কোরিয়ায় হারাম মাংসের কিচেনে কাজ করার বিধান।
Family Life · Hanafi
Question
১. আমার হাজবেন্ড বর্তমানে কোরিয়ায় অবস্থারত পড়াশোনার জন্য। যেহেতু অমুসলিম দেশ স্বাভাবিকভাবেই হালাল ইনকাম খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। বর্তমানে সে যেখানে কাজ করছে সেখানের মুরগীগুলো হালাল না। সে কিচেনের দায়িত্বে থাকাই তাকে এগুলো হাত দিতে হয়। এমতাবস্থায় কী ইনকাম হালাল হচ্ছে যেহেতু সে যা খায় তা হালাল কিন্তু কাজ করে যে মাংস নিয়ে তা হালাল ওয়েতে জবাই হয় না। কোনো মুসলিমদেরকেও ঐ খাবার সার্ভ করা হয় না উস্তায
এমতাবস্থায় অন্য কোনো নিয়ত করে কী ইনকামের টাকা নেয়া যাবে বেতন হিসেবে?
২. আমাদের বিয়ে হবার পর আমরা একসাথে ৮ মাস থাকতে পেরেছিলাম। এরপর ১.৫ বছর দূরে। হাজবেন্ডের শারীরিক চাহিদা বেশি থাকায় এবং সেখানে নজরের হেফাজত করা কঠিন হওয়ায় আমার কাছে একান্ত সময় চাই কিন্তু দেখা যায় আমি সেভাবে প্রাইভেসি পাইনা সবসময় এমনকি আমার মানসিকভাবে একটু সমস্যা হয় যদি সে আমার সাথে রাগ করে বা খারাও বিহেভ করে সেটা ইফেক্ট ফেলায় অনেক। তো আমি সেভাবে আমার দিক থেকে আগ্রহ দেখাতে পারিনা সবসময়। আমার চাওয়া আমাদের দূরত্ব কমে যাক আর সে আমার সাথে কখনো রাগ না দেখাক বা বাজে ব্যবহার না করুক কারণ আমার বাবা নেই... আমি আমার ফ্যামিলির থেকে অনেক কষ্ট পেয়েছি আর এখনো পাচ্ছি যা আমাকে ট্রমায় ফেলে রাখছে।
আবার বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে আমারা দুজন সেভাবে আলাদা প্রাইভেসি পেয়ে সময় কাটাতে পারিনি...ওখানেও আমাকে মানসিকভাবে স্ট্রাগল করতে হয়েছে।
আমি অল্পতে খুব অভিমান করি তাই তাকে কিছু নিষেধ করতে বললেও সহজে বাদ দেয় না।
এখন সে আমার ওপর দোষারোপ করছে যে তার শারীরিক নিডের সময় আমি কেনো সময় বের করতে পারনা...নিজে থেকে কেনো আগ্রহ দেখায় না ( আমার লজ্জা করে আর আমি চাই আমার হাজবেন্ত আমাকে আগে মানসিকভাবে প্রস্তুতি করুক)
এইসব কিছু নিয়ে আমার সাথে রাগ করে আছে।
এমতাবস্থায় আমি কী করতে পারি উস্তায।
আমি আলহামদুলিল্লাহ আমার স্বামীর পছন্দ অপছন্দ আদেশ নিষেধ সব কিছু সর্বোচ্চ দিয়ে মানার চেষ্টা করি কিন্তু তার দিক থেকে আমি তাকে যেমন চাই তেমনটা আগে দিতে পারলেও এখন দিতে পারেনা।
আমাকে বেশিই রাগ বিরক্তি দেখায় আর বাজে বিহেভ করে ফেলে যেই সমস্যা আগে তার ছিলোনা।
আমা শ্বশুরবাড়িতেও আমার প্রাইভেসি নাই...এখন বাবার বাড়ি আছি.. মা অসুস্থ থাকে।
দেখা যায় সে বুঝে না আমি দরজা আটকায়ে কী করি। তার প্রয়োজনে আমাকে না পেলে রাগ করে। আবার এদিকে স্বামীও ঠিকমতো সময় না পেলে রাগ করে। সব দোষ আমার ওপর দেয়।
আমি তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেছি অনেক বাট বারবার বাঁধা আসছে। আমার জন্য দোয়া রাখবেন উস্তায।
Answer
হালাল ইনকাম ও বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি: একটি শরয়ী সমাধান
উত্তর নং ১: কোরিয়ায় হারাম মাংসের কিচেনে কাজ করার বিধান
প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বামী কোরিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন যেখানে মুরগি হালাল পদ্ধতিতে জবাই করা হয় না এবং কোনো মুসলিমকে সেই খাবার পরিবেশন করা হয় না। তিনি কিচেনের দায়িত্বে থাকায় বাধ্য হয়ে সেই মাংস স্পর্শ করেন।
শরয়ী বিশ্লেষণ:
ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো—হারাম বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ করা জায়েজ নয়। তবে এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে:
১. মৃত প্রাণী বা হারাম মাংস স্পর্শ করা: যদি মাংসটি শূকরের না হয়, বরং জবাইয়ের নিয়ম রক্ষা না হওয়ার কারণে হারাম হয় (যেমন: আল্লাহর নাম ছাড়া জবাই, বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে মারা), তাহলে শুধু স্পর্শ করা নাজায়েজ নয়; বরং তা ধোয়ার পর হাত পবিত্র হয়ে যায়। কিন্তু তা রান্না করা, পরিবেশন করা বা বিক্রয় করা—এগুলো হারাম কাজের সহযোগিতা (ইআনাহ আলাল ইসম) হিসেবে গণ্য হবে।
২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: মৃত প্রাণীর চর্বি বিক্রয় করা, তা থেকে উপার্জন করা নাজায়েজ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৫৩)
৩. ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত: মৃত প্রাণীর চর্বি দিয়ে জাহাজের ইঞ্জিন চালানো বা সাবান তৈরি করা জায়েজ, তবে খাওয়া বা বিক্রয় করা নাজায়েজ। (আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ু)
সমাধান:
