কাপড় দেখে যাদুর ডায়াগনোসিস করা কি জায়েয? ইসলামে যাদু নির্ণয়ের সঠিক পদ্ধতি কী?
Family Life · Hanafi
Question
আমার যাদু সংক্রান্ত সমস্যা আছে একজন মুফতি বলেছেন, কিন্তু উনি কাপড় দেখে ডায়াগনোসিস করে,
এটা কি ডায়াগনোসিস করার সঠিক পদ্ধতি?
এভাবে কি করা যায়?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন ব্যক্তি যাদু (সিহর) সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত। একজন মুফতি সাহেব কাপড় দেখে ডায়াগনোসিস করেছেন। প্রশ্ন হলো—কাপড় দেখে যাদুর ডায়াগনোসিস করা কি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি? এভাবে করা কি জায়েয?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
কাপড় দেখে যাদুর ডায়াগনোসিস করা শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়। এটি কাহিন-তথাকথিত পদ্ধতি, যা সাধারণত গণক, জ্যোতিষী ও ভণ্ড আমিলদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়। শরীয়তে যাদুর চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে—রুকইয়াহ শরইয়্যাহ (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ঝাড়ফুঁক) এবং বৈধ চিকিৎসা। কাপড়, ছবি, নাম, মায়ের নাম ইত্যাদি দেখে গায়েবের খবর দেওয়া বা যাদু নির্ণয় করা হারাম এবং কুফরির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এতে গায়েবের জ্ঞান দাবি করা হয়, যা কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত।
বিস্তারিত আলোচনা
১. গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ
“আর গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে; তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।”
(সূরা আল-আনআম: ৫৯)
আরও বলেন:
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ
“বলুন, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।”
(সূরা আন-নামল: ৬৫)
কাপড় দেখে যাদু হয়েছে কি হয়নি, কে করেছে, কীভাবে করেছে—এসব গায়েবের খবর। কোনো মুফতি বা আমিল যদি কাপড় দেখে এ ধরনের দাবি করেন, তবে তিনি হয় গণকের অন্তর্ভুক্ত, নয়তো শয়তানের সহযোগী।
২. হাদিসে গণকের ব্যাপারে সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩০)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
مَنْ أَتَى عَرَّافًا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ
“যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর অবতীর্ণ কিতাবকে অস্বীকার করল।”
(মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৩২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪)
৩. যাদুর বৈধ চিকিৎসা পদ্ধতি
যাদু থেকে মুক্তির জন্য শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো:
- রুকইয়াহ শরইয়্যাহ — কুরআনের আয়াত, বিশেষত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ইত্যাদি পড়ে ঝাড়ফুঁক করা।
- আয়াতুল কুরসি ও মুআওবিযাতাইন নিয়মিত পাঠ করা।
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকর যথাযথভাবে আদায় করা।
- তাওবা-ইস্তিগফার ও দোয়া-দরুদ বেশি পড়া।
- বৈধ চিকিৎসা (ডাক্তারি) গ্রহণ করা—শরীরে কোনো রোগ থাকলে তার চিকিৎসা করানো।
- সন্দেহজনক আমিল, তাবিজ-কবজ, কাগজ-কাপড় দেখে ডায়াগনোসিস থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ গণক ও জ্যোতিষীদের কাছে যাওয়া সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, তাদের কথা বিশ্বাস করা কুফর, আর জিজ্ঞাসা করাও গুনাহ।
(রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৩, দারুল ফিকর)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা আন-নামল: ৬৫-এর তাফসিরে বলেন, গায়েবের জ্ঞান দাবি করা বা গণকের কাছে যাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।
(মাআরিফুল কুরআন: ৬/৫৮৪)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেছেন, কাপড়, চুল, নাম ইত্যাদি দেখে যাদু নির্ণয় করা শয়তানি পদ্ধতি; এটি থেকে বেঁচে থাকা wajib।
(ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৮৫, মাকতাবা মাআরিফুল কুরআন)
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেছেন, গণক, জ্যোতিষী, ভণ্ড আমিলদের কাছে যাওয়া এবং তাদের কথায় বিশ্বাস করা ঈমান ধ্বংসের কারণ।
(বেহেশতী জেওর: ১/২৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
সিদ্ধান্ত
- কাপড় দেখে যাদুর ডায়াগনোসিস করা শরীয়তসম্মত নয়। এটি গায়েবের জ্ঞান দাবির শামিল, যা হারাম।
- এভাবে ডায়াগনোসিস করা যায় না। যে মুফতি বা আমিল এভাবে করেন, তার কাছে যাওয়া উচিত নয়।
- যাদু হয়েছে বলে সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে রুকইয়াহ শরইয়্যাহ করান, যিনি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী চিকিৎসা করেন—কাপড়-কাগজ দেখে নয়।
- নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস, সকাল-সন্ধ্যার যিকর পড়ুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
- গণক, জ্যোতিষী, ভণ্ড আমিলদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরক-কুফর ও শয়তানি পদ্ধতি থেকে হেফাজত করুন এবং বিশুদ্ধ সুন্নাহভিত্তিক চিকিৎসার তাওফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।