কাপড় দেখে জাদু নির্ণয় করা রাকির কাছে যাওয়া কি জায়েজ? ভুল আলেম/রাকির কাছে যাওয়ার পর করণীয় কী?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6812
Questioner: Google Account
Question Asked: 12 Oct 2026, 08:34 PM
Reviewed & Published: 13 Oct 2026, 01:21 AM
Views: 36
Tokens: 3,952
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামুআলাইকুম,
আমি রাকি ভেবে ভুল আলেম এর কাছে গেসি যিনি কাপড় দেখে ডায়াগনসিস করে, এখন আমি কি করতে পারি, আমার এক খালাতো বোন উনার কাছে সুস্থ হইসে ওরা তো ফেক তাহলে সুস্থ করে কিভাবে আর এভাবে তো আমার ধোঁকা খেয়ে যাই, উনি আমাকে বলেছে জাদু আছে আমার আমি তো তার কথা বিস্বাস করে ফেলসিলাম এখন কি করণীয় আমার

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

আপনি যে ভুল করেছেন, তা হলো এমন এক ব্যক্তির কাছে যাওয়া যে কাপড় দেখে জাদু-টোনা নির্ণয় করে এবং অদৃশ্যের খবর দেয়। এটি শরীয়তে নিষিদ্ধ। এখন আপনার করণীয় হলো:

১. তাওবা করুন — অদৃশ্যের খবর জানার ব্যাপারে তার কথাকে বিশ্বাস করা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। ২. তার কাছে আর যাবেন না, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করুন (কমপক্ষে এ ধরনের কাজে)। ৩. তার কথাকে বিশ্বাস করবেন না — সে যা বলেছে "জাদু আছে", এটা তার দাবি মাত্র; এর কোনো শরীয়তসম্মত ভিত্তি নেই। ৪. রুকইয়াহ শরীয়াহ করুন — কুরআনের আয়াত, সহীহ দুআ ও মাসনূন আমল নিজে পড়ুন বা কোনো বিশ্বস্ত, সুন্নাহ-মেনে চলা আলেম দিয়ে করান। ৫. নিয়মিত আমল করুন — ফজরের-মাগরিবের জিকির, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দুআ। ৬. চিকিৎসা প্রয়োজন হলে ডাক্তারের কাছে যান; অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা।


বিস্তারিত:

প্রশ্নের সারমর্ম: আপনি একজন রাকি মনে করে এমন একজনের কাছে গিয়েছিলেন, যিনি কাপড় দেখে রোগ নির্ণয় করেন। তিনি বলেছেন আপনার উপর জাদু আছে। আপনার খালাতো বোন তার কাছে সুস্থ হয়েছে। এখন আপনি জানতে চান — এটা কি ফেক? কী করণীয়?

১. কাপড় দেখে জাদু নির্ণয় করা — শরীয়তে নিষিদ্ধ

কাপড়, ছবি, নাম, বা কোনো বস্তু দেখে অদৃশ্যের খবর দেওয়া — এগুলো কাহিন-শাস্ত্র (fortune-telling) ও গায়েবের দাবির অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً

"যে ব্যক্তি কোনো গণক/ভবিষ্যৎ-বক্তার কাছে গিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার চল্লিশ রাতের নামাজ কবুল হয় না।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৩০)

আর যে ব্যক্তি তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে কুফরের সীমায় পৌঁছে যায়:

مَنْ أَتَى عَرَّافًا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ

"যে ব্যক্তি কোনো গণক বা ভবিষ্যৎ-বক্তার কাছে গিয়ে সে যা বলে তা সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর যা নাজিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ৯৫৩২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৯০৪ — হাসান)

২. "জাদু আছে" — এটা তার দাবি, প্রমাণ নয়

কাপড় দেখে সে কীভাবে জানল আপনার জাদু আছে? এটা অনুমান, ধারণা, বা জিনের সহায়তায় বলা — কোনো শরীয়তসম্মত প্রমাণ নয়। তাই তার কথাকে বিশ্বাস করা আপনার জন্য জরুরি নয়। আপনি ভুল করে বিশ্বাস করেছিলেন — এখন তাওবা করুন।

৩. খালাতো বোন সুস্থ হওয়ার বিষয়টি

সুস্থতা আল্লাহর হাতে। হতে পারে:

  • আল্লাহ তাআলা স্বতন্ত্রভাবে শিফা দিয়েছেন (তার মাধ্যমে হোক বা না হোক)।
  • তার কাছে যাওয়ার আগেই বা পরে আল্লাহ শিফা দিয়েছেন — এটা তার কারামত নয়।
  • শয়তান ও জিনের সহায়তায় সাময়িক উপশম হতে পারে — যা পরীক্ষা।

মূল কথা: ফেক বা সত্য — এটা দিয়ে তার পদ্ধতির বৈধতা প্রমাণ হয় না। শরীয়তের মানদণ্ড হলো — পদ্ধতি ও উপায় হালাল কি না।

৪. এখন আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)

ক. তাওবা ও ইস্তিগফার: অদৃশ্যের খবর বিশ্বাস করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। নিয়ত করুন আর কখনো এমন কারো কাছে যাবেন না।

খ. তার সাথে সম্পর্ক: তাকে "রাকি" হিসেবে গ্রহণ করবেন না। তার কাছে যাওয়া বন্ধ করুন। যদি সম্ভব হয়, তাকে সৎভাবে বুঝিয়ে দিন যে তার পদ্ধতি শরীয়তবিরোধী।

গ. নিজের রুকইয়াহ: নিজে বা বিশ্বস্ত আলেম দিয়ে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ করুন। যেমন:

  • সূরা ফাতিহা
  • আয়াতুল কুরসি
  • সূরা ফালাক, সূরা নাস
  • সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত
  • "بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ..." ইত্যাদি মাসনূন দুআ

ঘ. দৈনন্দিন সুরক্ষা:

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন জিকির
  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, ফালাক-নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া
  • সূরা বাকারা ঘরে পড়া
  • হারাম থেকে বেঁচে থাকা, ছবি-সংগীত-অশ্লীলতা থেকে ঘর পবিত্র রাখা

ঙ. চিকিৎসা: শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ইসলাম চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছে।

৫. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন — গণক, জ্যোতিষী, ও গায়েবের দাবিদারদের কাছে যাওয়া ও তাদের কথা বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হজর/আল-কাহানাহ অধ্যায়)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে বলেছেন — রুকইয়াহ শরীয়াহ জায়েজ, তবে তা হতে হবে কুরআন-সুন্নাহর আয়াত-দুআ দ্বারা, এবং রাকির হতে হবে সুন্নাহ-মেনে চলা, বিশ্বস্ত ব্যক্তি; কাপড়-ছবি দেখে নির্ণয়, জিনের সাথে যোগাযোগ, বা অদৃশ্যের দাবি — এসব নাজায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, রুকইয়াহ ও জাদু অধ্যায়)

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ স্পষ্ট করেছেন — জাদু-টোনার চিকিৎসায় এমন উপায় অবলম্বন করা যাবে না যা শিরক-কুফরের দিকে নিয়ে যায়; কুরআনের আয়াত ও মাসনূন দুআই যথেষ্ট। (বেহেশতী জেওর, জাদু-টোনা অধ্যায়)

৬. উপসংহার

  • আপনি ভুল করেছিলেন — তাওবা করুন, আল্লাহ ক্ষমাশীল।
  • তার কথাকে বিশ্বাস করবেন না; "জাদু আছে" — এটা তার দাবি, দলিল নয়।
  • তার কাছে আর যাবেন না।
  • কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ ও দৈনন্দিন আমল করুন।
  • প্রয়োজনে ডাক্তারের চিকিৎসা নিন।
  • আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — তিনিই একমাত্র শিফাদাতা।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.