- যদি তিনি শুধু মাংস স্পর্শ করেন এবং তা ধুয়ে ফেলেন, তাহলে হাত পবিত্র হয়ে যায়। কিন্তু রান্না করা, পরিবেশন করা বা সেই খাবার প্রস্তুত করা—এগুলোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়।
- বিকল্প: তিনি যদি শুধু সবজি, ভাত, বা হালাল খাবারের অংশ প্রস্তুত করেন এবং হারাম মাংসের অংশে হাত না দেন, তাহলে তার বেতন হালাল হবে। কিন্তু যদি বাধ্য হয়ে হারাম মাংস রান্না বা পরিবেশন করেন, তাহলে সেই কাজের বেতন হালাল হবে না।
- নিয়ত পরিবর্তনের বিষয়: নিয়ত পরিবর্তন করলেও হারাম কাজ হারামই থাকে। তবে যদি তিনি শুধু কিচেনের অন্যান্য কাজ (যেমন: হালাল খাবার প্রস্তুত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা) করেন এবং হারাম মাংসের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না থাকেন, তাহলে বেতন হালাল হবে।
- প্রয়োজনে: যদি এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো উপায় না থাকে এবং তিনি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বাধ্য হন, তাহলে তিনি যেন হারাম মাংসের অংশে সরাসরি হাত না দিয়ে শুধু অন্যান্য কাজ করেন। অথবা অন্য কোনো হালাল কাজ খুঁজে নেন।
উপরোক্ত বিষয়ে ফতোয়া: ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪০১-৪০৩; ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮৯; ফতোয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৭।
উত্তর নং ২: বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি ও তার সমাধান
প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন দূরে আছেন, শারীরিক চাহিদা ও মানসিক চাপে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। স্ত্রী মানসিকভাবে প্রস্তুতি চান, কিন্তু স্বামী রাগ ও বিরক্তি প্রকাশ করছেন। শ্বশুরবাড়িতে প্রাইভেসির অভাব, পারিবারিক ট্রমা, এবং মায়ের অসুস্থতা—এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
শরয়ী দিকনির্দেশনা:
১. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি: আল্লাহ তাআলা বলেন: "তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।" (সূরা বাকারা: ১৮৭) অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সুরক্ষা, শান্তি ও সম্মানের আশ্রয়।
২. শারীরিক চাহিদা: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক বৈধ ইবাদত হিসেবে গণ্য। তবে তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মতি, ভালোবাসা ও মানসিক প্রস্তুতির ভিত্তিতে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
৩. রাগ ও বিরক্তি: রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো তার স্ত্রীদের সাথে রাগ দেখাতেন না বা বাজে ব্যবহার করতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো নারীকে মারেননি, কোনো খাদেমকেও না।" (মুসলিম: ২৩২৮)
৪. স্ত্রীর মানসিক প্রস্তুতি: স্বামীর উচিত স্ত্রীর মানসিক অবস্থা বুঝে তাকে প্রস্তুত করা। আল্লাহ বলেন: "তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাব সহকারে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
ব্যবহারিক পরামর্শ:
- স্বামীর সাথে আলোচনা: আপনি তাকে শান্তভাবে বুঝান যে, আপনার মানসিক সমস্যা ও পারিবারিক ট্রমার কারণে আপনি আগে মানসিক প্রস্তুতি চান। তাকে বলুন, আপনি তাকে ভালোবাসেন এবং তার চাহিদা পূরণ করতে চান, কিন্তু একটু সময় ও সহানুভূতি প্রয়োজন।
- দোয়া ও ইস্তিগফার: আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। সূরা ত্বাহা: ২৫-২৮ পড়ে দোয়া করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার সব সংকট দূর করে দেন।" (আবু দাউদ: ১৫১৮)
- পারিবারিক হস্তক্ষেপ: যদি শ্বশুরবাড়ির কারণে সমস্যা হয়, তাহলে কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয় বা ইমামের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান।
- প্রাইভেসি: স্বামী-স্ত্রীর জন্য আলাদা ঘর বা সময় নির্ধারণ করা জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করে।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
- ধৈর্য: আপনি যা করছেন, তা সঠিক পথে আছেন। আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
বিশেষ দোয়া: "রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিন ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।" (সূরা ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহ তাআলা আপনার স্বামীকে হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দিন, আপনার দাম্পত্য জীবনকে শান্তি ও ভালোবাসায় ভরে দিন, এবং আপনার মানসিক কষ্ট দূর করে দিন। আমিন।
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব।