“স্বামী জাদুতে আক্রান্ত সন্দেহ হলে কী করবেন? নির্ভরযোগ্য রাকি কোথায় পাবেন, স্বামী চিকিৎসা না নিলে করণীয়, শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ ও দুআ কি? বিস্তারিত জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
নির্ভর যোগ্য রাকি কথায় পাবো এমন কারো রেফারেন্স কি এখানে পাবো? আমার হাসব্যান্ড জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে আমি এখন কি করতে পারি উনি তো চিকিৎসা নিবে না ডায়াগনসিস ও করতে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রথমে ধৈর্য ও সুস্থ বিবেক দিয়ে বিষয়টি যাচাই করুন। “জাদু হয়েছে” এমন ধারণা প্রমাণিত নয়—এটি ওয়াসওয়াসা বা ভয়ও হতে পারে। স্বামীকে জোর করে ডাক্তার বা রাকির কাছে নেওয়া যাবে না; ইসলামে জবরদস্তি নেই। আপনি যা করতে পারেন: (১) নিজে ও স্বামীর জন্য কুরআন-সুন্নাহর বৈধ রুকইয়াহ/দোয়া করুন, (২) স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার, দোয়া ও সবর করুন, (৩) অভিজ্ঞ, আমানতদার ও শরীয়তসম্মত রাকি খুঁজুন—তবে তাঁকে জোর করবেন না, (৪) প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির পরামর্শ নিন। নিচে বিস্তারিত দিচ্ছি।
১) জাদু-আসর: বিশ্বাস ও সীমারেখা
জাদু (সিহর) শরীয়তে একটি বাস্তব বিষয়; কুরআনে সূরা আল-ফালাক ও আন-নাসে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ আছে, এবং সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে জাদুর আলোচনা আছে। হাদিসে জাদুকে “সাতটি ধ্বংসকারী কবিরা গুনাহ”-এর একটি বলা হয়েছে (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬; সহিহ মুসলিম: ৮৯)।
তবে প্রতিটি অসুস্থতা বা সমস্যাকে জাদু বলা ঠিক নয়। অনেক সময় এটি শারীরিক/মানসিক রোগ, দুশ্চিন্তা, পারিবারিক চাপ বা শয়তানের ওয়াসওয়াসা হয়। তাই আগে চিকিৎসা-পরীক্ষা করানো সুন্নাহসম্মত ও বুদ্ধিমানের কাজ; শরীয়ত চিকিৎসার নিষেধ করে না, বরং উৎসাহ দেয়।
২) স্বামী চিকিৎসা/ডাক্তারিতে না গেলে আপনি কী করবেন?
ক) জবরদস্তি করবেন না
ইসলামে কারো উপর জোর-জবরদস্তি করা যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
“যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম: ১০১)
আরও সাধারণ নীতি হলো—বান্দার উপর এমন কিছু চাপানো যাবে না যা সে অস্বীকার করে। তাই স্বামীকে জোর করে ডাক্তার বা রাকির কাছে নেওয়া আপনার জন্য বৈধ হবে না।
খ) আপনি যা করতে পারেন
- নরমভাবে বোঝান: ভালোবাসা, যুক্তি ও ভয়-ভালোবাসার মিশ্রণে বোঝান—ডাক্তারি পরীক্ষা করালে উপকার হতে পারে, এতে ক্ষতি নেই।
- নিজে দোয়া ও রুকইয়াহ করুন: স্বামীর জন্য কুরআনের আয়াত, সূরা ফালাক, নাস, আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিন বা পানি পড়ে পান করান—এটি জায়েজ ও উপকারী।
- স্বামীর জন্য দুআ করুন:
- «اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ»
(হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, শিফা দিন; আপনি ছাড়া কোনো শিফা দাতা নেই।) — সহিহ বুখারি: ৫৬৭৫ - সকাল-সন্ধ্যার আমল, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ফালাক-নাস পড়া।
- «اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ»
- ঘরে কুরআন তিলাওয়াত বাড়ান: সূরা বাকারা পড়া/চালানো—হাদিসে ঘরে সূরা বাকারা পড়লে শয়তান পালায় (সহিহ মুসলিম: ৭৮০)।
- বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির পরামর্শ নিন: স্থানীয় নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা বা মুফতির সাথে কথা বলুন; তাঁরা আপনাকে সঠিক পথ দেখাবেন।
৩) নির্ভরযোগ্য রাকি কোথায় পাবেন?
“রাকি” খোঁজার সময় সতর্ক থাকুন। অনেক ভুয়া/প্রতারক রাকি টাকা হাতিয়ে নেয়, কুফরি-শিরকি কাজ করে, বা অশ্লীলতা/গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। নির্ভরযোগ্য রাকির বৈশিষ্ট্য:
- কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী রুকইয়াহ করে; তাবিজ-কবজ, জিনের নামে কসম, অশ্লীল কথা, অজানা শব্দ ব্যবহার করে না।
- নারীর সাথে নির্জনে (খালওয়া) মিলিত হয় না; মাহরাম উপস্থিত রাখে।
- অতিরিক্ত টাকা/হাদিয়া দাবি করে না; বরং সাধারণ পরামর্শ দেয়।
- প্রয়োজনে ডাক্তারি পরীক্ষার পরামর্শ দেয়, শুধু “জাদু” বলে সব সমস্যার সমাধান দাবি করে না।
কোথায় খুঁজবেন:
- স্থানীয় বিশ্বস্ত মসজিদের ইমাম/খতিবের কাছে জিজ্ঞাসা করুন।
- নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা বা ইসলামিক সেন্টারের পরামর্শ নিন।
- অনলাইনে অপরিচিত “রাকি”কে টাকা পাঠাবেন না; আগে যাচাই করুন।
৪) শরীয়তসম্মত রুকইয়াহর মূল বিষয়
রুকইয়াহ জায়েজ, তবে তা হতে হবে:
- কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-গুণাবলি, বা আরবি অর্থবোধক দুআ দ্বারা।
- কুফরি-শিরকি শব্দ, অজানা মন্ত্র, জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া—নিষিদ্ধ।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ রোগীর জন্য দুআ পড়ে ফুঁ দিতেন (সহিহ বুখারি: ৫৬৭৫)। তিনি বলেছেন:
«لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ»
“যতক্ষণ তাতে শিরক না থাকে, রুকইয়াহতে কোনো অসুবিধা নেই।” (সহিহ মুসলিম: ২২০০)
৫) আপনার করণীয়: একটি বাস্তব পরিকল্পনা
- শান্ত থাকুন, ওয়াসওয়াসায় ডুববেন না। জাদু হয়েছে—এমন সন্দেহে পরিবার ভেঙে ফেলবেন না।
- স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার করুন। রাগ, সন্দেহ, অভিযোগ পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।
- নিজে দুআ ও কুরআন তিলাওয়াত চালু করুন। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস, সূরা বাকারার শেষ আয়াত।
- স্বামীকে নরমভাবে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য রাজি করান। বলুন—এটি শুধু পরীক্ষা, ক্ষতি নেই; জাদু হলে রাকি, না হলে ডাক্তার—দুটোই দরকার হতে পারে।
- বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির সাথে পরামর্শ করুন। স্থানীয় দারুল ইফতা বা নির্ভরযোগ্য ইসলামিক সেন্টারে যোগাযোগ করুন।
- যদি স্বামী একেবারেই না মানে: জোর করবেন না; দুআ ও সবর অবলম্বন করুন। আল্লাহই শিফা দেন।
৬) হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): রুকইয়াহ ও তাবিজ প্রসঙ্গে—শর্ত হলো শিরকমুক্ত হওয়া; কুফরি শব্দ নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজার/রুকইয়াহ অধ্যায়)
- ফাতাওয়া আলমগিরি: রুকইয়াহ ও দুআ দ্বারা চিকিৎসার অনুমতি; শিরকি পদ্ধতি নিষিদ্ধ।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): জাদু ও রুকইয়াহ প্রসঙ্গে—শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ জায়েজ, ভুয়া রাকি ও শিরকি পদ্ধতি থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): চিকিৎসা ও রুকইয়াহ উভয়ই জায়েজ; তবে শিরকি-কুফরি পদ্ধতি নিষিদ্ধ।
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি): সূরা ফালাক-নাসের তাফসিরে জাদু ও তার প্রতিকার আলোচিত।
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): দুআ, রুকইয়াহ ও চিকিৎসার আদব।
৭) উপসংহার
- জাদু বাস্তব, তবে সব সমস্যাকে জাদু বলা ঠিক নয়।
- স্বামীকে জোর করা যাবে না; আপনি দুআ, কুরআন তিলাওয়াত ও নরম পরামর্শ চালিয়ে যান।
- নির্ভরযোগ্য রাকি খুঁজতে স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম/দারুল ইফতার সাহায্য নিন; অনলাইনে অপরিচিত রাকিকে টাকা দেবেন না।
- প্রয়োজনে ডাক্তারি পরীক্ষাও করান—এটি শরীয়তবিরোধী নয়।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন; তিনিই শিফা দেন।
والله أعلم بالصواب