে খারাপ কাজ করে ফেলে: স্পষ্ট গুনাহ, এবং ফেরেশতারা তা লিখে রাখেন।


ফতোয়াগ্রন্থের আলোকে সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | নিছক মনের খেয়াল | গুনাহ নেই, লেখা হয় না | | হিংসা পোষণ (কাজ ছাড়া) | গুনাহ, তবে দমন করলে ক্ষমার আশা | | হিংসা থেকে কাজ/কথা | স্পষ্ট গুনাহ, লিপিবদ্ধ হয় | | অনিচ্ছায় আসা হিংসা দমন | গুনাহ নেই, বরং সওয়াবের কারণ |

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "হাসাদ (হিংসা) একটি অন্তরের রোগ। যদি তা কাজে প্রকাশ না পায়, তবে তা হালকা গুনাহ; কিন্তু যদি প্রকাশ পায়, তবে তা কঠিন গুনাহ।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০০-এর কাছাকাছি)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "হিংসা দমনের চেষ্টা করা ওয়াজিব। যদি কেউ হিংসা করে কিন্তু কোনো ক্ষতি না করে, তবে সে গুনাহগার, তবে তাওবার মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়া সম্ভব।" (ফতোয়া উসমানি: ৩/৪৫০-এর কাছাকাছি)


করণীয়

১. হিংসা এলে আউযুবিল্লাহ পড়ুন ও দমন করুন। ২. হিংসার কারণ দূর করুন — যেমন কারো প্রতি ভালোবাসা বাড়ান, দুআ করুন। ৩. তাওবা করুন এবং হিংসার বিপরীতে হাসদকারীর জন্য দুআ করুন। ৪. মনে রাখবেন — হিংসা নিজের আমল ধ্বংস করে। রাসূল ﷺ বলেন: "হিংসা সওয়াবকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠ খেয়ে ফেলে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)


الله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.