মায়ের চাকরিসূত্রে পাওয়া টাকায় ক্রয়কৃত জমি এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বণ্টন।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মায়ের সম্পত্তির বণ্টন: ভাই কম নিলে বোনেরা দোষী হবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
মায়ের চাকরিসূত্রে পাওয়া টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করা হয়েছে। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জমি বণ্টন করা হয়েছে। বোনেরা চেয়েছিল শরীয়াহ অনুযায়ী ভাই অর্ধেক আর বোনেরা বাকি অর্ধেক পাবে। কিন্তু ভাই তার প্রাপ্যের চেয়ে অনেক কম নিয়েছে এবং বোনদের প্রাপ্যের চেয়ে সামান্য বেশি নিয়েছে। এমতাবস্থায় বোনেরা কি দোষী হবে?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে সন্তানদের হুকুম
মায়ের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি (চাকরিসূত্রে পাওয়া টাকায় ক্রয়কৃত জমিসহ) মীরাস হিসেবে সন্তানদের মধ্যে বণ্টিত হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ
"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান।" (সূরা আন-নিসা: ১১)
সুতরাং শরীয়াহ অনুযায়ী এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বণ্টন হবে এভাবে:
- ভাই পাবে ১/২ (অর্ধেক)
- দুই বোন মিলে পাবে ১/২ (অর্ধেক) — অর্থাৎ প্রত্যেকে ১/৪
২. ভাই যদি স্বেচ্ছায় কম নেয়
যদি ভাই প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হয় এবং স্বেচ্ছায়, কোনো চাপ বা ভয় ছাড়া নিজের প্রাপ্যের চেয়ে কম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে শরীয়াহ অনুযায়ী এটি বৈধ। কারণ এটি তার নিজের হক ছেড়ে দেওয়া বা দান করার শামিল।
ইবন আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَلَوْ تَرَكَ أَحَدُ الْوَرَثَةِ نَصِيبَهُ لِبَعْضِ الْوَرَثَةِ بِرِضَاهُ يَجُوزُ
"যদি কোনো ওয়ারিস নিজের অংশ অন্য ওয়ারিসকে তার সম্মতিতে ছেড়ে দেয়, তাহলে তা জায়েজ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৬০)
৩. বোনেরা দোষী হবে কি?
বোনেরা দোষী হবে না, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূর্ণ হয়:
-
বোনেরা শরীয়াহ অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য (১/৪ করে) পেয়েছে — অর্থাৎ ভাই কম নেওয়ার কারণে বোনেরা তাদের প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পায়নি, বরং ভাই নিজের হক থেকে ছেড়ে দিয়েছে।
-
ভাই স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে কম নিয়েছে — কোনো প্রকার জবরদস্তি, ভয়ভীতি বা প্রতারণা ছাড়া।
-
বোনেরা ভাইকে তার প্রাপ্য পাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল — প্রশ্নে উল্লেখ আছে বোনেরা চেয়েছিল ভাই অর্ধেক পাবে, অর্থাৎ তারা ভাইকে তার হক দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
-
ভাই প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন — যদি ভাই নাবালক বা মানসিকভাবে অক্ষম হয়, তাহলে তার কম নেওয়া বৈধ হবে না এবং বোনেরা দোষী হবে।
৪. যদি ভাই নিজের হক না জেনে বা ভুল বোঝাবুঝিতে কম নেয়
যদি ভাই শরীয়াহর হুকুম না জেনে, বা বোনেরা তাকে বিভ্রান্ত করে কম নিতে রাজি করায়, তাহলে এটি বৈধ হবে না। এক্ষেত্রে বোনেরা দোষী হবে এবং ভাইকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ
"তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
৫. ফতোয়ায়ে উসমানিতে উল্লেখিত নীতি
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"যদি কোনো ওয়ারিস স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে নিজের অংশ অন্য ওয়ারিসকে দান করে, তাহলে তা বৈধ। কিন্তু যদি কেউ প্রতারণা, ভয়ভীতি বা মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে কম নিতে বাধ্য হয়, তাহলে তা হারাম।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫)
সিদ্ধান্ত
প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী:
- বোনেরা ভাইকে শরীয়াহ অনুযায়ী অর্ধেক দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।
- ভাই স্বেচ্ছায় তার প্রাপ্যের চেয়ে কম নিয়েছে।
- বোনেরা তাদের প্রাপ্যের চেয়ে সামান্য বেশি পেয়েছে, যা ভাইয়ের ছেড়ে দেওয়া হক থেকে এসেছে।
এমতাবস্থায় বোনেরা দোষী হবে না, যদি ভাই প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হয় এবং কোনো চাপ, ভয় বা প্রতারণা ছাড়া স্বেচ্ছায় কম নিয়ে থাকে।
তবে সতর্কতা: ভাই যদি পরে তার কম নেওয়ার কারণে অনুতপ্ত হয় বা বোনেরা তাকে বিভ্রান্ত করেছিল বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে বোনেদের উচিত ভাইকে তার প্রাপ্য অংশ ফিরিয়ে দেওয়া বা সমন্বয় করা। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)